শেরপুর ৯ নং ওয়ার্ড: নাগরিক সুযোগ-সুবিধা যেন তাদের কপালে নেই!

শেরপুর পৌরসভার ওয়ার্ড পরিক্রমা ১১ ও শেষ পর্ব।

Img

বগুড়া শেরপুর পৌর শহরের ৯ নম্বর ওয়ার্ডটি সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা হলেও ,এই ওয়ার্ডের বাসিন্দারা পান না কোন পৌর নাগরিকের সুযোগ-সুবিধা। অথচ বছরের পর বছর তার পরিশোধ করছেন পৌর টেক্স। ওয়ার্ডের বাসিন্দা নানান সমস্যায় জর্জরিত, প্রায় সকল রাস্তাঘাটেরই  বেহালদশা, ভাঙাচোরা ড্রেনের গাইড ওয়াল এর কারণে বর্ষার সামান্য বৃষ্টিতে বাঁধে জলাবদ্ধতা,ডাস্টবিনের অভাবে সড়কের দুপাশে ময়লা আবর্জনার স্তুপ সাথে আছে মশা-মাছি ও শুকুরের উপদ্রপ।

জানা যায়, শেরপুর পৌরসভার খন্দকার পাড়া ও বারোদুয়ারীপাড়া নিয়ে গঠিত ৯ নং ওয়ার্ড। আয়তনে ১.৩ বর্গ কিলোমিটার।ওয়ার্ডটিতে মোট জনসংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। মোট ভোটার সংখ্যা ২.৮৩৬ জন। শিক্ষিতের হার প্রায় ৬০ শতাংশ। অধিকাংশ বাসিন্দাই ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবী এবং রাজনীতিবিদ। ওয়ার্ডটিতে রয়েছে একটি বেসরকারি  প্রাথমিক বিদ্যালয়, দুটি বেসরকারি ক্লিনিক, শেরপুর বারদুয়ারী হাট, শেরপুর রেজিস্ট্রি অফিস, মসজিদ একটি, ঈদগামাঠ একটি, মন্দির একটি।

সরজমিনে গিয়ে কথা হয় ৯ নম্বর ওয়ার্ডের খন্দকার পাড়ার বাসিন্দা আবু কাইয়ুম খাজার সাথে। তিনি প্রবাসীর দিগন্তের এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘গত পাঁচ বছরে আমাদের এই ওয়ার্ডের রাস্তাঘাট, ড্রেন, কালভার্ট কোনকিছুরই কোনো কাজ হয়নি। বারদুয়ারী হাট ও রেজিস্ট্রি অফিসের সকাল বাজারের সামনের রাস্তাঘাটগুলো একেবারেই চলাচলের অনুপযোগী এবং ড্রেনগুলো কখনোই ঠিকমতো পরিষ্কার করে না। রেজিস্ট্রি অফিসের সামনের ড্রেন ১৫ দিন পর পরিষ্কার করলেও ময়লা আবর্জনা রাস্তার দু'পাশে ফেলে রেখে যায়। যা পরবর্তীতে শুকুরের দল এসে রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলে। এই শুকুরের উপদ্রবে নামাজ পড়া ঠিকমতো হয়না, কারণ নামাজ পড়তে মসজিদে যাব, শুকুরের দল রাস্তাজুড়ে অবাধ বিচরণ করছে এবং রাস্তায় মলমূত্র ত্যাগ করছে। এভাবে কী ঠিকমত নামাজ হবে? বলা যায় অনেকটা সুইপার পট্টিতে পরিণত হয়েছে আমাদের এই ৯ নম্বর ওয়ার্ডটি। এ বিষয়ে কাউন্সিলরকে বার বার জানালেও তার কোনো কর্ণপাত করেন না।’ 

খন্দকার পাড়ার বাসিন্দা গোলাম রসূল প্রবাসীর দিগন্তকে বলেন, ‘আজ পাঁচ বছর ধরে রেজিস্ট্রি অফিসের সামনে ব্যবসা করছি কিন্তু কোন দিন দেখি না দোকানের সামনে ড্রেনের ঠিকমতো পরিষ্কার করে নিলেন কাউন্সিলর। ওয়ার্ডে আছে মশার উপদ্রব। আজ পর্যন্ত কখনোই দেখলাম না কাউন্সিলরকে মশা মারার ঔষুধ দিতে। এছাড়াও সড়কের পাশের ড্রেনগুলোর গাইডওয়াল ভাঙ্গা তাই সামান্য বৃষ্টিতেই সড়কে জলাবদ্ধতায় সৃষ্টি হয়।’

গোলাম রসুল আরো বলেন, ‘বাস-সিএনজি ও হাট বাজার থেকে যে অর্থ রাজস্ব আদায় হয় তার ১ শতাংশ ওয়ার্ডের উন্নয়নে কাজে ব্যয় করে না।’

বারদুয়ারী পাড়ার বাসিন্দা কায়কোবাদ বলেন, ‘পৌর ট্যাক্স দেই কিন্তু পৌর নাগরিকের কোনো সুবিধা পায় না। রেজিস্ট্রি অফিস হতে ২ শতাংশ টাকা যায় পৌরসভায় কিন্তু তার কোনো প্রকার ওয়ার্ডের উন্নয়নে ব্যয় হয় না। আমরা পৌর নাগরিক সুবিধা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। এই ওয়ার্ডের সুবিধাভোগী কার্ডগুলো পর্যন্ত পুরুষ ও নারী কাউন্সিলর বিতরণ করেন শুধুমাত্র কাউন্সিলরদের আস্থাভাজন নিকটাত্মীয়দের মাঝে অথচ ইহা যাদের প্রাপ্য তারা কেউ পায় না। এই ৯ নম্বর ওয়ার্ডের হাট-বাজার ও রেজিস্ট্রি অফিস থাকার কারণে অনেক লোকের সমাগম হয় কিন্তু কোন পাবলিক টয়লেট নেই এখানে।

শেরপুর পৌরসভা ৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফিরোজ আহমেদ জুয়েল প্রবাসীর দিগন্তকে বলেন, ‘গত পাঁচ বছরে আমার নির্বাচনী এলাকায় নানান সমস্যা রয়েছে। জনগণের স্বার্থে ও ওয়ার্ডের উন্নয়নের জন্য যেসব কাজ করার কথা ছিল বা ওয়াদাবদ্ধ ছিলাম তা আমি সম্পূর্ণ করতে পারেনি। তার মূল কারণ পৌরসভার আর্থিক সংকট এবং ওয়ার্ডের উন্নয়নের জন্য চাহিদামত বরাদ্দ না পাওয়ার কারণে। এছাড়াও আছে করোনা মহামারীর কারণে জনসেবা ও ওয়ার্ড উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত ওয়ার্ডবাসী। এরপর স্বল্পআয়ের মধ্যে দিয়ে জনগণের যতটুকু সেবা দেয়া সম্ভব হয়েছে তা দেয়ার চেষ্টা করেছি।’

কাউন্সিলর জুয়েল রাস্তাঘাট প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমার নির্বাচনী এলাকায় সড়ক কালভাট ব্রিজ ইলেকট্রিসিটি ব্যবস্থাসহ মোটামুটি সব কিছুরই প্রয়োজন কিন্তু পৌরসভা থেকে পর্যাপ্ত বরাদ্দ না পাওয়ার কারণে কোনো সেবায় প্রধান করা সম্ভব হয়নি।’

ভাঙ্গা গাইডওয়াল প্রসঙ্গে কাউন্সিলর জুয়েল ড্রেনের প্রবাসীর দিগন্তকে বলেন, ‘আমার এই ওয়ার্ডে যতোটুকু ড্রেন রয়েছে তার অধিকাংশ অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। যার ফলে ড্রেনের পানি কোথায় গড়াবে? তার নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ না করার কারণে ড্রেনের পানিতে  সড়কগুলোতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এই ৯ নম্বর ওয়ার্ডে কিছু সরকারি খাস ডোবা ও খাল  ছিল। সেগুলো একসময়ে ড্রেনের পানি ধারণক্ষমতা রাখত। কিন্তু খালগুলো হঠাৎ করে শেরপুর ভূমি অফিস কর্তৃক বিভিন্ন ব্যক্তিদের লিজ প্রদানের ফলে সেইসব খালগুলো ভরাট করে তারা স্থাপনা নির্মাণ করেন। ফলের ড্রেনের পানি আর নিষ্কাশন হচ্ছে না।’

‘ডাস্টবিন, ময়লা আবর্জনা ও শুকুরের সমস্যা প্রসঙ্গে কাউন্সিলর জুয়েল বলেন,এই ওয়ার্ডে দুইটি ডাস্টবিন রয়েছে। তবে তা ওয়ার্ড বাসীর জন্য পর্যাপ্ত নয়। এছাড়াও স্থানীয়রা ডাস্টবিন স্থাপনের জন্য বাড়ির সামনের জায়গা দিতে চায় না ফলে ডাস্টবিন প্রয়োজনীয় প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হয়নি।’
 
তিনি আরও বলেন, ‘শুকুরের সমস্যাটা শুধু আমার ওয়ার্ডে নয় সারা শেরপুর জুড়েই। এই শুকুরের অবাধ বিচরণের জন্য মুসলিম ও হিন্দু ধর্মালম্বীরা দীর্ঘদিন থেকেই আমার কাছে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ করে আসছেন। এ বিষয় নিয়ে আমি শেরপুর পৌর মেয়র এর শরণাপন্ন হই। তিনি বিষয়টি নিয়ে শেরপুর উপজেলা প্রশাসন ও শেরপুর থানা পুলিশ কর্মকর্তাদের সাথে নিয়ে শুকুর পালকদের সাথে কথা বলেন। শুকুর পালন করে কিছুদিন শুকুরকে আটকে রাখল, পরবর্তীতে তাহারা কথা শোনে না।’

অপরদিকে সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর এস এম ফরিদা হক জুয়েল বলেন, ‘আমি গত পাঁচ বছরে সংরক্ষিত ৭, ৮, ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের জন্য আসা বিভিন্ন সরকারি বরাদ্দ ও  সুবিধাভোগী কার্ড পুরুষ কাউন্সিলরদের সাথে সমন্বয় করে ওয়ার্ডের বাসিন্দা ও  সুবিধাভোগীদের মাঝে বিতরণ করেছি। এছাড়াও ওয়ার্ডগুলোর  উন্নয়ন কাজের বরাদ্দকৃত অর্থ দিয়ে সড়ক, ড্রেন, স্লাবসহ নানান উন্নয়ন কাজ সমাপ্ত করতে চেষ্টা করেছি। তবে করণা মহামারীর কারণে কিছু কাজ সমাপ্ত করা সম্ভব হয়নি।’

প্রতিক্রিয়া মন্তব্য শেয়ার