সাতকানিয়ায় অর্শতাধিক ইটভাটা, পোড়ানো হচ্ছে কাঠ

Img

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায় গড়ে উঠেছে অর্ধশতাধিক ইটভাটা। এসব ভাটার জন্য নিয়মিতই কাটা হচ্ছে পাহাড়। পাশাপাশি ইট পোড়াতে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের জন্য কাটা হচ্ছে বনের গাছ।

এসব ইটভাটার কালো ধোঁয়ায় একদিকে স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়েছে ভাটার পাশের বাসিন্দারা, অন্যদিকে ফসলি জমি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন অনেক কৃষক। তবে স্থানীয় প্রশাসন বলছে, পরিবেশের ক্ষতি করে কোন কাজ করতে দেয়া হবেনা কাউকে।

সরেজমিন দেখা গেছে,  চট্টগ্রামের সাতকানিয়া-বাঁশখালী সীমান্তের এওচিয়া ইউনিয়নের চূড়ামণি এলাকায় গড়ে উঠা ১৭টি ইটভাটার চারদিকে রয়েছে সবুজ পাহাড়। আর এসব পাহাড়ে রয়েছে সরকারি-বেসরকারীভাবে গড়ে উঠা গাছের বাগান। অন্যদিকে ইটভাটাগুলো স্থাপন করা হয়েছে অসংখ্য পাহাড় ও টিলা কেটে। কয়েকটি ভাটায় নিষিদ্ধ প্রযুক্তির ড্রাম চিমনীও রয়েছে। আর ভাটাগুলোতে দেদারছে পোড়ানো হচ্ছে পার্শ্ববর্তী বনাঞ্চলের কাঠ।

অপরদিকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সাতকানিয়া উপজেলাধীন মৌলভীর দোকান হতে শিশুতল পর্যন্ত ৫ কিলোমিটার দূরত্বে রয়েছে ৩৫টি ইটভাটা। এসব ভাটার অধিকাংশে অবৈধভাবে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। অবৈধ ভাবে গড়ে উঠা এসব ভাটাগুলোতে বনাঞ্চল উজাড় করে প্রতিদিন হাজার হাজার মণ কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে ও কৃষিজমির মধ্যে এসব ইটভাটা গড়ে উঠেছে। যার অধিকাংশ ভাটার কোন বৈধ অনুমতি আছে কিনা সন্দেহ রয়েছে।

গত কয়েক বছরে এসব ইটভাটার প্রভাবে এলাকার অনেক কৃষি জমি বিশাল বিশাল গর্তে পরিণত হয়ে কৃষি জমির শেষ চিহ্নটুকু পর্যন্ত মুছে যাচ্ছে। এসব ইটভাটার বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় বিপন্ন হচ্ছে উপজেলার পরিবেশ। এতে ভাটার আশপাশের গ্রামীণ জনপদের জনস্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

সরকারের পরিবেশ আইন অনুসারে ইটভাটা স্থাপনে সম্পূর্ণ বিধি-নিষেধ থাকলেও এসব কিছুর তোয়াক্কা না করে এখানকার ভাটা মালিকেরা তাদের অবৈধ কার্যক্রম পুরোদমে চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারি আইন যেন তাদের কাছে ছেলের হাতের মোয়া।

অস্বীকার করার উপায় নেই যে ইট আমাদের আধুনিক সভ্যতার অতি প্রয়োজনীয় একটি উপাদান। আরো আধুনিক যুগে প্রবেশের সাথে সাথে ইটের বিবিধ ব্যবহার বেড়েই চলছে। কিন্তু ইট উৎপাদনের ক্ষেত্রে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব একটি বড় বাঁধা। বিশেষ করে কৃষিজমি ও কাঠের ব্যবহার এবং তার ফলে উৎপাদিত কালো ধোঁয়া সবচেয়ে বড় ক্ষতির কারণ।

ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন নিয়ন্ত্রণ আইনে (২০১৩) নিষেধ থাকা সত্ত্বেও সাতকানয়িার বেশির ভাগ ভাটাই স্থাপন করা হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কৃষিজমি, বনাঞ্চল, পাহাড়ের পাদদেশ ও লোকালয় তথা মানুষের বসতবাড়ির এক কিলোমিটারের মধ্যে। ফলে পরিবেশ বিপর্যয়সহ জনস্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে।

সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, ইটভাটার কালো ধোঁয়ায় কারণে মানুষের শ্বাসকষ্ট হতে পারে। ফুসফুসে বিভিন্ন রোগ দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া ধুলাবালু থেকে অ্যালার্জি, চুলকানিসহ বিভিন্ন চর্মরোগ হতে পারে। হাঁপানি রোগ দেখা দিতে পারে।

ভাটার কালো ধোঁয়ার কারণে উপজেলার রসুলাবাদ সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসা, জাফর আহমদ চৌধুরী কলেজ, রসুলাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর সাতকানিয়া আলী আহমদ প্রাণহরি উচ্চ বিদ্যালয়, ওবাইদিয়া মাদ্রাসা ও ছদাহা কে কে উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত প্রতিকূল পরিবেশের সম্মুখীন হচ্ছে।

জাফর আহমদ চৌধুরী কলেজের এইচএসসি প্রথম বর্ষের ছাত্র মিজবাহ উদ্দিন ও ছদাহা কে কে উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬ষ্ট শ্রেনির ছাত্র খোরশেদ আলম বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানের পাশেই ইটভাটা। সকালের রোদ বাড়ার সাথে সাথে ইটভাটার ধোঁয়ার কারণে ক্লাসে খুব কষ্ট হয়।

কেঁওচিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মনির আহমদ বলেন, সাতকানিয়ার সমস্ত ইটভাটা বন্ধ হয়ে যাক। ইটভাটার মাটি কাটতে কাটতে কেরানীহাটের উত্তর পশ্চিম পার্শ্বে বিশাল এলাকা গভীর গর্তে পরিণত হয়েছে। ইটভাটার স্তুপকৃত মাটির কারণে বর্ষা মৌসুমে বন্যার পানি জমে দীর্ঘদিন আটকে থাকার কারণে অনেকে পানিবন্দী জীবন যাপন করেন। ইটভাটার কারণে কেরানীহাট এলাকায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশের অনেক মূল্যবান গাছ মরে গেছে। তাছাড়া ডাম্পারে (মিনি ট্রাক) ইটভাটায় মাটি নিয়ে যাওয়ার কারণে মহাসড়কে গাড়ি থেকে মাটি পড়ে তার উপর বৃষ্টি হলে রাস্তা পিচ্ছিল হয়ে বিগত দিনে অনেক দুর্ঘটনাও ঘটেছে।

সাতকানিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রতাপ চন্দ্র রায় বলেন, উপজেলার অর্ধশতাধিক ইটভাটায় যে হারে জমির টপসয়েল ব্যবহার করা হচ্ছে তার ক্ষতি বলে শেষ করা যাবে না।

সাতকানিয়া ব্রিকফিল্ড মালিক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ নেজাম উদ্দিন বলেন, যারা পাহাড় কাটে তাদের সাথে আমাদের সমিতির সম্পর্ক নেই।

চট্টগ্রাম মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক মুখলেছুর রহমান ফরহাদী বলেন, সাতকানিয়ার যত্রতত্র ইটভাটার কারণে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য আজ হুমকীর মুখে।

সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোবারক হোসেন বলেন, যেখানে পাহাড় কাটা হচ্ছে সেখানে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নিব, যারা পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের ছাড়পত্র নিয়ে বৈধভাবে ভাটা পরিচালনা করে কাঠ পুড়াচ্ছেন তাদের বিরুদ্ধে শীঘ্রই অভিযান পরিচালনা করা হবে।

তিনি বলেন, উপজেলায় অনেকগুলো অবৈধ ইটভাটা থাকলেও হাইকোর্টে ভাটা মালিকদের রিটের কারণে এসব ভাটায় অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হয়না।

প্রতিক্রিয়া মন্তব্য শেয়ার