বিজেপি নেত্রী হৃতম্বরার একটি উক্তি দিয়ে শুরু করছি আমাদের উপমহাদেশকে রাম রাজ্যে পরিণত করার আগ্রাসন নীতি নিয়ে: " Wherever you find ruins, Wherever you come upon broken monuments, you will find the signature of Islam, Wherever you find creation, you discover the signature of Hindu". অর্থাৎ যেখানেই কোনো ধ্বংসের চিহ্ন দেখবে, যেখানেই কোনো ভগ্ন স্তম্ভ দেখবে, তাতে পাবে ইসলামের স্বাক্ষর। আর যেখানেই কোনো সৃষ্টি দেখবে, সেখানেই আবিষ্কার করবে হিন্দুর স্বাক্ষর।

আমরা ভারতকে এমন একটি দেশ হিসেবে সমীহ করি, যে দেশ আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সর্বাত্মক সহায়তা করেছিল। যদিও স্বার্থের প্রশ্নে এখানে সবকিছু পরিষ্কার। তবে এ কথা সত্যি যে, একজন প্রতিবেশী যদি ভালো হয় তবে সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ, আর যদি খারাপ হয় তবে তা অত্যান্ত দুঃখজনক। কিন্তু অতীত ও বর্তমান অবস্থা দৃষ্টে আমাদের দেশের জনগণের অভিজ্ঞতা অত্যান্ত তিক্ত। তার নমুনা ক্রিকেট থেকে কিছুটা আঁচ করা যায়। 

কিছু বিশেষজ্ঞ ও দেশের আপামর জনগণ মনে করেন, তৎকালীন সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার সাজানো এক অরাজক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসীন হয়েছিল। এর পেছনে ভারতসহ কিছু বিদেশী শক্তির হাত ছিল। রাজনীতি ও সংস্কৃতির পথ ধরে এরা এ দেশে প্রবেশ করছে এবং ভারতপন্থী বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে ‘র’ খুবই সক্রিয়। 

আমাদের দেশের শান্তিকামী জনগণ এটা ভেবে খুবই অবাক হয় যে, ভারত কেন তার মিত্র মুজিব সরকারের সাথে প্রতারণাপূর্ণ আচরণ করেছিল? কেন বাংলাদেশকে পরনির্ভর করতে মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির পরিকল্পনা করা হয়েছিল? কেন বাংলাদেশকে সাহায্যের পরিবর্তে ভারত ফারাক্কা নির্মাণ করেছে? ভারত কিসের ভিত্তিতে তার প্রতিবেশীদের সাথে এমন আচরণ করে? এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে আসুন তাকাই বন্ধু প্রতিমদের নীতি বা মতবাদের দিকে। 

আসলে, অখণ্ড ভারতে নেহরুর বিশ্বাস থেকেই নেহরু ডকট্রিনের উদ্ভব, যাকে গান্ধী আরো মোলায়েম স্বরে বলতেন: ‘রাম রাজ্য’। তবে কি আমরা সেই দিকে ধাবিত হচ্ছি?

আজকে কাশ্মীরের দিকে দেখুন; জম্মু ও কাশ্মীর, ভারতের কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল যা এতদিন স্বতন্ত্র রাজ্য ছিলো। কিন্তু ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী চালিত ভারতের সরকার সংসদের উভয় কক্ষে ব্যাপক সমর্থন নিয়ে গত ৫ই আগষ্ট ২০১৯ এ ভারতীয় সংবিধানের জম্মু ও কাশ্মীর এর বিশেষ মর্যাদা ধারা ৩৭০ ও ধারা ৩৫ক রদ করে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল তৈরী করে, যথা: জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ। যদিও এখানে কাশ্মীরের জনগণের ইচ্ছা-আকাঙ্খার প্রতিফলনতো ঘটেনি বরং তাদের নিঃস্তব্দ করতে সেখানে পাঠানো হয়েছে লাখে লাখে সেনা এবং বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে বিশ্ব থেকে। 

ইতিহাস বলে, ১৯২৫ সালে হরি সিং কাশ্মীরের রাজা হন। ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা লাভ পর্যন্ত তিনিই ছিলেন কাশ্মীরের শাসক। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের অন্যতম শর্ত ছিল, ভারতের দেশীয় রাজ্যের রাজারা ভারত বা পাকিস্তানে যোগ দিতে পারবেন, অথবা তাঁরা স্বাধীনতা বজায় রেখে শাসনকাজ চালাতে পারবেন। কিন্তু ১৯৪৭ সালের ২২ অক্টোবর পাকিস্তান-সমর্থিত পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলার বিদ্রোহী নাগরিক এবং পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের পশতুন উপজাতিরা কাশ্মীর রাজ্য আক্রমণ করে। এবং কাশ্মীরের রাজা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করলেও গভর্নর-জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটেনের কাছে সহায়তা চাইলেন। ফলে, কাশ্মীরের রাজা ভারতভুক্তির পক্ষে স্বাক্ষর করবেন, এই শর্তে মাউন্টব্যাটেন কাশ্মীরকে সাহায্য করতে রাজি হন। 

ফলে ১৯৪৭ সালের ২৬ অক্টোবর কাশ্মীরের জনগণের ইচ্ছা-আকাঙ্খাকে কবর দিয়ে হরি সিং কাশ্মীরের ভারতভুক্তির চুক্তিতে সই করেন। এবং ২৭ অক্টোবর তা ভারতের গভর্নর-জেনারেল কর্তৃক অনুমোদিত হয়। চুক্তি সই হওয়ার পর, ভারতীয় সেনা কাশ্মীরে প্রবেশ করে অনুপ্রবেশকারীদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। 

আন্তর্জাতিক চাপে ভারত বিষয়টি জাতিসংঘে উত্থাপন করে। জাতিসংঘ ভারত ও পাকিস্তানকে তাদের অধিকৃত এলাকা খালি করে দিয়ে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে গণভোটের প্রস্তাব দেয়। ভারত প্রথমে এই প্রস্তাবে সম্মত হয়। কিন্তু ১৯৫২ সালে জম্মু ও কাশ্মীরের পূর্বে নির্বাচিত গণপরিষদ ভারতভুক্তির পক্ষে ভোট দিলে ভারত গণভোটের বিপক্ষে মত দেয়। কারণ এটা নিশ্চিত ছিল যে, গণভোটে মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মীরের বেশিরভাগ ভোটারই পাকিস্তানের পক্ষে ভোটদান করবেন ও এতে কাশ্মীরে ভারত ত্যাগের আন্দোলন আরো বেশী জোরালো হবে।

যাই হোক মুসলিম প্রধান কাশ্মীরকে তো তাদের কর্তৃত্ববাদের থাবায় ভরেই ফেললো। এর সাথে সাথে উপমহাদেশে তাদের আরো কিছু কর্তৃত্ববাদের নজরানা দেখুন: 

আমরা কম বেশি ইন্ডিয়া মতবাদ যা ইন্ডিয়া ডকট্রিন বা নেহেরু ডকট্রিন নামেও পরিচিত তার কথা জানি। এই ইন্ডিয়া ডকট্রিনের মূল উদ্দেশ্যরহচ্ছে: “ভারত অবশ্যম্ভাবীভাবে তার আধিপত্য বিস্তার করবে। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারত হবে সব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। ছোট জাতিরাষ্ট্রগুলোর পতন ঘটবে। তার সাংস্কৃতিকভাবে স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে থাকবে, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন থাকবে না।” 

১৯৪৭ সালে প্রকাশিত ‘ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া’ বইয়ে প্রথম এই মতবাদের আভাস পাওয়া যায় যা মূলত ‘অখন্ড ভারত’ ধারণা থেকেই এর উদ্ভব, এবং একে একে কাশ্মীর, হায়দ্রাবাদ, সিকিম এবং নেপালের মাওবাদ, শ্রীলংকার তামিল টাইগার বিদ্রোহ এবং সর্বোপরি ১৯৭১ এর যুদ্ধ এবং তারপর খুব সাম্প্রতিক নেপালের তরাই অঞ্চলের গণভোট এবং এর পরবর্তী জ্বালানী অবরোধও এর বাইরে নয়। 

প্রাচীণ ভারতবর্ষের মহামতি সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের প্রধাণ অমাত্য কৌটিল্য, যিনি চানক্য নামেই সুপরিচিত, তার একটি শিক্ষা ছিল- “ক্ষমতা অর্জনের লোভ ও অন্য দেশ বিজয়ের আকাঙ্খা কখনও মন থেকে মুছে ফেল না। সব সীমান্তবর্তী রাজাকে শত্রু বলে মনে করবে।” 

কথা হচ্ছে, তবে কি হাজার বছর পর এসেও এই মূলনীতি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ভারত? এবার দেখি, ভারতের দক্ষিণাংশে মুসলমান অধ্যুষিত রাজ্যে হায়দ্রাবাদের দিকে। 

সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ১৭২১ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সুবাদার কামারুদ্দীন খান হায়দ্রাবাদের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং নিজাম-উল-মূলক উপাধি নিয়ে হায়দ্রাবাদ রাজ্য শাসন করতে থাকেন। মজার ব্যাপার হলো, পার্শ্ববর্তী মহীশূরের সুলতান হায়দার আলী এবং তার পুত্র টিপু সুলতান যখন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন হায়দ্রাবাদের তৎকালীন নিজাম নির্লজ্জভাবে ব্রিটিশের পক্ষাবলম্বন করেন। যদিও এই নতজানু নীতি তাদের বাঁচাতে পারেনি।

১৯৪৭ সালে ১৫ আগস্ট স্বাধীনতার পর থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত ভারত হায়দ্রাবাদে নানা রকম অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির অপচেষ্টা করলেও সর্বশেষ নিজাম তা শক্ত হাতে দমন করেন। এরপর ১৯৪৮ সালের জুলাই মাসে জওহরলাল নেহেরু ঘোষণা করলেন; ‘যখন প্রয়োজন মনে করবো তখন হায়দ্রাবাদের বিরুদ্ধে সেনা অভিযান শুরু করা হবে।’ 

এক পর্যায়ে ভারত বেশ কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করে, যার অংশ হিসেবে হায়দ্রাবাদের অভ্যন্তরে কংগ্রেস স্বেচ্ছাসেবকদের সক্রিয় করা হয়, এবং হায়দ্রাবাদের রাজনীতিকে কলুষিত করা হয়। 

শিক্ষাঙ্গন, সাংস্কৃতিক জগৎ, বুদ্ধিজীবী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনুগত লোক তৈরি করা হয়, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে অনুগত দালাল সৃষ্টি করা হয় এবং হিন্দু মৌলবাদীদের দিয়ে নানা রকম সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড উস্কে দেয়া হয়। কংগ্রেসের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হিন্দু মহাসভা, আরএসএস ও আর্যসমাজ এতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। যার সুযোগে ১৯৪৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর তেলেঙ্গনায় কম্যুনিস্ট বিদ্রোহ দমনের অজুহাতে ‘অপারেশন পোলো’ নামে ভারতীয় সৈন্যবাহিনী হায়দ্রাবাদে আক্রমণ চালায়। সর্বগ্রাসী এ আক্রমণ শুরুর আগেই স্বাধীন হায়দ্রাবাদের সেনাপ্রধান আল ইদরুসকে কিনে নেয় ভারত। 

সে সময় আল ইদরুস দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তগুলো অরক্ষিত রেখেছিল, সেনাবাহিনীকে রেখেছিল অপ্রস্তুত অবস্থায়। এরপর ভারত সেনাপ্রধানের সহায়তায় হায়দ্রাবাদে তার বিপুল সেনাশক্তি, পদাতিক বাহিনী ও বিমান বাহিনী সহকারে শুরু করে সামরিক আক্রমণ। 

প্রথমে ট্যাংক এবং এরপর বিমান আক্রমণে বিপর্যস্ত মানুষের ওপর ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাথে একাত্ব হয়ে আর্যসমাজ ও অন্যান্য হিন্দু মৌলবাদী সংগঠনগুলো হায়দ্রাবাদে প্রায় দুই লাখ মুসলিমদের উপর নির্বিচারে গণহত্যা চালায়। ভারতীয় সৈন্যবাহিনী মুসলিম নিরীহ নারী-পুরুষ, শিশুদের হত্যা করে, বিমান হামলায় শহর বন্দর গ্রাম গুঁড়িয়ে দিয়ে, মসজিদ-মাদ্রাসা ধ্বংসস্তুপে পরিণত করে। তাদের এই ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর একটি মাত্র উদ্দেশ্যে তা হচ্ছে হায়দ্রাবাদের শেষ নিজামকে ক্ষমতাচ্যুত করা। যদিও অনেকে এর প্রতিরোধ গড়েছিল। কিন্তু ১৮ সেপ্টেম্বর ভারতীয় বাহিনী রাজধানীর দিকে ধাবিত হয় এবং হায়দ্রাবাদ ভারতের দখলে পরিণত হয়। এরপর হায়দ্রাবাদ ভারতের পদানত রাজ্যে পরিণত হওয়ার পর অন্ধ্র, কর্ণাটক ও মহারাষ্ট্র এই তিন রাজ্যে বিভক্ত করা হয়।

এ বিষয়ে লোকসভার হিন্দু সদস্য পন্ডিত সুন্দরলালের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে প্রকাশ পায় অভিযানের সময় ভারতীয় বাহিনী নির্বিচার হত্যা, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ ও ব্যাপক ধর্ষণের মতো যুদ্ধাপরাধ করেছে। যদিও বর্তমান কাশ্মীরে কোনো প্রতিবাদ হয়নি বলে ভারত যেমন অস্বীকার করছে। সেসময় তেমন মৃত্যু হয়নি বলে সরকারীভাবে দাবী করা হলেও তদন্ত প্রতিবেদনে প্রায় ৪০ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়। এদের মধ্যে অনেককেই লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মারে ভারতীয় সেনারা। যদিও সরকারি এ তদন্ত প্রতিবেদন কোনোদিন প্রকাশ হয়নি। 

এবার তাদের আগ্রাসনের আর একটা নমুনা দেখি- 

সিকিম ভারতের উত্তরাংশে অবস্থিত তিব্বতের পাশের একটি রাজ্য। রাজ্যটির স্বাধীন রাজাদের বলা হত চোগিয়াল। ভারতে বৃটিশ শাসন শুরুর পুর্বে সিকিম তার পার্শ্ববর্তী নেপাল আর ভুটানের সাথে যুদ্ধ করে স্বাধীন অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিল। বৃটিশরা আসার পর তাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে নেপালের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় সিকিম। এসময় রাজা ছিলেন নামগয়াল। কিন্তু বৃটিশরা তিব্বতে যাওয়ার জন্য এক সময় সিকিম দখল করে নেয় এবং ১৮৮৮ সালে রাজা নামগয়াল আলোচনার জন্য কলকাতা গেলে তাঁকে বন্দী করা হয়। পরবর্তী সময়ে ১৮৯২ সালে তাকে মুক্তি দেয়া হয় এবং সিকিমের স্বাধীনতাকে মেনে নেয়া হয়।

এরপর তার পুত্র টুলকু নামগয়াল ক্ষমতায় বসে সিকিমের ব্যাপক উন্নতি সাধন করেন। এসময় বৃটিশের কাছে সিকিম তার স্বাধীনতার নিশ্চয়তা লাভ করে। পরবর্তী চোগিয়াল থাসী নামগয়ালের সময়ে বৃটিশরা ভারত ছেড়ে গেলে গণভোটে সিকিমের মানুষ ভারতের বিরুদ্ধে রায় দেয় এবং ভারতের পন্ডিত নেহরু সিকিমকে স্বাধীন রাজ্য হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হন। ১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধের পর কৌশলগত কারণে সিকিমের গুরুত্ব বেড়ে যায়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সর্বশক্তি নিয়োগ করেন সিকিমকে দখল করার জন্য। তিনি কাজে লাগান সিকিমের প্রধানমন্ত্রী লেন্দুপ দর্জিকে।

মূলত চীন সীমান্তে ৩টি স্বাধীন রাষ্ট্র (নেপাল, ভুটান ও সিকিম) নয়াদিল্লির জন্য অস্বস্তিকর ছিল। ১৯৬৫ সালের অমৃতসরের যুদ্ধ, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয় এবং ভারতের পারমাণবিক বোমার সফলতার ইঙ্গিত ইন্দিরা গান্ধীর আত্মবিশ্বাস বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।

কংগ্রেস নেত্রী নয়াদিল্লিতে তার ক্ষমতাকে সুসংহত করেন এবং এরপর সিকিমের ওপর তার নজর পড়ে। নয়াদিল্লি উদ্বিগ্ন ছিল সিকিমের স্বাধীন সত্তার বিকাশ নিয়ে। ভুটানের পথ ধরে সিকিম যদি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে জাতিসঙ্ঘের সদস্যপদ লাভ করে ফেলত, তাহলে তা হতো নয়াদিল্লির পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে বড় রকম বাধা। তাই দ্রুত কার্যোদ্ধারের জন্য তারা অগ্রসর হতে থাকে। 

এরই পথ ধরে ১৯৭০ সাল থেকেই নেহেরু প্রভাবিত সিকিম ন্যাশনাল কংগ্রেসকে লেন্দুপ দর্জি ব্যবহার করে অরাজকতা সৃষ্টি করে সিকিমে। রাজপ্রাসাদের সামনে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়লে ইন্দিরা সরকার রাজার নিরাপত্তার কথা বলে ভারতীয় বাহিনী পাঠায়। কিন্তু তারা মূলত রাজাকে গৃহবন্দী করেন, বহি:র্বিশ্বের সাথে সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং বি এস দাশকে ভারত সরকার সিকিমের প্রধান প্রশাসক নিয়োগ করে। 

এ সময় এক মার্কিন পর্বতারোহী গোপনে সিকিম প্রবেশ করেন এবং সিকিমের স্বাধীনতা হরণের খবর বিশ্বের নিকট তুলে ধরেন। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে যায়। যদিও সিকিম জাতিসংঘের সদস্যপদভুক্তিরও প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু এর মধ্যে ইন্দিরা ঘেঁষা লেন্দুপ দর্জির নেতৃত্বাধীন সিকিম ন্যাশনাল কংগ্রেস (এসএনসি) ১৯৭৪ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে পার্লামেন্টের ৩২ আসনের মধ্যে ৩১টি আসনে জয়লাভ করে। 

নির্বাচনে জিতে ২৭ মার্চ ১৯৭৫ প্রথম ক্যাবিনেট মিটিং এ প্রধানমন্ত্রী লেন্দুপ দর্জি রাজতন্ত্র বিলোপ ও জনমত যাচাইয়ে গণভোটের সিদ্ধান্ত নেন। ততদিনে সিকিমে ভারতীয় সেনাবাহিনী ঘাঁটি গেড়ে ফেলেছে। তারা বন্দুকের মুখে ভোটারদের ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে বাধ্য করে। যা পুরো ঘটনাই ছিল সাজানো। 

৬ এপ্রিল ১৯৭৫ সালের সকালে সিকিমের রাজা যখন নাস্তা করতে ব্যস্ত সে সময় ভারতীয় সৈন্যরা রাজপ্রাসাদ আক্রমণ করে এবং রাজাকে বন্দী করে প্রাসাদ দখল করে নেয়। এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রকে গ্রাস করে ভারতের প্রদেশে পরিণত করে। 

সাংবাদিক সুধীর শর্মা নেপালের কান্তিপুর পত্রিকায় ‘পেইন অব লুজিং এ নেশন‘ (একটি জাতির হারিয়ে যাওয়ার বেদনা) নামে ২০০৭ সালের একটি প্রতিবেদনে জানান, ভারত তার স্বাধীনতার গোড়া থেকেই সিকিম দখলের পরিকল্পনা করেছিল। ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু অনেকের সাথে কথোপকথনেও তার ইঙ্গিতও দিয়েছিলেন। 

ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সাবেক পরিচালক অশোক রায়না তার বই ‘ইনসাইড স্টোরী অব ইন্ডিয়াস সিক্রেট সার্ভিস’-এ সিকিম সম্পর্কে লিখেন, ভারত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ১৯৭১ সালেই সিকিম দখল করে নেয়া হবে। সে লক্ষ্যে সিকিমে প্রয়োজনীয় অবস্থা সৃষ্টির জন্য আন্দোলন, হত্যা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করা হচ্ছিল। তারা ছোট ছোট ইস্যুকে বড় করার চেষ্টা করে এবং সফলও হয়। 

‘র’ দুই বছর সময় নেয় সিকিমে একটি উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির জন্য। এ ক্ষেত্রে নেপালী বংশোদ্ভূত হিন্দু ধর্মাবলম্বী সিকিমি নাগরিকদের ক্ষোভকে ব্যবহার করে ভারত। তাদের দীর্ঘ দিনের অভিযোগ ছিল, সিকিমের বৌদ্ধ রাজা স্থানীয় নেপালী হিন্দু প্রজাদের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ করছেন। 

সাংবাদিক সুধীর শর্মা লিখেন, লেন্দুপ দর্জি নিজেই তাকে বলেছেন; ভারতের ইনটেলিজেন্স ব্যুরোর লোকেরা বছরে দু’তিনবার তার সাথে দেখা করে পরামর্শ দিত কিভাবে আন্দোলন পরিচালনা করা যাবে। তাদের একজন এজেন্ট তেজপাল সেন ব্যক্তিগতভাবে তাকে অর্থ দিয়ে যেতো এ আন্দোলন পরিচালনার জন্য। আর এ অর্থ দিয়ে রাজনৈতিক সন্ত্রাস পরিচালিত হতো।’

শর্মা আরও লিখেছেন; এই ‘সিকিম মিশনের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা, যা সর্বত্র ‘র’ নামে পরিচিত। সিকিমের চোগিয়ালের তৎকালীন এডিসি ক্যাপ্টেন সোনাম ইয়াংজু লিখেছেন, ভারতীয় সামরিক বাহিনীর সদস্যরা বেসামরিক পোশাকে রাজার বিরুদ্ধে গ্যাংটকের রাস্তায় মিছিল, আন্দোলন ও সন্ত্রাস করত। নেহেরুর পরামর্শ, মদদ ও উৎসাহে সিকিম ন্যাশনাল কংগ্রেস গঠন করেছিলেন লেন্দুপ দর্জি। 
শ্লোগান তুলেছিলেন, ‘গণতন্ত্রের সংগ্রাম চলছে, চলবে’। লেন্দুপ দর্জির গণতন্ত্রের শ্লোগান শুনে সিকিমের সাধারণ জনগণ ভাবতেই পারেনি, এই শ্লোগানের পিছনে প্রতিবেশী দেশ একটি জাতির স্বাধীনতা হরণ করতে আসছে। সিকিমের জনগণকে দ্বিধাবিভক্ত করে ভারত তার আগ্রাসন সফল করতে এবং এক পক্ষকে ক্ষমতায় এনে তাদের দ্বারা দেশ বিক্রির প্রস্তাব তুলে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করতে পেরেছিল।

এর পরের ঘটনা তো লেন্দুপ দর্জিকে ২০০২ সালে ভারত ‘পদ্মবিভূষণ’ খেতাবে ভূষিত করে। সিকিমের রাজ্য সরকার ২০০৪ সালে তাকে ‘সিকিমরত্ন’ উপাধি দেয়। 

তবে মাতৃভূমির স্বাধীনতা ভারতের হাতে তুলে দেয়ার জন্য তিনি এক অভিশপ্ত জীবন বয়ে বেড়িয়েছেন। সিকিমে তার ঠাঁই হয়নি। পশ্চিমবঙ্গের নিজ শহর কালিম্পং এ নিঃসঙ্গ, নিন্দিত ও ভীতসন্ত্রস্ত্র এক জীবনযাপন শেষে ২০০৭ সালের ৩০ জুলাই লেন্দুপ দর্জি মারা যান।

এবার আসুন, পর্যটক নির্ভর রাষ্ট্র মালদ্বীপের দিকে দেখি: 

১৯৮৮ সালে মালদ্বীপেও অপারেশন ক্যাকটাস নামে সামরিক হস্তক্ষেপ করেছিল ভারত। মালদ্বীপের প্রেসিডেন্টকে রক্ষার নামে এই সামরিক হস্তক্ষেপ ভারতের প্রভাব বিস্তারেরর অংশ ছিল। যদিও এখন সেখানে চীনের সাথে ভারতের চলছে ব্যাপক প্রতিযোগিতা। মালদ্বীপে বিমানবন্দরের উন্নয়ন ভারতীয় অর্থায়নে না করে চীনা অর্থায়ন করায় ভারত জোরেসোরে লেগেছে এর পেছনে। অথচ বর্তমানে পুরো মালদ্বীপ জুড়ে রাডার বসাচ্ছে ভারত, যাতে মালদ্বীপের আশেপাশের পুরো এলাকার সমুদ্রের উপরে নজরদাড়ি করা যায়। 

২০০৭ সালে প্রথমটা, ২০১২ সালে দ্বিতীয়টা এবং ২০১৫ সালে তৃতীয় রাডারটা বসায় ভারত। মালদ্বীপকে দু’টা সামরিক হেলিকপ্টার, কিছু সামরিক গাড়ি, আর প্যাট্রোল বোট দিয়েছে ভারত। এর উপরে নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং যৌথ মহড়া তো আছেই। এগুলির মাধ্যমে মালদ্বীপের নিরাপত্তা বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় ভারত। 

এদিকে নেপালের সাথে ভারতের সম্পর্ক নিম্নমুখী বেশ অনেকদিন ধরেই। চীন হিমালয়ের মাঝ দিয়ে কাঠমুন্ডু পর্যন্ত রাস্তা তৈরির পর থেকে নেপালকে নিয়ে ভারত-চীনের খেলা বেড়ে চলেছে। নেপাল সর্বদা ভারতের সাথেই যৌথ সামরিক মহড়া চালাতো। কিন্তু ২০১৭-এর মে মাসে সেখানে যুক্ত হয়েছে চীন। নেপালের উপরে চাপ সৃষ্টির যেকোন সুযোগই ভারত হাতছাড়া হতে দেয়নি। ২০১৫ সালের এপ্রিলে ভূমিকম্পে লন্ডভন্ড হওয়া নেপালে একই বছরের সেপ্টেম্বরেই ভারত মদেশী আন্দোলনের নাম করে ‘আনঅফিশিয়াল’ অবরোধ দেয়। ভূমিকম্পের পরপর রিলিফের কাজ করতে আসা ভারতীয়দের ভাবচক্করের বিরুদ্ধে যেমন নেপালিরা খেপে গিয়েছিল, সেই খেপা ভাবটাই মদেশী আন্দোলনের সময় আরও ব্যাপক বিস্তৃতি পেয়েছে। 

ভারত মহাসাগরের দ্বীপ দেশ মরিশাস এবং সেইশেল-এও ভারত অন্যায়ভাবে প্রভাব বিস্তার করে যাচ্ছে। ১৯৮৬ সালে ‘অপারেশন ফ্লাওয়ারস আর ব্লুমিং’-এর নামে ভারত সরকার সেইশেল সরকারকে অভ্যুত্থান থেকে বাঁচাবার নামে সামরিক হস্তক্ষেপ করেছিল। 

এদিকে ১৯৮৩ সালে ‘অপারেশন লা দোরা’র নামে ভারত সরকার মরিশাসে সামরিক হস্তক্ষেপ করতে যাচ্ছিল; শেষ মুহুর্তে তা বাতিল করা হয়। 

এভাবে যুগ যুগ ধরে ভারত এ উপমহাদেশে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক এবং সংস্কৃতিক অঙ্গনে নগ্ন হস্তক্ষেপ করে আসছে প্রতিনিয়ত। প্রতিবেশী ছোট দেশগুলির উপরে ভারত তার অবৈধ প্রভাব বলয় বৃদ্ধি করে যাচ্ছে সেই প্রথম থেকে। তাদের এ অবৈধ আগ্রাসনে যেন নাভিশ্বাস হয়ে উঠেছে গোটা উপমহাদেশ। সত্যি কি তাই?

এবার আসুন এর উত্তর পেতে অস্বস্তি নিয়ে একটা পরীক্ষা হয়ে যাক, 

আপনার ক্ষুদাতিক্ষুদ্র একটা নখে আঘাত লাগলে আপনি কি ব্যথা পান? 
নিশ্চই পাই। 
ব্যাথা যে পান সেটা কিভাবে বোঝেন? নিশ্চই আপনার ইন্দ্রিয় সাথে সাথে পাঠিয়ে দেয় আপনার মস্তিষ্কে। আর আপনার মস্তিষ্ক সিগন্যাল জানিয়ে দেয় আপনার সারা শরীরে?
তা অবশ্য দেয়। 
এবার ভাবুনতো, এই যে এক অঙ্গের বিপদে অন্য আর এক অঙ্গের জেগে ওঠা এবং মস্তিকের সমন্বিত সিগন্যালের মাধ্যমে সতর্ক হওয়া বা প্রতিরোধ করা; এইটাই আপনার বেঁচে থাকার আন্তঃশক্তি নয় কি?
তা অবশ্যই আমার বেঁচে থাকার আন্তঃশক্তি। 
এবার আর একটু ভাবুনতো, এই অন্তর্জাল বা আন্তঃশক্তিই কি প্রমাণ করে না আপনি প্যারালাইজড নন? 
তা প্রমান করে। 

তবে তাই যদি হয়, এবার আপনার দেশকে নিয়ে একবার চোখ বুঁজে ভাবুন তো? আপনার বিবেক কি বলে? সত্যি আপনি কি স্বস্তি পাচ্ছেন? না কি অস্বস্তিতে আছেন?

সূত্র: বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষা ও নেহরুর ইন্ডিয়া ডকট্রিন : আবিদ বাহার: https://www.somewhereinblog.net/blog/bibidha/28846800

ভারতের আধিপত্যবাদকে যেভাবে মোকাবিলা করবে বাংলাদেশ: http://koushol.blogspot.com/2017/09/bangladesh-counter-indian-influence.html

হায়দ্রাবাদ থেকে সিকিম হয়ে বাংলাদেশ নেহেরু ডকট্রিন ও আজকের বাস্তবতা: http://www.dailysangram.com/post/315892-হায়দ্রাবাদ-থেকে-সিকিম-হয়ে-বাংলাদেশ-নেহেরু-ডকট্রিন-ও-আজকের-বাস্তবতা


আরিফুল ইসলাম 
তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক 
বাংলাদেশ প্রেস ক্লাব অব মালয়েশিয়া 
[email protected]