বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম সকল প্রশংসা নিখিল বিশ্বের প্রতিপালক মহান রাব্বুল আলামীনের জন্য। হাজার হাজার দরূদ ও সালাম বর্ষিত হউক মানবজাতির শিক্ষক ও সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর এবং তাঁর পরিবার পরিজন ও তাঁর ছাহাবীগণের উপরও। আম্মা বা’দ, বন্ধুগণ! বর্তমান হজ্জের মৌসুম। বিশ্বের আনাচ কানাচ থেকে লক্ষ লক্ষ নর-নারী হজ্জ পালন করার উদ্দেশ্যে মক্কা শরীফের দিকে রওয়ানা করছে। হজ্জ যত্রী নর-নারীর উপকারের উদ্দেশ্যে আমারা এই মহান ইবাদতের ব্যাপারে দুএকটি কথা বলছি‍- হজ্জ ইসলামের পাঁচ রুকনের মধ্যে পঞ্চম রুকন। আল্লাহ তাআ’লা তা বান্দাদের উপর ফরয করেছেন। কুরআন, সুন্নাহ্ এবং ইজমায়ে উম্মত দ্বারা হজ্জ ফরয হওয়া প্রমাণিত।

সুতরাং দৈহিক ও আর্থিক সামর্থ সম্পন্ন সকল নারী-পুরুষদের উপর জীবনে একবার হজ্জ করা ফরয। আল্লাহ্ তাআ’লা বলেছেনঃ وأتموا الحج والعمرة لله তেমারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে হজ্জ ও উমরা আদায় কর”। [সুরা আল্ বাকারা ১০৬] । অন্যত্র বলেছেনঃ ولله على الناس حج البيت من استطا ع اليه سبيلا . ومن كفر قان الله غنى عن العالمين . “আর এই ঘরের হজ্জ করা হ’ল মানুষের উপর আল্লাহর প্রাপ্য। যে লোকের সামর্থ্য রয়েছে এ পর্যন্ত পৌঁছার। আর যে লোক তা মানে না, আল্লাহ সারা বিশ্বের কোন কিছুরই পরোয়া করেন না”। [সুরা আল ইমরান ৯৭] আব্দুল্লাহ্ ইবনু উমর (রাঃ) বলেনঃ নবী কারীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ”ইসলাম পাঁচটি ভিত্তির উপর স্থাপিত।

(১) এই সাক্ষ্য দেয়া যে আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই এবং মুহাম্মদ (ছাঃ) আল্লাহর রাসুল। (২) ছালাত কায়েম করা (৩) যাকাত আদায় করা (৪) হজ্জ করা (৫) রমযানের ছিয়াম পালন করা।” [বুখারী ১/৩৪ হাঃ ৭]

আবুহুরায়রা (রাঃ) বলেনঃ নবী কারীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা আমাদেরকে খুতবা দানকালে বললেনঃ হে লোক সকল! আল্লাহ্ তোমাদের উপর হজ্জ ফরয করেছেন । অতএব তোমরা হজ্জ পালন কর। [মুসলিম, কিতাবুল হজ্জ] আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) বলেনঃ নবী কারীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা এই ঘর থেকে উপকৃত হও কেননা একে দুবার ধ্বংস করা হয়েছিল। তৃতীয় বারে একে তুলে নেয়া হবে। [হাকেম, ত্বাবরানী, সহীহ জামে, হাদীস নং ৯৫৫] এমনিভাবে উমরাও ওয়াজিব।

নবী কারীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমরা করার আদেশ দিয়েছেন।এমনকি এক মহিলা হজ্জে অংশ গ্রহণ করতে পারেনি বিধায় তাকে রমযানে উমরা করার আদেশ দিয়েছেন। ইবনু উমর (রাঃ) বলেনঃ নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ”আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী হও, তাঁর সাথে কাউকে শরীক কর না। ছালাত আদায় কর, যাকাত আদায় কর, রমযানের ছিয়াম পালন কর, বায়তুল্লাহর হজ্জ কর এবং উমরা পালন কর, আর শাসকের কথা শুন এবং তার অনুগত থাক”। [ কিতাবুস সুন্নাহ পৃ ৪৯৫, হাদীস নং ১০৭০] ইবনু উমর (রাঃ) বলেনঃ প্রত্যেক ব্যক্তির উপর হজ্জ ও উমরা করা ওয়াজিব। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ হজ্জ ও উমরা উভয়কে আল্লাহ তাআলা তাঁর কিতাবে একসাথে উল্লেখ করেছেন। [সহীহ আল বুখারী, হা নং ৩৩৮] হজ্জ কার উপর ফরয হয়ঃ যে সকল স্বাধীন, জ্ঞানসম্পন্ন মুসলিম নর-নারীর কাছে নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ ও ঋন পরিমাণের অতিরিক্ত এতটূকু সম্পদ জমা আছে যাদ্বারা সে মক্কা শরীফ গিয়ে পুনরায় স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করতে পারবে এবং সেখানে অবস্থানকালে খরচ করতে পারবে, তাদের সকলের উপর হজ্জ ফরয হবে।

হজ্জ ফরজ হওয়ার জন্য শুধু সম্পদশালী হওয়াই যথেষ্ট নয়। বরং তার সাথে রয়েছে আরো অনেক শর্ত শরায়েত। নিম্নে সেই শর্তগুলি বর্ণনা করা হল: হজ্জ ফরয হওয়ার জন্য শর্তসমুহঃ ফিকাহবিদগণ হজ্জ ও উমরা ফরয-ওয়াজিব হওয়া বা ছহীহ-শুদ্ধ ভাবে আদায় হওয়ার জন্য পাঁচটি শর্ত বর্ণনা করেছেন।

যথাঃ (১) মুসলিম হতে হবে, কোন কাফের বা মুরতাদের উপর হজ্জ ফরয হবে না। কারণ ঈমান ব্যতীত কোন আমল কবুল হয় না। [সুরা তাওবা ২৮, বুখারী ৩/৪৮৩, মুসলিম ২/৯৮২] (২) জ্ঞান সম্পন্ন হতে হবে, কোন পাগল কিংবা জ্ঞানহীন ব্যক্তির উপর ফরয হবে না। (৩) স্বাধীন হতে হবে, দাস-দাসীর উপর হজ্জ ফরয হবে না। [ইরওয়াউলগালীল ৪/১৫৬] (৪) বালেগ হতে হবে, ছোট ছেলে-মেয়ের উপর ফরয হবে না। [ইরওয়াউলগালীল ৪/১৫৬] (৫) সামর্থবান হতে হবে অর্থাৎ নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ ও ঋন পরিমাণের অতিরিক্ত সম্পদ দ্বারা মক্কা শরীফ গিয়ে হজ্জের কার্য্যাবলী সমাধা করে পুনরায় প্রত্যাবর্তন করতে পারার মত সম্পদ থাকতে হবে। (৬) মহিলাদের জন্য সফরসাথী হিসেবে স্বামী বা অন্য কোন মুহরিম থাকাও শর্ত। [মুসলিম, কিতাবুল হজ্জ] মোট কথা, সামর্থবান, স্বাধীন, জ্ঞানসম্পন্ন মুসলিম নর-নারীর উপর জীবনে একবার হজ্জ করা ফরয। [সহীহ আবুদাউদ কিতাবুল হূদুদ]

হজ্জ ও উমরা কবুল হওয়ার জন্য শর্তসমুহঃ (১) শিরক মুক্ত হতে হবে (২) নিয়তে ইখলাছ থাকতে হবে (৩) লোক দেখানো কিংবা প্রসিদ্ধি লাভ উদ্দেশ্য না থাকতে হবে (৪) সুন্নাহ মোতাবেক ইবাদত হতে হবে। (৫) হালাল সম্পদ দ্বারা হ্জ্জ ও উমরা আদায় করতে হবে। অক্ষম ও মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে তার ওয়ারিশগণ হজ্জ ও উমরা আদায় করবেঃ আবু রাযীন বলেনঃ হে আল্লাহর রসুল! আমার বাবা প্রাপ্তবয়স্ক। সে হজ্জ ও উমরা আদায় করতে অক্ষম এবং সফর ককরতেও অপারগ। তিনি বললেনঃ তুমি তোমর পিতার পক্ষ থেকে হজ্জ ও উমরা আদায় কর। [সহীহ সুনানু আবিদউদ, হ্দীস নং ১৮১০] আলী (রাঃ) বলেনঃ যদি কোন ব্যক্তি হজ্জ ফরয হবার পর হজ্জ না কবে মারা যায়, তাহলে তার ওয়ারিশগণ তার পক্ষ থেকে হজ্জ আদায় করবে। [বুখারী, কিতাবু জাযাউচ্চাইদ] মনে রাখবে, বাল্যকালে হজ্জ করার কারণে হজ্জ ফরয হয় না। অবিবাহিত ছেলেমেয়ে থাকলে হজ্জের ফরয বিধান রহিত হয় না। হজ্জের মাসে উমরা করলে হজ্জ ফরয হয় না।

এমনিভাবে হজ্জ ফরয হবার জন্য মাতা-পিতাকে প্রথমে হজ্জ করানোও জরুরী নয় । হজ্জ ত্যাগকারীর বিধান হজ্জের এহেন গুরুত্বের কারণে যদি কেউ এর ফরয হওয়ার বিধান তথা বিধিবদ্ধ হওয়াকে অস্বীকার করে তাহলে সে সর্ব সম্মতিক্রমে কাফের হয়ে যাবে। অর্থাৎ দ্বীনে ইসলামের গন্ডির বাইরে চলে যাবে। আর যে ব্যক্তি অবহেলা করে আদায় করবে না সে ফাসিক এবং কঠিন শাস্তিযোগ্য হবে। কোন কোন হাদীসের ভাষ্য মতে যে ব্যক্তি হজ্জ আদায় করে না সে ইহূদী বা খ্রীষ্টান হয়ে মৃত্যু বরণ করার আশঙ্কা থাকবে। উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) বলেনঃ যে ব্যক্তি হজ্জ করার সামর্থ থাকার পরও হজ্জ পালন করেনি, সে ইহুদী বা খৃষ্টান যে অবস্থাতেই মৃত্যু বরণ করুক, উভয়টাই তার জন্য সমান। [ইবনু কাছীর ১/৪৭৩] হজ্জ কয়বার ফরয হয়? হজ্জ শুধু একবার ফরয হয়।

সারা জীবনে একবার করলেও হজ্জের ফরয বিধান আদয় হয়ে যাবে। আবুহুরায়রা (রাঃ) বলেনঃ নবী কারীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা আমাদেরকে খুতবা দানকালে বললেনঃ হে লোক সকল! আল্লাহ তোমাদের উপর হজ্জ ফরয করেছেন। অতএব তোমরা হজ্জ পালন কর। এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! প্রতি বছর কি হজ্জ করতে হবে? তিনি চুপ থাকলেন। এমনকি লোকটি তিনবার একই প্রশ্ন করল। তখন বললেনঃ আমি যদি হাঁ বলতাম তাহলে ফরয হয়ে যেত। অথচ তোমরা করতে সক্ষম হতে না। [মুসলিম, কিতাবুল হজ্জ]

প্রতি পাঁচ বছরে একবার হজ্জ করাঃ যদিও হজ্জ সারা জীবনে একবারই ফরয হয়। তথাপি সামর্থবান ব্যক্তিদেরকে সম্ভব হলে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর অন্তর একবার হজ্জ করতে বলা হয়েছে। আবুসাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেনঃ নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা বলেছেনঃ যে বান্দার শরীর আমি ঠিক রেখেছি এবং যাকে আমি স্বচ্ছলতা দান করেছি কিন্তু পাঁচটি বছর অতিক্রান্ত হবার পরও সে আমার (ঘরের দিকে) আসে না, সে ব্যক্তি মাহরুম তথা বঞ্চিত। (ইবনু হিব্বান, ত্বাবরানী, বায়হাকী, খতীব, সহীহ আল জামে, হাঃ ১৯০৯, সহীহাঃ ১৬৬২) কখন আদায় করতে হবে? যখন কারো উপর হজ্জ ফরয হয় তখন সে বিলম্ব না কবে যত তাড়াতড়ি সম্ভব হজ্জ আদায় করে নিবে।

যদিও বিলম্বে হজ্জ আদায় করার ব্যাপারে আলেমদের ভিন্ন মত রয়েছে এবং উভয় মতের পক্ষে সহীহ-শুদ্ধ দলীল প্রমাণাদি পাওয়া যায়। তথাপি দ্রুত হজ্জ আদায় করাই হল, অতি উত্তম। আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ রসুলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা মক্কার দিকে তাড়াতাড়ি বের হও। কারণ তোমাদের কেউ তো জানে না যে, ভবিষ্যৎ তার কি হবে? হতে পারে অসুস্থ হয়ে পড়বে বা মুখাপেক্ষী হয়ে যাবে। (বায়হাকী, আবু নুআইম, সহীহ আ জামে, হাঃ৩৯৯০) ফযল ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ রসুলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি হজ্জ করার ইচ্ছা করেছে সে যেন তাড়াতাড়ি করে। কারণ হয়তো কেউ অসুস্থ হয়ে পড়বে বা তার সওয়ারী হারানো যাবে কিংবা সে মুখাপেক্ষী হয়ে যাবে। (আহমদ ইবনু মাজাহ, সহীহ জামে হাঃ ৬০০৪)