সাতকানিয়ায় আ.লীগের দুই নেতার ফেসবুক স্ট্যাটাসে তোলপাড়

Img

আওয়ামী রাজনীতির পদবিধারী দুই নেতার দুই ফেসবুক স্ট্যাটাস নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে সাতকানিয়ার সর্বত্র তোলপাড় চলছে। এ দু’টি স্ট্যাটাস শুধু রাজনৈতিক মহলে নয়, সাতকানিয়ার পথে-প্রান্তরে লোকমুখে আলোচনার খোরাক জুগিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সাতকানিয়ায় যুবলীগের নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠন নিয়ে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে যে চাপা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে দুই নেতার এ স্ট্যাটাস এই উত্তাপেরই অনিবার্য পরিণতি বলে রাজনৈতিক বিজ্ঞমহল ধারণা করছেন।

অন্যদিকে, আওয়ামী লীগাররা এ ফেসবুক বিতর্ক আগামী নির্বাচনে প্রভাব ফেলার পাশাপাশি কর্মীদের মাঝে দূরত্ব এবং নিজ নিজ বলয়ের কর্মীদের আরো সহিংস করে তুলবে বলে ধারণা করছেন। আলোচিত দুই রাজনীতিক হলেন: সাতকানিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কুতুব উদ্দীন চৌধুরী এবং চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য প্রফেসর ড. আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামুদ্দীন নদভীর স্ত্রী ও মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রিজিয়া রেজা চৌধুরী।

কুতুব উদ্দীন চৌধুরী ‘বাদশা-বেগম-গোলাম এর রাজনীতি’ শিরোনামে স্ট্যাটাস দেন। এর জবাবে রিজিয়া রেজা লিখেন, ‘সাতকানিয়ায় নেড়ি কুকুরের আবির্ভাব’। একে অপরকে এ ধরণের বিষেদগার করে দেয়া স্ট্যাটাস আওয়ামী লীগের তৃণমূলে যেমন হতাশার জন্ম দিচ্ছে, তেমনি বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরে আনন্দের খোরাকও যোগাচ্ছে।

গত ২২ এপ্রিল সন্ধায় (সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিট) ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কুতুব উদ্দীন চৌধুরী। একইদিন কুতুব উদ্দীনের ফেসবুক স্ট্যাটাসের জবাবে মধ্যরাতে (১১টা ৫৭মিনিটে) রিজিয়া রেজা চৌধুরী আরেকটি ফেসবুক স্ট্যাটাস দিলে সাতকানিয়ার সর্বত্র তোলপাড় শুরু হয়। চলতে থাকে নানা আলোচনা-সমালোচনা, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

কুতুব উদ্দীন চৌধুরী তাঁর ফেসবুক ওয়ালে দেয়া স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘বাদশা- বেগম-গোলাম এর রাজনীতি'। নতুন বউকে আনতে শ্বশুর বাড়িতে যাবেন খোকা, ছেলে প্রথমবার শ্বশুর বাড়ি যাবে মা বেশ উদ্বিগ্ন। হাবাগোবা ছেলেটি শ্বশুর বাড়িতে কি না কি করে বসে, মা বারবার ছেলেকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন মাথায় সবসময় টুপি পরে থাকতে, না হয় পরহেজগার শ্বশুর টুপি ছাড়া মেয়ে জামাইকে দেখে বেজার হতে পারেন। মায়ের আদেশ শিরোধার্য। তাই খোকাবাবু হাত দিয়ে টুপি চেপে ধরে শ্বশুরবাড়ি রওয়ানা হলেন, যেন কোনোমতেই মাথা থেকে টুপি ফসকে না যায়, পায়ে হেঁটে গ্রামের মেঠো পথ ধরে খাল-বিল পেরিয়ে খোকাবাবু অবশেষে শ্বশুর বাড়ি পৌঁছালেন। কিন্তু সর্বনাশ এ কি কা- নতুন জামাইকে অভ্যর্থনা জানানো দূরে থাক যেই সামনে আসছে পালিয়ে মুখ লুকাচ্ছে। কারণ কি ? শ্বশুরের সম্মান রাখতে মায়ের নির্দেশমত দুই হাতে মাথার টুপি রক্ষা করে পথিমধ্যে লুঙ্গি-কোর্তা খুইয়ে দিগম্বর অবস্থায় জামাই বাবু শ্বশুর বাড়ি পৌঁছে গেছেন। পরনে কাপড় না থাকলেও টুপি মাথায় জামাই বাবু সদর দরজায় দম্ভভরে অভ্যর্থনার অপেক্ষা করতে লাগলেন। আর এদিকে শ্বশুর বাড়ির লোকজন দুঃখ-ক্ষোভে বেশরম জামাই বাবুকে জামাই আদর অর্থাৎ ধবল ধোলাইয়ের ব্যবস্থা পাক্কা করে ফেললেন। রাজনীতিতেও এরকম বুদ্ধি প্রতিবন্ধী-তুল্য কিছু ব্যক্তি গজবের মত আচমকা নাজিল হয়ে হঠাৎ পাওয়া রাজত্বকে বাপ-দাদার তালুক মনে করে ক্ষমতার মোহে পাগল হয়ে হুঁশ-জ্ঞানহীন অবস্থায় দিগম্বরের মত ঘুরে বেড়াচ্ছে। হাজার হাজার নেতা- কর্মীর রক্তে গড়া প্রবিত্র সংগঠনকে নিয়ত অপ্রবিত্র করছে, কলুষিত হচ্ছে রাজনীতি, ছিটানো ভাতের লোভে উড়ে আসা এ সমস্ত কাউয়ারা নীতি-আদর্শের প্রতি নূন্যতম শ্রদ্ধাবোধ না দেখিয়ে নিজ হীনস্বার্থে দল পরিচালনা করতে চায়, সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়। নূন্যতম নীতি-আদর্শ থাকলেও এ সমস্ত লেবাসধারী কাউয়াদের হীনকর্মে রসদ যোগানো সম্ভব নয়। তারপরও যারা অতি উৎসাহী হয়ে বিশেষ উদ্দেশে হাওয়া দিচ্ছেন তাদের পরিণতি সময় নির্ধারণ করবে। এসব অতি উৎসাহীদের কথা ইতিহাসে ঘৃণাভরে উল্লেখ আছে। তেমনি একটি ঘটনা-বঙ্গবন্ধুর মায়ের মৃত্যুতে খন্দকার মোস্তাক সবাইকে অবাক করে ফ্লোরে গড়াগড়ি দিয়ে কান্নাকাটি করতে লাগলে মাতৃশোকে আহত বিশাল হৃদয়ের বঙ্গবন্ধু বললেন, শান্ত হও মোস্তাক। মায়ের মৃত্যুতে নিজের শোক বাদ দিয়ে উল্টো মোস্তাককে সান্তনা দিতে হল। বেঈমানের অতিভক্তি বঙ্গবন্ধুর মনে সংশয় জাগালেও নিশ্চুপ ছিলেন। আসলে এসব ফন্দিবাজ ও সহযোগীদের আচরণ সবসময় লোকদেখানো হয়, তাজা উদাহরণ সাতকানিয়ার দেয়ালে দেয়ালে ‘বঙ্গবন্ধু বৈশাখী মেলা’ নামের পোস্টার। কারো বুঝতে বাকি নাই এখানে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধার চাইতে নিজেদের হীনস্বার্থে মানুষকে বোকা বানানোই ছিল মূল উদ্দেশ্য আর এসব মতলববাজরা বরাবরের মত সমূলে উৎখাত হয়ে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে এবং হবে। রাজনৈতিক বেশ্যা রাজাকারের রক্তবীজ রাজা-রাণীর নির্লজ্জ কা-কারখানায় দলীয় নেতাকর্মী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সর্বসাধারণ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। ধৈর্য্যরে পরিচয়ে সবার নত মস্তকে থাকার চেষ্টাকে দুর্বলতা ভেবে আরো বেপরোয়া হয়ে বেশরম জামাইয়ের মত দম্ভের শেষ নাই। পরনের কাপড় না থাকলেও মাথার টুপি তো আছে, অসুবিধা কিছু দেখছেন না। ভাব-আচরণ যাই হোক পাবলিকের সিদ্ধান্তও এবার পাক্কা, ধবল ধোলাই। জনবিচ্ছিন্ন বাদশা-বেগম- গোলাম সবাই পুলিশ বেষ্টনীতে ঘুরে বেড়ায়, আর শালা-দুলাভাই, দেবর-ভাবী, ভাইপো- ভাগিনা, নাতি-নাতনি মিলে পরিবার- জোট গড়ে দস্যুতা করে সবকিছু দখল করতে চায়। আহাম্মকের গোষ্ঠী জানে না, দস্যুতা করে জায়গা-জমি দখল করা যায়, রাজনীতি বা সংগঠন নয়। হুমকি-ধমকি আর মামলা- হামলার ভয় দেখিয়ে নেতা-কর্মীদের বশে রাখার চেষ্টা করে লাভ নাই। বঙ্গবন্ধুর একটি কর্মী একটি দাবানল। অন্যায় অত্যাচারীদের পুড়িয়ে ছারখার করে দিবে। জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু।

অন্যদিকে রিজিয়া রেজা চৌধুরী তাঁর স্ট্যাটাসে লিখেন, কুকুরের কাজ কুকুর করেছে কামড় দিয়েছে পায়, তাই বলে কি কুকুরকে কামড় দেওয়া মানুষের শোভা পায়? এ কবিতাটির মর্ম আগে বুঝিনি। এখন হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছি। যুগে যুগে মানুষ নামধারী হিংস্র কুকুরদের আবির্ভাব হয়েছে হবে হতে থাকবে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর পরিবারকেও খন্দকার মুশতাক নামের পা- চাটা কুকুরেরা হত্যা করেছিল। ইদানিং সাতকানিয়ায় এক কুকুরের আবির্ভাব হয়েছে তাও নেড়ি কুকুর। চট্টগ্রামের ভাষায় যাকে নেড়ি কুত্তা বলে। তাও নেড়ি কুত্তার বংশধর নাকি ঘর জামাই হিসাবে আবির্ভূত। নিজের দেশে হাড্ডিগুড্ডি খেতে না পেরে সাতকানিয়ার আইডা খাওয়ার মতলবে পরাল্লো হিসেবে আগমন। এই নেড়ি কুত্তাকে যতক্ষণ আইডা ও হাড্ডি দেওয়া যায় ততক্ষণ ভালো থাকে, শেষ হলে আবার ঘেউ, ঘেউ। এই নেড়ি কুত্তার এখন বড় জ্বালা। চারিদিকে মেজবান চলে কিন্তু আইডা কেউ ছুড়ে মারে না। হায় আফসোস, হায় আফসোস। অনেক আশা ছিল মালিক ক্ষমতায় বড় বড় মেজবান হবে আইডা হাড্ডিগুড্ডি ও উচ্ছিষ্টের অভাব হবে না। সব আশায় গুড়ে বালি দিল প্রতিবেশী এক সিংহ। জ্বিহ্বা একহাত বের করলে হুংকার ছাড়ে। অনেক চেষ্টা করেও লেজ সোজা করতে না পেরে এই বেহায়া, বেশরম নেড়ি কুত্তাকে শায়েস্তা করার জন্য মালিক এক অভিনব পথ বের করলো। সিংহের সাথে পরামর্শ করে বেশী বেশী মেজবানের আয়োজন করলো এবং সেই মেজবানে সিংহ সমাজের কর্মঠ, দক্ষ, অভিজাতদের দাওয়াত করতে লাগল। তখন সহ্য করতে না পেরে এই নেড়ি কুত্তার ঘেউ ঘেউ আরো বেড়ে গেল। সমাজের লোকেরা এই নেড়ি কুত্তার ঘেউ ঘেউ সহ্য করতে না পেরে দূর, দূর, ছেই, ছেই করতে লাগল। তবু জ্বিহ্বার লালা সংবরণ করতে না পেরে এই বেহায়া, নির্লজ্জ, ঘর জামাই নেড়ি কুত্তা মানুষ কামড়াতে লাগল। সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি : এইসব ভাদ্র মাসের পাগলা কুকুর হইতে সাবধান। (উল্লেখ্য, উভয়ের ফেসবুক স্ট্যাটাসের কিছু শব্দগত ত্রুটি সংশোধন করে ছাপানো হলো।)

এ ব্যাপারে ছদাহা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মী বলেন, দীর্ঘ দুই বার একাধারে ক্ষমতায় থাকার পরও সাতকানিয়ায় আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে শক্ত অবস্থানে নাই। এরমধ্যে ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়ে এক জনের প্রতি আরেক জনের বিষেদগার করে কথাবার্তা মোটেই শোভনীয় নয়। এরকম প্রকাশ্য মন্তব্য থেকে বিরত থাকতে হবে দলের স্বার্থে।

দুই স্ট্যাটাস সম্পর্কে দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান বলেন, এগুলো কাদা ছোড়াছুড়ি ছাড়া আর কিছু নয়। এ ধরণের কথাবার্তা বলার আগে সংযত হওয়া উচিৎ। আগামী নির্বাচনে সবাই যদি ঐক্যবদ্ধ না থাকে তাহলে বিজয় নিশ্চিত করা কঠিন হবে। তাই সব ধরণের বিষেদগার থেকে বেরিয়ে দলের স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।

প্রতিক্রিয়া মন্তব্য শেয়ার