১লা মে “আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস” মহান ‘মে দিবস’ । শ্রমিক সমাজ তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য এ দিনে আত্মত্যাগের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। বিশ্বের শ্রমিক সমাজ তা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে অধিকার আদায়ের আন্দোলন চালিয়ে আসছে।

‘শ্রমিকদের গায়ের ঘাম শুকানোর আগেই শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা পরিশোধ করার জন্য’ হযরত মুহাম্মদ (সা.) জোর তাগিদ দিয়েছেন। শ্রমিকদের মর্যাদা রক্ষার জন্যে রাসূল করীম (সা.) এর তাগিদ বাস্তবায়নের মধ্যেই শ্রমিকদের প্রকৃত মুক্তি ও কল্যাণ নিহিত।

বর্তমানে কলে-কারখানায় শ্রমিক-মালিকের মধ্যে দ্বন্দ্ব বিরাজ করছে। তার অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে শ্রমিকদের ন্যায্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। এতে কলকারখানায় উৎপাদনের সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি হবে।

যথাযোগ্য মর্যাদায় ১লা মে ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস’ তথা ‘মে দিবস’ পালন করার জন্য শ্রমজীবী মানুষ ও দেশের সকলের প্রতি আহ্বান করছি।

প্রসঙ্গ: আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস (মে দিবস নামেও পরিচিত) মে মাসের প্রথম দিনটিকে পৃথিবীর অনেক দেশে পালিত হয়। বেশকিছু দেশে মে দিবসকে লেবার ডে হিসাবে পালন করা হয়। এদিনটি সরকারীভাবে ছুটির দিন। ১৮৮৬ সালের ১লা মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটে ৮ ঘণ্টা শ্রমদিনের দাবীতে আন্দোলন রত শ্রমিকের ওপর গুলি চালানো হলে ১১ জন শহীদ হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডায় এইদিন পালিত হয় না। এ ছাড়া এইদিনে আরও কিছু ঘটনা রয়েছে যা আঞ্চলিক ভাবে হয়তো পালিত হয়।

পূর্বে শ্রমিকদের অমানবিক পরিশ্রম করতে হত, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা আর সপ্তাহে ৬ দিন। বিপরীতে মজুরী মিলত নগণ্য, শ্রমিকরা খুবই মানবেতর জীবনযাপন করত, ক্ষেত্রবিশেষে তা দাসবৃত্তির পর্যায়ে পড়ত। ১৮৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের একদল শ্রমিক দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজ করার জন্য আন্দোলন শুরু করেন, এবং তাদের এ দাবী কার্যকর করার জন্য তারা সময় বেঁধে দেয় ১৮৮৬ সালের ১লা মে। কিন্তু কারখানা মালিকগণ এ দাবী মেনে নিল না। ৪ঠা মে ১৮৮৬ সালে সন্ধ্যাবেলা হালকা বৃষ্টির মধ্যে শিকাগোর হে-মার্কেট নামক এক বাণিজ্যিক এলাকায় শ্রমিকগণ মিছিলের উদ্দেশ্যে জড়ো হন। তারা ১৮৭২ সালে কানাডায় অনুষ্ঠিত এক বিশাল শ্রমিক শোভাযাত্রার সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে এটি করেছিলেন। আগস্ট স্পীজ নামে এক নেতা জড়ো হওয়া শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা বলছিলেন। হঠাৎ দূরে দাড়ানো পুলিশ দলের কাছে এক বোমার বিস্ফোরন ঘটে, এতে এক পুলিশ নিহত হয়। পুলিশবাহিনী তৎক্ষনাত শ্রমিকদের উপর অতর্কিতে হামলা শুরু করে যা রায়টের রূপ নেয়। রায়টে ১১ জন শ্রমিক শহীদ হন। পুলিশ হত্যা মামলায় আগস্ট স্পীজ সহ আটজনকে অভিযুক্ত করা হয়। এক প্রহসনমূলক বিচারের পর ১৮৮৭ সালের ১১ই নভেম্বর উন্মুক্ত স্থানে ৬ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। লুইস লিং নামে একজন একদিন পূর্বেই কারাভ্যন্তরে আত্মহত্যা করেন, অন্যএকজনের পনের বছরের কারাদন্ড হয়। ফাঁসির মঞ্চে আরোহনের পূর্বে আগস্ট স্পীজ বলেছিলেন, "আজ আমাদের এই নি:শব্দতা, তোমাদের আওয়াজ অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী হবে"। ২৬শে জুন, ১৮৯৩ ইলিনয়ের গভর্ণর অভিযুক্ত আটজনকেই নিরপরাধ বলে ঘোষণা দেন, এবং রায়টের হুকুম প্রদানকারী পুলিশের কমান্ডারকে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করা হয়। আর অজ্ঞাত সেই বোমা বিস্ফোরণকারীর পরিচয় কখনোই প্রকাশ পায়নি।

শ্রম ও শ্রমিকের মর্যাদা এবং শ্রমিকের দায়িত্ব: 

“নিজের হাতে কাজ করে জীবিকা অর্জন করে খাদ্য গ্রহণের চেয়ে উত্তম কোনো খাবার হতে পারে না । হযরত দাউদ আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের হাতে কাজ জীবিকা অর্জন করে খেতেন।” আমাদের মহা নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাজ করতেন । বাদশা আওরাঙ্গজেব নিজ হাতে টুপি সেলাই করতেন । 

একটি প্রসিদ্ধ হাদীস সম্পর্কে আমরা প্রত্যেকেই জানি যে, ''একদা একজন লোক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে ভিক্ষার জন্য এলেন তিনি তাকে ভিক্ষা না দিয়ে কম্বল বিক্রি করে একটি কুঠার কিনে তার মাধ্যমে কাজ করে কাঠ সংগ্রহ করে তা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতে বললেন এবং ভিক্ষা পরিহার করতে বললেন''। সুতরাং বুঝা যায় যে, ইসলাম সব সময় কাজ করার পক্ষে। শ্রমের পক্ষে ইসলামের অবস্থান । সে নারী হোক আর পুরুষ হোক। ইসলামে অলসতার কোন স্থান নেই। কেননা শ্রমের মর্যাদা তো আল্লাহ কুরআনের মধ্যে এভাবে বর্ণনা করেন 

وَجَعَلْنَا اللَّيْلَ لِبَاسًا. وَجَعَلْنَا النَّهَارَ مَعَاشًا.

“আমি রাতকে বিশ্রামের জন্য এবং দিনকে কর্মের জন্য বা কর্মের মাধ্যমে উপার্জনের জন্য বানিয়েছি” -সূরা আন নাবা। 

অন্য আরেক আয়াতে আল্লাহ বলেন- 

فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلَاةُ فَانْتَشِرُو فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِنْ فَضْلِ اللَّهِ.

“যখন নামায শেষ হবে তখন তোমরা পৃথিবিতে ছড়িয়ে পড়ো এবং মহান আল্লাহ নেয়ামত বা সম্পদ অর্জন করো” -সূরা জুমু’আ

শ্রমিকের মর্যাদা

يَا عِبَادِى إِنِّى حَرَّمْتُ الظُّلْمَ عَلَى نَفْسِى وَجَعَلْتُهُ بَيْنَكُمْ مُحَرَّمًا فَلاَ تَظَالَمُوا 

“ওহে আমার বান্দা! আমি আমার জন্যে কাউকে জুলুম করা নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। আর এ জুলুমকে আমি তোমাদের পরস্পরের উপর হারাম ঘোষণা করেছি। সুতরাং তোমরা জুলুম করো না।” একজন শ্রমিক অন্যেক কাজ করে অর্থের প্রয়োজনে। যারা শ্রমিক হিসেবে কাজ করে যুগে যুগে তাদের প্রতি বিভিন্ন ভাবে অবিচার করা হয়েছে। তাদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের পরিসংখ্যান অনেক বড়। তাদের অমর্যাদা ও সাধ্যের বাইরে কষ্ট দেয়ার ইতিহাস অনেক পুরোনো। তাদের মানুষ হিসেবে যে অধিকার পাবার কথা ছিলো যুগে যুগে তা না পাওয়ায় অনেক আন্দোলন হয়েছে, হয়েছে অনেক বিধি -বিধান, আইন-কানুন।

অনেক সময় তা কাগজে কলমে পাওয়া গেলেও বাস্তবে পাওয়া বড়ো ঢের । শ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদার বিষয়ে অনেক বক্তব্য হর হামেশা শুনে থাকি। পহেলা মে আসলেতো কোনো কথাই নেই।

শ্রমিক দিবসের আলোচনা, বক্তৃতা বিবৃতি সর্বত্র। শ্রমিক তার শ্রম দিচ্ছেন নিজের জীবন পরিচালনা এবং তার পোষ্যদের ভরণ-পোষণ নির্বাহ করার জন্যে। তাই তাকে যিনি শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ করবেন তার নৈতিক দায়িত্ব হল তাকে যথাযথ পারিশ্রমিক দেয়া।

যদি নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ যথাযথ/আলোচনার ভিত্তিতে নির্ধারিত পারিশ্রমিক প্রদান না করে, তার প্রাপ্য পারিশ্রমিক কমিয়ে দেয় কিংবা ঠকিয়ে দেয় তিনি হবেন আল্লাহর দৃষ্টিতে জালিম। আর জালিমের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। তার কোন সাহায্যকারী কিয়ামতে থাকবে না।

আল্লাহ বলেন-

ما للظالمين من حميم ولا شفيع يطاع

“জালিমের জন্য কিয়ামতের দিন কোনো বন্ধু ও সুপারিশকারী থাকবে না।”

শ্রমিককে তার মজুরী দিতে হবে পরিশ্রম শেষে সাথে সাথেই। অর্থাৎ শর্তানুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে পারিশ্রমিক পরিশোধ করতে হবে।

রাসুল সা, বলেন ‘’শ্রমিকের শরীরের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরী দিয়ে দাও‘’ কোনভাবেই তাকে হয়রানি করা যাবে না কিংবা ধোকা দেয়া যাবে না । শর্ত এবং ওয়াদা অনুযায়ী পারিশ্রমিক পরিশোধ না করলে তা মুনাফেকী। আর মুনাফেকী করা হরাম। রাসূল (সা) বলেন-

"آيَةُ الْمُنَافِقِ ثَلاَثٌ: إِذَا حَدّثَ كَذَبَ. وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ. وَإِذَا ائْتُمِنَ خَان

“মুনাফিকের নিদর্শন তিনটি। যখন সে কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন সে ওয়াদা করে ভঙ্গ করে আর যখন তার কাছে কোনো জিনিস আমানত রাখা হয় তখন সে তাতে খেয়ানত করে।

একজন শ্রমিকের দায়িত্ব: 

মালিক যে কাজের জন্য তাকে নিয়োগ দিয়েছেন সে দায়িত্ব যথাযথভাবে সাধ্যমত পালন করা । দায়িত্ব পালনে কোনো গাফলতি না করা । এ ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-“ তোমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল আর তোমাদের প্রত্যেককে সে দায়িত্ব সম্পর্কে জবাব দিতে হবে ।” আমানতদারীর সাথে দায়িত্ব পালন করা এবং মালিক কর্তৃক অর্পিত দাযিত্ব আমানতের সাথে পালন করা । তাতে কোনোভাবে খেয়ানত না করা। ইসলামের দৃষ্টিতে প্রতিটি দায়িত্ব আমানতদারীর সাথে পালন করা ফরয । “যার আমানতদারী নেই তার ঈমান নেই আর যার ওয়াদা পালন নেই তার দীন নেই ।” মালিকের সম্পদ চুরি করা যাবে না ইসলামে চুরি করা হারাম। গুণাহর কাজ।

রাসূলে আকরাম মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “যাকে কোনো দায়িত্ব প্রদান করেছি তাকে যথাযথ পারিশ্রমিক দিয়েছি এর পর সে তার প্রাপ্য পারিশ্রমিকের বাইরে গ্রহণ করবে তা হবে চুরি। মালিকের সাথে কোনোরূপ প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ না করা শ্রমিকের একটি গুরুতাবপূর্ণ দায়িত্ব । ইসলামে প্রতারনা করা হারাম । বিশ্ববনবী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “ যে ব্যক্তি প্রতারণা করে সে আমার উম্মতের অন্তর্ভূক্ত নয় ।” প্রত্যেকে যদি তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে ইসলামের অনুশাসন মেনে চলি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষকে মেনে চলতে উৎসাহিত করি । তবে সে সমাজ অত্যন্ত সুখের ও সমৃদ্ধিও সমাজ হওয়া সম্ভব ।