মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্ট গুগলের প্রধান নির্বাহী সুন্দর পিসাই বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বেতনভোগী প্রধান নির্বাহীদের একজন। কিন্তু অন্য আর দশজন বিত্তশালী নির্বাহীদের চেয়ে দৃশ্যত তিনি একটু আলাদা। মার্কিন ব্যবসা বিষয়ক সংবাদ মাধ্যম ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, গত বছর গুগল তাকে বড় অঙ্কের স্টক শেয়ার দিতে চাইলেও তিনি তা ফিরিয়ে দিয়েছেন। যুক্তি হিসেবে পিসাই বলেছেন, তিনি ইতিমধ্যেই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি অর্থ বেতন পান। সুতরাং, নতুন করে মোটা অঙ্কের শেয়ার তার প্রয়োজন নেই!

ঠিক কত টাকার শেয়ার সুন্দর পিসাই ফিরিয়ে দিয়েছেন, তা নিখুঁতভাবে জানা যায়নি। তবে অনুমান করা হচ্ছে, এই শেয়ারের মূল্য প্রায় ৫৮ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। তবে এই অর্থ ফিরিয়ে দেয়ার নেপথ্যে শুধু পিসাইয়ের সদাশয়তা কাজ করেছে ভাবলে হয়তো ভুল হবে।

এ বছরের শুরুর দিকে গুগলের অভ্যন্তরীণ এক বৈঠকে একজন কর্মী প্রশ্ন তোলেন যে, সিলিকন ভ্যালিতে কর্মরত অনেক নিচু সারির কর্মী যেখানে দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন, সেখানে প্রধান নির্বাহীকে এই বিপুল পরিমাণ বেতনভাতা দেয়ার যৌক্তিকতা কী? হয়তো এ নিয়ে উদ্ভূত বিতর্ক আর না বাড়াতে অতিরিক্ত এই শেয়ার বোনাস গ্রহণ না করাই সমীচীন মনে করেছেন পিসাই।

এ বছরের শেষ নাগাদ গুগলের মূল কোম্পানি আলফাবেট সুন্দর পিসাইয়ের পারিশ্রমিক নিয়ে বৈঠকে বসবে। তার পারিশ্রমিক চুক্তির কিছু অংশবিশেষে হয়তো পরিবর্তনও আনা হবে। তবে ততদিনে তার বিদ্যমান শেয়ারের মুনাফা জমা হয়ে তিনি হয়ে উঠবেন ব্যাপক ধনী।

২০১৪ সালে সুন্দর পিসাই যখন পদোন্নতি পেয়ে গুগলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেইজের অনেক দায়িত্ব বুঝে পান, তখন তিনি প্রায় ২৫ কোটি ডলার মূল্যের স্টক শেয়ার পেয়েছিলেন। তার পরের বছর তিনি গুগলের প্রধান নির্বাহী হন। তখন তিনি পান আরো ১০ কোটি ডলারের শেয়ার। ২০১৬ সালে তিনি আরো ২০ কোটি ডলারের শেয়ার পান।

কিন্তু ওই বছর থেকেই গুগলের প্রধান নির্বাহী হিসেবে অনেক বিতর্কের সাক্ষী হতে থাকেন পিসাই। ওই বছরের শুরুতে গুগলের কর্মীরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেন। তারও কিছুকাল পরে জেমস ডামোর নামে একজন গুগল প্রকৌশলী প্রকাশ্যে দাবি করেন গুগল রক্ষণশীল বা কনজারভেটিভদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতমূলক আচরণ করে। এই দাবির পর রিপাবলিকানরা ব্যাপক ক্ষেপে ওঠে।
২০১৮ সালে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সঙ্গে গুগলের কাজ করার বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ দেখায় গুগল কর্মীরা।

অগত্যা মার্কিন সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কাজ করা থেকে বিরত থাকতে হয় প্রতিষ্ঠানকে। একই বছর চীনে শাসকগোষ্ঠীর চাহিদা মতো গুগলের একটি সেন্সর্ড সার্চ ইঞ্জিন চালু করার সম্ভাব্য পরিকল্পনা নিয়ে ফুঁসে উঠে কর্মীরা। ২০১৬ সালেরই শেষের দিকে যৌন নির্যাতনের দায়ে অভিযুক্ত নির্বাহীদেরকে বড় অঙ্কের বোনাস দেয়ার প্রতিবাদে কয়েক হাজার গুগল কর্মী কর্মবিরতি পালন করে।

এছাড়া প্রধান নির্বাহীর বিপুল অঙ্কের বোনাস প্রাপ্তি নিয়ে অসন্তোষ তো আছেই। প্রধান নির্বাহীদের অত্যধিক বেতন-ভাতা নিয়ে গুগলের বাইরেও রব উঠছে। একই সময়ে বিশ্বব্যাপী বেশ কয়েকটি মনোপলির (বাজারে একাধিপত্য) তদন্ত চলছে গুগলের বিরুদ্ধে। যুক্তরাষ্ট্রেও গুগলের বিপুল ক্ষমতা, প্রকাণ্ড আকার ও মানুষের ব্যক্তিগত তথ্যে প্রবেশাধিকার নিয়ে নানারকম পর্যালোচনা চলছে।

দুই প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেইজ ও সার্জি ব্রিন এখন আর প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কাজকর্ম দেখেন না। সাবেক প্রধান নির্বাহী এরিক শিমিডথ এতদিন গুগলের বোর্ডে ছিলেন। তিনিই রাজনৈতিক বিষয়াষয় দেখাশোনা করতেন। কিন্তু তিনিও শিগগিরই বিদায় নিচ্ছেন। এই বছরের ডিসেম্বরে নানা ধরনের বিতর্কের মুখে কংগ্রেসের শুনানিতে বসতে হয় সুন্দর পিসাইকে।

তবে এতকিছুর পরও গুগলের লাভের অঙ্ক কিন্তু পিসাইয়ের অধীনে বেড়েই চলেছে। তিনি দায়িত্ব নেয়ার পর আলফাবেটের শেয়ারের মূল্য ৫০ শতাংশ বেড়েছে! তবে গত ত্রৈমাসিক বর্ষে ওয়াল স্ট্রিটের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি।