সৌদিতে ৩ জন নয়, কমপক্ষে ২০ জন প্রিন্স আটক

Img

সৌদি রাজপরিবারের সবচেয়ে উচ্চপদস্থ ভিন্নমতালম্বী ও বর্তমান বাদশাহর ভাই প্রিন্স আহমেদ বিন আবদুল আজিজকে আটকের পর অন্যান্য প্রিন্সদের ধরপাকড় চলছে। বাদশাহর পুত্র ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানে জড়িত থাকার অভিযোগে তাদেরকে আটক করা হয়েছে। ইতিপূর্বে ৩ জন শীর্ষস্থানীয় প্রিন্স আটক হওয়ার খবর জানা গেলেও, লন্ডন-ভিত্তিক মিডল ইস্ট আই বলছে, আটক হওয়া প্রিন্সদের সংখ্যা ২০। তবে এদের মধ্যে ৪ জনের নামই জানা গেছে। তারা হলেন বাদশাহ সালমানের একমাত্র জীবিত ভাই প্রিন্স আহমেদ। আটক হয়েছেন প্রিন্স আহমেদের ছেলে প্রিন্স নায়েফ বিন আহমেদ, যিনি ল্যান্ড ফোর্সেস ইন্টিলিজেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি অথরিটির প্রধান। এছাড়া আটক হয়েছেন সাবেক ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন নায়েফ ও তার সৎ ভাই নাওয়াফ বিন নায়েফ।

এই ধরপাকড়ের মধ্যে ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান নির্দেশ দিয়েছেন রাজপরিবারের সকল প্রিন্সকে টুইটারে তার প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করার নির্দেশ দিয়েছেন। ৩ জন প্রিন্স ইতিমধ্যে তা করেছেনও।

এদিকে বার্তাসংস্থা রয়টার্স একজন আঞ্চলিক সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, আমেরিকা ও আরও কিছু বিদেশী শক্তির সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে আটককৃত প্রিন্সদের বিরুদ্ধে।

রয়টার্স একাধিক সূত্রকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, বাদশাহ সালমান নিজেই তাদের গ্রেপ্তারি পরোয়ানায় স্বাক্ষর করেছেন। তারা দাবি করেছেন যে, বাদশাহ সালমানের মানসিক অবস্থা ভালোই আছে, যদিও বাদশাহর ডিমেনশিয়া বা ভুলে যাওয়ার রোগ আছে।

এদিকে আরেক প্রিন্স মিতেব বিন আবদুল্লাহকে নিয়েও উদ্বেগ ছড়িয়েছে। সাবেক বাদশাহ আবদুল্লাহর এই সন্তানকে একসময় সিংহাসনের অন্যতম উত্তরাধিকার ভাবা হতো। ২০১৭ সালে ক্রাউন্স প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান যখন বেশ কয়েকজন প্রিন্স ও রাজপরিবারের সদস্যদের হোটেল রিটজ কার্লটনে আটক রেখেছিলেন, তাদের মধ্যে প্রিন্স মিতেবও ছিলেন। তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি জরিমানা প্রদানের বিনিময়ে মুক্তি পান। ৬৫ বছর বয়সী মিতেব একসময় অভিজাত ন্যাশনাল গার্ডের প্রধান ছিলেন।

এর আগে তিনি রিটজ কার্লটনে কয়েকজন প্রিন্স সহ প্রায় ৫০০ জন ব্যবসায়ীকে আটক করেছিলেন। এছাড়া ২০১৮ সালে তিনি সাংবাদিক জামাল খাসোগজি ইস্তাম্বুলে সৌদি দূতাবাসে খুন হয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমানে যেই ধরপাকড় চলছে, তা ক্রাউন প্রিন্সের অতীত বেপরোয়া সিদ্ধান্তকেও ছাড়িয়ে গেছে।

২০১৮ সালের অক্টোবরে লন্ডনে বেফাঁস মন্তব্য করে বেকায়দায় পড়ে যান বাদশাহর ছোট ভাই প্রিন্স আহমেদ। তবে তখন মার্কিন ও বৃটিশ গোয়েন্দারা ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদের কাছে এই নিশ্চয়তা চান যে, প্রিন্স আহমেদকে দেশে ফিরতে দেওয়া হবে ও তাকে গ্রেপ্তার করা হবে না। ওই নিশ্চয়তা পেয়েই প্রিন্স আহমেদ দেশে ফিরেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি আটক হলেন।

অপরদিকে প্রিন্স মোহাম্মদ বিন নায়েফও বেশ প্রভাবশালী। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় পেন্টাগন যেই সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী জোট গঠন করেছিল, তার পরিক্ষিত সদস্য ছিলেন বিন নায়েফ। কিন্তু তাকে সরিয়ে যখন বাদশাহ সালমান নিজের ছেলে প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানকে ক্রাউন প্রিন্স করলেন, তখন বিন নায়েফ পড়ে যান বিপদে। পদ থেকে নয় শুধু, তার মোবাইল ফোন, দেহরক্ষী ও ভাতাও বন্ধ করে দেওয়া হয়। তাকে একপ্রকার গৃহবন্দী করে রাখা হয়। শুক্রবার মরুভূমিতে এক ব্যক্তিগত শিবির থেকে তাকে ও তার সৎ ভাই নাওয়াফকে আটক করা হয়।

সূত্রের বরাতে মিডল ইস্ট আই জানিয়েছে যে, রাজকীয় পরিতোষক বাদ দেওয়ায় নিজের বন্ধুবান্ধবদের কাছে খেদ প্রকাশ করেছিলেন বিন নায়েফ। তিনি বাদশাহর কাছে চিঠিও লিখেছিলেন এ ব্যাপারে।

কিন্তু রাজপরিবারে প্রভাব থাকায় বিন নায়েফ যেন সবসময়ই ছিলেন হুমকির মতো। ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের শাসন নিয়ে অসন্তোষের জেরে, তার পরিবর্তে প্রিন্স মোহাম্মদ বিন নায়েফ ও প্রিন্স আহমেদের (বাদশাহর ভাই) নামই সবসময় উল্লেখ করেছেন রাজপরিবারের জ্যেষ্ঠ সূত্রগুলো।

প্রিন্স আহমেদ ঝামেলায় জড়িয়েছেন ২০১৮ সালের শেষের দিকে। তিনি তখন লন্ডনে। সৌদিতে ফেরার পথে তার প্রতি সৌদি আরবের ইয়েমেন যুদ্ধের ইস্যুতে বিক্ষোভ দেখানো হয়। তখন তিনি প্রতিবাদকারীদের কাছে গিয়ে বলেন, এজন্য ক্রাউন প্রিন্স দায়ী, রাজপরিবারের কোনো দোষ নেই। তার ওই মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। প্রিন্স আহমেদ ভেবেছিলেন যে, তিনি যেহেতু বাদশাহর একমাত্র জীবিত ভাই এবং সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা ইবন সৌদের প্রথম স্ত্রীর ঘরে ৭ ভাইয়ের একজন, সেহেতু তিনি ক্রাউন প্রিন্সের সমালোচনা করে যেতে পারবেন। কিন্তু দৃশ্যত তিনিও পার পাননি।

তবে লন্ডনের ওই ঘটনার পর প্রিন্স আহমেদ দেশে ফেরত যাওয়া ঠিক হবে কিনা তা নিয়ে বিস্তর ভেবেছিলেন। তিনি স্থায়ীভাবে বিদেশে নির্বাসনে থাকার কথাও ভেবেছিলেন। তবে অন্যান্য প্রিন্সদের অনুরোধেই তিনি দেশে ফেরেন। তাকে এখনও সৌদি আরবে সম্মানের চোখে দেখা হয়। এছাড়া বেয়া বা অ্যালিজিয়েন্স কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে তার রাজকীয় প্রভাবও ছিল। কেননা, এই কাউন্সিলই বাদশাহর মৃত্যুর পর ক্রাউন প্রিন্সের বাদশাহ হওয়ার বিষয়টি নামেমাত্র হলেও অনুমোদন করে।

সেবার দেশে ফিরলে প্রিন্স আহমেদকে সরকারীভাবেই বরণ করে নেওয়া হয়। তার রাজকীয় পরিতোষক ঠিক রাখা হয়। জ্যেষ্ঠ প্রিন্স হিসেবে তার দেহরক্ষী সহ সব ঠিক রাখা হয়। এতদিন পর্যন্ত তিনি যেকোনো স্থানে যেতেও পারতেন।

এখন বিরাট প্রশ্ন ঝুলছে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবদেলআজিজ বিন সৌদের ওপর। কেননা, তার দুই আপন চাচা মোহাম্মেদ বিন নায়েফ ও নাওয়াফ বিন নায়েফকে আটক করা হয়েছে।

প্রতিক্রিয়া মন্তব্য শেয়ার