সুন্দরবনের অভ্যন্তরে বিষ প্রয়োগে মাছ শিকারে দুষ্কৃতকারী চক্রের অবাধ তৎপরতা ক্রমেই বাড়ছে। ম্যানগ্রোভ বনের বিভিন্ন নদ-নদী ও খালে বিষ প্রয়োগে মৎস্য শিকারের প্রবণতায় হুমকির মুখে পড়েছে বনাঞ্চলের মৎস্য সম্পদের প্রজনন ও উৎপাদন।

অসাধু বনরীদের প্রত্য ও পরো মদদে নির্বিচারে চলছে মৎস্য নিধনের অনৈতিক এ কারবার। জেলে নামধারী এক শ্রেণীর দুষ্কৃতিকারীদের অতি অল্প সময়ে বেশি মাছ আহরণ ও লাভ হলেও সুন্দরবনের প্রকৃত জেলেরা নিঃস্ব হচ্ছে। আর এ কারণে বনের অভ্যন্তরে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের প্রজনন আশঙ্কাজনক হারে কমতে শুরু করেছে। বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার করায় শুধু মৎস্য সম্পদই নয়, হুমকির মুখে পড়ছে সুন্দরবনের জলজ প্রাণীও। বিষ দিয়ে মাছ শিকার দন্ডণীয় অপরাধ। কিন্তু অবৈধ এই কারবার ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে সংশ্লিষ্টরা।

সুন্দরবনের ছোট খাল থেকে বিষ দিয়ে ধরা হয় চিংড়ি। খালের মাথায় বিষ ঢেলে চলছে মাছ ধরার এই বিষাক্ত প্রক্রিয়া। খালের বড় মাছগুলো ধরার জন্য দেয়া হয় অন্য ধরনের বিষ। পাতানো জালে আটকা পড়ে সাদা মাছ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সুন্দরবনের ৩১ দশমিক ৫ ভাগ এলাকাজুড়ে রয়েছে বিশাল জলভাগ। সুন্দরবনসহ এখানকার অসংখ্য খালে আছে তিন শতাধিক প্রজাতির মাছ। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বনবিভাগ থেকে অবশ্য মাছ শিকারে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে বনের অভ্যন্তরের বেশ কিছু নদী ও খালকে ।

সুন্দরবন বিভাগ সূত্র জানায়, পূর্ব ও পশ্চিম বিভাগ মিলিয়ে পুরো সুন্দরবনের অভ্যন্তরে থাকা মোট চারটি রেঞ্জের আওতাধীন ১৮টি খালে সব ধরনের জেলে প্রবেশ ও মাছ ধরার জন্য নিষেধাজ্ঞা প্রদান করা হয়। নিষিদ্ধ ১৮টি খালে ডিমওয়ালা মা মাছ ডিম ছাড়ার জন্য নিরাপদে অবস্থান নেয়। মাছের প্রজননের েেত্র নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কেউ তা শিকার করলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু সুন্দরবনের অভয়ারন্য এ সব এলাকায় মাছ শিকার চলছে দেদারছে । বন কর্মকর্তাদের টাকা দিলেই দেওয়া হয় মাছ ধরার অনুমতি । তিনটি স্থরে দিতে হয় এই টাকা ।

সুন্দরবনের বন্য প্রাণী পাচার ও শিকার এবং বন্দর কেন্দ্রিক চোরাকারবারিদের হোতা কথিত আদায়কারি দেলোয়ার মংলা ,বানিশান্তা ও মোড়েলগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে দাদনে টাকা দিয়ে লোক সংগ্রহ করে থাকে । তাদেরকে নিয়ে আসা হয় সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জে । সেখান থেকে দেওয়া হয় বনে প্রবেশ করার অলিখিত পারমিট। তাদের কাছ থেকে এই সকল লোক মাথা পিছু ১ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত দিয়ে বনে প্রবেশ করে চলে যায় নিষিদ্ধ খাল এলাকায়। এই রেঞ্জ এলাকায় মাছ ধরা ও বন্য প্রাণী শিকারের নিরাপদ এলাকা হিসেবে বিবেচনা করে এই সকল পাচারকারিরা। মোংলা থেকে কখনও কখনও অন্য রেঞ্জ এলাকাতেও পাঠানো হয় এই সকল লোক । সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের চাঁদাপাই রেঞ্জে ’কা”অধ্যাক্ষের এক কর্মকর্তা যোগদানের পর এই এলাকায় শিকার ও পাচারের ঘটনা ওপেন সিক্রেট বলে জানান পাচারকারিরা ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জেলে জানান, সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জের নীল কমল,কেওড়াসুটি,কাকা খাল,চান্দাবুনিয়া,বুন্দা খাল ও সিদ্দিক পয়েন্টেও পাঠানো হচ্ছে তাদের । কাকড়া ধরা লোকজন কেওড়াসুটি খালে এবং চরঘেরা ও কাঠিজাল দিয়ে মাছ ধরা লোকজন চান্দাবুনিয়া এলাকায় অবস্থান নিয়ে থাকে । সেখানে প্রতি গোনে (৭দিন) কাকড়া ধরার জন্য ৪হাজার টাকা ,চরঘেরা ও কাঠিজাল জেলেদের ৬ হাজার টাকা করে দিতে হয় বন বিভাগকে।

মাছ শিকারকারীরা বলেন, চিংড়ি মাছসহ পাতারি ও টেংরাসহ সবই মারা পড়ছে বিষে। এখানে ডেনটন নামের এক মেডিসিন দেয়া হয়। এটি বোতলে থাকে। এর দাম ১০০ গ্রাম ১২০ টাকা। একটি খালে ৭-৮টি ডেনটন দিলেই হয়। জেলেরা আরো জানায়, মেডিসিন পানিতে ঠেলে হাত দিয়ে গুলিয়ে দেয়ার পর যখন পানি আগের মতো হয়ে যায় তখন সব মাছ ভেসে ওঠে। তারা জানায়, বিষ ছাড়া মাছ পাওয়া যায় না।বন কর্মকর্তাদের টাকার বিনিময় ম্যানেজ করে তারা মাছ শিকার করেন ।

এ বিষয়ে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ চাঁদপাই রেঞ্জের চাঁদপাই ষ্টেশন কর্মকর্তা মোঃ কামরুল হাসানজানান, জেংড়া থেকে আন্ধারমনিক পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকা নিষিদ্ধ রয়েছে । অবৈধ ভাবে ধরা পাচারের বিষয় ওই খাল এলাকার সংলগ্ন ফাড়িগুলো এই সব বিষয়ে দায়ভার ,তাদের সাথে কথা বলার জন্য বলেন । তবে তিনি কাউকেই টাকার বিনিময় সুন্দরবনে পাঠান না বলে দাবি করেন ।

খুলনা বন সংরক আমির হোসাইন চৌধুরী বলেন, বিষ দিয়ে মাছ শিকারকারীদের তালিকা করেছে বন বিভাগ। তাদের সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। না হলে আইনত ব্যবস্থা নেয়া হবে। বন বিভাগের খুলনা সার্কেল অফিস সূত্র জানায়, গত পাঁচ বছরে নিষিদ্ধ খালে মাছ শিকারের অপরাধে ৪০টির মতো মামলা দিয়ে আসামিদের জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।

বিভাগিয় বন কর্মকর্তা (সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ) মোঃ মাহমুদুল হাসান জানান, গত ২০১৭ সাল ১জুলাই থেকে চলতি বছরের ২৫ জুন পর্যন্ত তার অধিন চাঁদপাই ও শরনখোলা রেঞ্জে বিষ দিয়ে মাছ শিকারের দায়ে ১৪টি মামলা হয়েছে। ওই মামলায় ৩১জনকে আটক করা হয়েছে এবং ১৫জন আসামি পালাতক রয়েছে। এরমধ্যে মংলাস্থ চাঁদপাই রেঞ্জে ৯টি মামলা হয় ,আটক করা হয় ১৭ জনকে এবং ১১জন পালাতক রয়েছে ।

মংলাস্থ কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের সদর দপ্তরের অপারেশন কর্মকর্তা লেফট্যানেন্ট ইমতিয়াজ আলম জানান, সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ ধরায় শুধু এক প্রকারের মাছের তি হচ্ছে না, অন্য সব প্রজাতির মাছই ধ্বংস হচ্ছে, পাশাপাশি এর সঙ্গে বন ও পরিবেশের মারাত্মক তি হচ্ছে। সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ শিকারের প্রবণতা শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসতে কঠোর অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে কোস্টগার্ড। একই সঙ্গে জেলেদের যেসব মহাজন অধিক লাভের আশায় বিষ দিয়ে বনের খালে পাঠাচ্ছে তাদেরও চিহ্নিত করে ধরা হবে বলে জানান এ কর্মকর্তা।

লেফট্যানেন্ট ইমতিয়াজ আলম দাবি করেন, ২০১৮ সালের মে মাস থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত জব্দ করা হয়েছে ৪১৮ কোটি ৮৪লাখ ৩৬ হাজার টাকার অবৈধ জাল । একই সময় সুন্দরবন থেকে পাচার হয়ে আসা ফাইসা মাছের পোনা ১ কোটি ৬৭ লাখ পিচ ও চিংড়ি পোনা ১০কোটি ৫৫ লাখ ৫৯হাজার পিস জব্দ করা হয় । বন সম্পদের মধ্যে রয়েছে সুন্দরী গাছের লগ ২৫৬৭সিএফটি, পশুর গাছের লগ ২০৩ সিএফটি, গরান গাছের লগ ৯৬৪ সিএফটি জব্দ করেন এবং পাচার কালে আটক করা হয় কচ্ছপ ৮৬টি, তক্কক ১৩টি, হরিনের চামড়া ১১টি, হরিনের মাথা ৬টি, হরিনের মাংস ২৮৯ কেজি। তিনি আরও জানান এই পাচার কাজের সাথে জড়িত থাকার দায়ে হাতে নাতে আটক করা হয় ২৯৮ জন দুস্কৃতিকারিদের ।

স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বন,পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের উপমন্ত্রী বেগম হাবিবুন নাহার বলেছেন সুন্দরবন নিয়ে কোন অপব্যবহার ও অব্যবস্থাপনা মেনে নেয়া হবে না । যে-ই এ কাজে জড়িত হবে প্রমান পেলেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।