শেরপুরের ঐতিহ্যবাহী দই পৃথিবী সেরা

image
image

বগুড়া জেলার শেরপুর উপজেলায় অতীত সংস্কৃতির গৌরবময় অংশ জুড়ে আছে সুস্বাদু দই। দুইশতাধিক বছর আগে ঐতিহ্যবাহী দই তৈরি হয়েছিলো বগুড়ার শেরপুর পৌর শহরের ঘোষ পাড়ায়। সেই দই ছিলো মহিষের দুধের।

শেরপুর এবং ধুনট উপজেলার বিস্তীর্ণ গ্রামের মাঠে চড়ে বেড়াতো মহিষ। শেরপুর শহরের ঘোষ পাড়ায় জেলার সবচেয়ে বড় দুধের বাজার বসতো। এরপর সেই দুধে তৈরি দইয়ের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে দেশ বিদেশ সর্বত্র। সে সময় মাটির ডুঁকি’তে দই তৈরি হতো। কালের বিবর্তনে কমতে শুরু করে মহিষ। এখন অবশ্য গরুর দুধের দই তৈরি হয়। তবে স্বাদ আছে আগের মতই। এখন তা মাটির সরা এবং গ্লাসে বিক্রি হয়। 

শেরপুরের দই দিয়েই মূলত বগুড়ার দই পরিচিতি পায়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দই তৈরি হলেও বগুড়া শেরপুরের দইয়ের সঙ্গে তুলনা হয়না। বগুড়ায় যে কোন আচার অনুষ্ঠান এবং অতিথি আপ্যায়নে দই চাইই চাই। দই খেতে যেমন সুস্বাদু তেমনি পুষ্টিকর। চিনিপাতা এবং ক্ষিরসা পাতি দই সাধারণত খুব চলে। শেরপুরের তৈরি ঘোলের চাহিদাও বেশ।

শেরপুরের ঐতিহ্যবাহী দই পৃথিবী সেরা probashirdiganta

সম্প্রতি অতি লোভী কিছু ব্যবসায়ী নিম্ন মানের দই তৈরি করছেন। বিভিন্ন স্থানে তা সরবরাহ করে বগুড়ার দইয়ের ঐতিহ্য এবং সুনাম নষ্ট করছেন। শেরপুর থেকে প্রতিদিন লক্ষাধিক সরা এবং গ্লাস দই বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ হয়। প্রতিদিন বিভিন্ন কোচের অসংখ্য যাত্রীরা শেরপুর বাস স্ট্যান্ড থেকে দই কিনে নিয়ে যান।

শেরপুর শহরের বিখ্যাত দইয়ের কারিগরদের একজন পলাশ রায়। তিনি প্রবাসীর দিগন্তকে জানান সুস্বাদু এ দই তৈরির প্রক্রিয়া। তিনি জানান, ভালো মানের দইয়ের জন্য দরকার খাঁটি দুধ। তিনি ১৮বছরের উপরে দই তৈরি করছেন। এক মণ দুধ থেকে ৩০থেকে ৩২টি সরা দই হয়। প্রথমে এক মণ দুধ বড় কোন কড়াইতে নিতে হবে। সেখান থেকে ৭কেজি পরিমাণ দুধ আলাদা করে একটি সসমেনে তুলে নিতে হবে। এক চা চামচের ৪ভাগের এক ভাগ দই নিয়ে সসমেনের দুধের সঙ্গে ভালো করে ফেটে মিশিয়ে নিতে হবে। সেই সসমেন চুলার পাশে রেখে দিতে হবে। এবার কড়াইয়ের দুধ মাঝাড়ি আঁচে জ্বাল করতে হবে। তেতুল অথবা বেল কাঠ হলে ভালো হয়। এক মণ দুধ জ্বাল করতে এক মণ খড়িই (লাকড়ি) লাগবে। ইউক্লিপটাস বা অন্যকোন জাতের হলে প্রতি মণ দুধের জন্য ৫০ কেজি খড়ি লাগবে। জ্বাল করে দুধের ভেতর থেকে পানি শুকিয়ে নিতে হবে। এসময় কিছুটা সময় পরপর খুনতি দিয়ে দুধ নাড়তে হবে যেত উতলে না পড়ে। 

শেরপুরের ঐতিহ্যবাহী দই পৃথিবী সেরা probashirdiganta

তিনি বলেন, এভাবে ৬ ঘণ্টা জ্বাল করতে হবে। দুধ যতো জ্বাল হবে দই ততই ভালো হবে। দুধ ভালোভাবে জ্বাল হয়ে গেলে তাতে ৬ কেজি পরিমাণ চিনি দিতে হবে এবং ভালোভাবে নাড়তে হবে। চিনি দেয়ার পর ভালোভাবে বলক তুলে চুলার আঁচ কমিয়ে দিতে হবে। এবারে মাটির সরাগুলোকে চুলার ধার দিয়ে গোল করে সাজিয়ে রাখতে হবে। পাত্র দিয়ে দুধগুলো সেই সরায় ঢালতে হবে। ঢালা শেষে কড়াই সরিয়ে রাখতে হবে। এরপর ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। আগেই সসমেনে রাখা দইয়ের বীজ সেখানে সেভাবেই রাখতে হবে। এবার সমস্ত সরাগুলো বড় ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। 

পলাশ রায় আরও জানান, এভাবে রাখার পর দেড় থেকে পৌনে ২ ঘণ্টা পর ঢাকনা তুলে রাখতে হবে। ততক্ষণে সরা কিছু দুধ চুষে নেবে। এবার বীজগুলো একটা পাত্র দিয়ে সরা পরিপূর্ণ করে ঢালতে হবে। সবগুলো পরিপূর্ণ হয়ে গেলে আবারো ঢাকনা দিয়ে ঢাকতে হবে। এভাবে দেড় থেকে পৌনে ২ ঘণ্টা পর আবারো ঢাকনা তুলতে হবে। সরা থেকে আবারো কিছু দুধ শুকিয়ে যাবে এবং সসমেনের বীজ দিয়ে সেগুলো আবারো পরিপূর্ণ করতে হবে। এরমধ্যে চুলার ভেতরে থাকা কয়লার আঁচ সঠিক মাত্রার চেয়ে কমেগেলে কয়লা দিতে হবে। তারপর আবারো ঢাকনা নামিয়ে দিতে হবে। এভাবে ৪ ঘণ্টা পরে ঢাকনা তুললে সরায় দুধ জমে পুরিপূর্ণ দই হয়ে থাকবে। এটাকে বলে চিনিচম্পা দই।

শেরপুরের ঐতিহ্যবাহী দই পৃথিবী সেরা Probashirdiganta

ঘোল খেতে চাইলে একই প্রক্রিয়ায় শুধু সরার পরিবর্তে পাতিল ব্যবহার করতে হবে। দই হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে তাতে পরিমাণ মত লবণ এবং চিনি মিশিয়ে ফেটিয়ে নিতে হবে। এরপর তা ছাকনা দিয়ে ছেঁকে বোতলে ভরতে হবে।

ক্ষিরসাপাতি করতে চাইলেও একই ভাবে করতে হবে। মাঝারি আঁচে দুধ জ্বাল না করে বেশি আঁচে দুধ জ্বাল করতে হবে। চিনি মিশিয়ে বলক ওঠার পরে তাতে ২ মণ দুধে ৫শত গ্রাম পরিমাণ গুড়া দুধ হালকা গরম দুধ দিয়ে ফেটে নিতে হবে। এরপর কড়াইয়ের সবগুলো গরুর দুধে বলক তুলে নিতে হবে। তারপর সরায় ঢেলে চিনিপাতা দইয়ের মত করে বানাতে হবে।

শেরপুর শহরের ঘোষপাড়ার পুরাতন দই ব্যবসায় এবং পৌর কাউন্সিলর নিমাই ঘোষ প্রবাসীর দিগন্তকে জানান, ২ শতাধিক বছর আগে এই শহরের ঘোষ পাড়ার কিছু মানুষ দই তৈরি করে। এটা পুষ্টিকর এবং খেতে খুবই সুস্বাদু হয়। সে সময় মহিষের দুধের দইয়ের সুখ্যাতি দেশ ব্যপি ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৯০সাল পর্যন্ত মহিষের দুধের দই ছিলো। কিন্তু কালের বিবর্তণে মহিষ হারিয়ে যাওয়ায় এখন গরুর দুধেই দই তৈরি হয়। এটাও সুস্বাদু এবং সারাদেশে এখানকার দই সরবরাহ হয়। ইদানিং কিছু অসাধু ব্যক্তি নিম্নমানে দই তৈরি করে বিভিন্ন দোকানে বিক্রি করছেন। দুধ জ্বাল দিয়ে তার ক্রীম তুলে নিচ্ছেন। জ্বাল ঠিকমত না দিয়ে ওষুধ দিয়ে দই জমাচ্ছেন। সেই দইগুলো পাতলা হচ্ছে এবং সেগুলোর দামও কম রাখছেন। এতে বগুড়ার দইয়ের সুনাম নষ্ট হচ্ছে। 

শেরপুরের ঐতিহ্যবাহী দই পৃথিবী সেরা

তবে শেরপুরের পুরাতন ব্যবসায়ী এবং ঘোষরা সেই কাজ কখনোই করেনা। শেরপুরের দই শুধু শেরপুরের মধ্যেই থাকেনা। দেশের বিভিন্ন স্থানে এখানকার দই সরবরাহ হয়। শুধু শেরপুর থেকেই প্রতিদিন লক্ষাধিক সরা দই সরবরাহ হয় বলেও জানান তিনি।

শেরপুর পৌর শহরের বাস স্ট্যান্ডে একটি রেস্টুরেন্টে দই কিনতে আসা আল আমীন প্রবাসীর দিগন্তকে জানান, তার গ্রামের বাড়ি জয়পুরহাট জেলায়। ঢাকায় একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত আছেন। স্বপরিবারে ঢাকাতেই থাকেন। ঢাকা বগুড়া দুই জায়গাতেই দই পাওয়া যায়। কিন্তু দই বলতে যেটা বোঝায় তা শুধু বগুড়ার দইতেই আছে। এখানকার দইয়ের স্বাদটাই ভিন্ন। এই সড়ক দিয়ে যাতায়াতের সময় তিনি দই নেয়ার চেষ্টা করেন। তার ঘনিষ্টরাও অনেক সময় বগুড়া থেকে দই নিয়ে যাওয়ার জন্য বায়না ধরেন।

শেরপুর উপজেলার নামকরা দই ব্যবসায়ী বিপ্লব বষাক প্রবাসীর দিগন্তকে জানান, শেরপুরে কী পরিমাণ দই তৈরি হয় তা বলা মুস্কিল। এটা নির্ভর করে দুধের আমদানির উপরে। শেরপুর শহরে অসংখ্য দই কারখানা আছে। এর বাহিরেও মহিপুর, ভবানীপুরসহ প্রত্যেক গ্রামে অনেক কারখানা আছে। সেই কারখানাগুলোতে অসংখ্য দই তৈরি হয় এবং বগুড়া জেলার বিভিন্ন দোকানেসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ হয়। তবে ভালো দই এখন পর্যন্ত শুধু শেরপুরে কারখানার শোরুম গুলোতেই বিক্রি হয়। শেরপুরের দই বাণিজ্যিকভাবে দেশের বাহিরে রপ্তানি হয়না। দই বেশি নাড়ালে নষ্ট হয়ে যায় এবং বেশি দিন সংরক্ষণ করা যায়না। দই বাসি হওয়ার সাথে স্বাদও নষ্ট হয়ে যায়। তাই বিদেশে রপ্তানি হয়না। তবে বিদেশে যাবেন এমন অনেকে যাওয়ার আগ দিয়ে দই কিনে নিয়ে যান।

প্রতিক্রিয়া মন্তব্য শেয়ার