বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম সকল প্রশংসা নিখিল বিশ্বের প্রতিপালক মহান রাব্বুল আলামীনের জন্য। হাজার হাজার দরূদ ও সালাম বর্ষিত হউক মানবজাতির শিক্ষক ও সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর এবং তাঁর পরিবার ও ছাহাবীগণের উপরও। আম্মা বা’দ, বন্ধুগণ! রমাদান মাসের শেষ দশকের গুরুত্ব সব চেয়ে বেশী। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শেষ দশ তারিখে সবচেয়ে বেশী কষ্ট করে ইবাদত করতেন, নিজেও আল্লাহর ইবাদতের মধ্যে রাত জাগতেন এবং স্বীয় স্ত্রীদেরকেও জাগ্রত করে দিতেন। {বুখারী- ২৯৮০।}

রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সিয়াম সাধনা, তারাবীহ, কুরআনের পঠন-পাঠন, নফল ছালাত, লাইলাতুল কদরের তালাশ, ই’তিকাফ ও ছদকায়ে ফিতর আদায় ইত্যাদি আরো অনেক ইবাদত এই দশকে করতেন। ইবাদতে অধিক প্রচেষ্টাঃ শেষ দশকে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইবাদতের জন্য সব চেয়ে বেশী কষ্ট করতেন। হযরত আয়েশা (রাজিঃ) বলেনঃ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমাদানের শেষ দশ রাতে এত বেশী কষ্ট করতেন যেরূপ অন্য কোন সময় করতেন না। {মুসলিম, হা/১১৭৫}

রাত জাগাঃ শেষ দশ তারিখে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছালাত, তাসবীহ, ইাস্তিগফার, দুআ, কুরআন তিলাওয়াত ইত্যাদি বিভিন্ন ইবাদাতের মাধ্যমে রাত্রি জাগরণ করতেন। হযরত আয়েশা (রাজিঃ) বলেনঃ যখন রমাদানের শেষ দশক আসত তখন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোমর বেঁধে নিতেন, রাত জাগতেন আর পরিবারকে জাগ্রত করে দিতেন। {বুখারী, হা/২০২৪}

পরিবারকে জাগানোঃ শেষ দশ রাতে নিজেও জাগবে এবং স্ত্রী-সন্তানদেরকেও জাগাবে। তাদের ইবাদতের প্রতি উদ্বোদ্ধ করবে। হযরত আয়েশা (রাজিঃ) বলেনঃ শেষ দশ রাতে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও আল্লাহর ইবাদতের মধ্যে রাত জাগতেন এবং স্বীয় স্ত্রীদেরকেও জাগ্রত করে দিতেন। {বুখারী, হা/২০২৪}

ইশা ও ফজর জামাতের সহিত পড়াঃ এই রাতগুলোতে ইশা ও ফজর ছালাত জামাতের সহিত পড়ার চেষ্টা করবেন। কারণ যে ব্যক্তি ইশা ও ফজরের ছালাত জামাতের সহিত পড়বে তাকে সারা রাত ইবাদত করার ছাওয়াব দেয়া হবে। ইমামের সহিত পূর্ণ তারাবী পড়াঃ তারবীর ছালাত এমনিতেই ফযীলতপূর্ণ। তবে ইমামের সহিত পূর্ণ তারাবী পড়লে সারা রাত ইবাদত করার ছাওয়াব পাওয়া যাবে। অর্থাৎ যতক্ষণ ইমাম ছালাত শেষ করবে না ততক্ষণ তার সাথে পড়বেন। এমনকি তিনি বিতরের ছালাত পড়লে বিতরও পড়বে। তখন এই বিশেষ ফযীলত পাওয়া যাবে। ই’তিকাফ করাঃ ই’তিকাফ করা রমাদান এবং বছরের অন্য দিনে সূন্নাত। এব্যাপারে মূল ভিত্তি হল, আল্লাহর বাণী- আর যখন তোমরা মসজিদে ই’তিকাফ অবস্থায় থাকো”। {সূরা বাকারা, বুখারী, হা/৪৬২৭।}

হযরত আয়েশা (রাজিঃ) বলেনঃ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জীবনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত রমাদান মাসের শেষ দশকে ইতিকাফ করেছেন। তারপর তাঁর স্ত্রীগণ ইতিকাফ করেছেন। {মুসলিম-১১৭২।} রমাদানূল মুবারকের শেষ দশ তারিখে ই’তিকাফ করার তাগিদ রয়েছে অনেক বেশী। {বুখারী- ৪৬২৭।} ইতিকাফের অর্থ হল আল্লাহর ইবাদতে নিমগ্ন হওয়ার উদ্দেশ্যে ঘর বাড়ী স্ত্রী-সন্তান সব কিছু ত্যাগ করে মসজিদে অবস্থান করা। রমাদান মাসের শেষ দশকে ইতিকাফের আর একটি উদ্দেশ্য হল দশটি রাত মসজিদে জেগে লাইলাতুল কদর কে তালাশ করা। কারণ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ লাইলাতুল কদর এই দশ রাতের মধ্যে। মসজিদ ব্যতীত অন্য কোথাও ই’তিকাফ বৈধ নয়। ই’তিকাফের জন্য জামে মসজিদকে নির্বাচন করা উত্তম। {আবূদাউদ-২১৩৫।}

ই’তিকাফ অবস্থায় অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়া, জানাযার ছালাতে শরীক হওয়া এবং মানবীয় প্রয়োজন ব্যতীত ই’তিকাফের স্থান থেকে বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ। {আবু দাউদ-১৪৭৩।} মহিলারা ই’তিকাফ করতে পারেন। {মুসলিম/২৬৫১।} তবে তাদের জন্য মসজিদের চেয়ে নিজের ঘরই বেশী উত্তম। যদি কেউ দশ দিন ই’তিকাফ করতে না পারে, তাহলে যতদিন সম্ভব ততদিন করবে এমনকি শুধু একরাত করলেও অসুবিধা হবে না। {বুখারী-১৮৮৯।} ই’তিকাফকারী মানবীয় প্রয়োজনে মসজিদ থেকে বের হতে পারবে। {আবু দাউদ- ২১৩১।}

লাইলাতুল ক্বদর তালাশ করাঃ রমাদানের রাতসমূহের মধ্যে বরং সারা বছরের রাতগুলোর মধ্যে অতি উত্তম রাত হল, লাইলাতুল ক্বদর। এই রাতে কুরআন মজীদ অবতীর্ণ হয়েছে। এটি অতি বরকতপূর্ণ রাত। এই রাতের ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও উত্তম। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ নিশ্চয় আমি লাইলাতুল কদরে এই কুরআন নাযিল করেছি। লাইলাতুল কদর সম্পর্কে আপনি কি জানেন?। লাইলাতুল কদর হল, একহাজার মাস অপেক্ষা অনেক উত্তম। এতে প্রত্যেক কাজের জন্য ফেরেশতাগণ ও রূহ অবতীর্ণ হয় তাদের পালনকর্তার নির্দেশক্রমে। এটা নিরাপত্তা যা ফজরের উদয় পর্যন্ত অব্যাহত থাকে”। {সূরা কদর।}

অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেনঃ আমি এই কুরআন নাযিল করেছি এক বরকতময় রাতে। নিশ্চয় আমি সতর্ককারী। এ রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়। আমার পক্ষ থেকে আদেশক্রমে। আমিই প্রেরণকারী। আপনার পালনকর্তার পক্ষ থেকে রহমত স্বরূপ। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ”। {সূরা দুখানঃ ৩-৭}

রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ লাইলাতুল ক্বদরকে রমাদানের শেষ দশ তারিখের বেজোড় রাতগুলোতে তালাশ করা উচিত। {বুখারী, হা/১৮৭৪।}

রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি লাইলাতুল ক্বদরে ছালাত আদায় করবে, তার পূর্বের সকল পাপ ক্ষমা করা হবে। {বুখারী, হা/১৭৬৬।}

লাইলাতুল ক্বদরের সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত ব্যক্তি বড়ই হতভাগা। {ইবনু মাজা/১৬৬৭।} যদিও কোন কোন বর্ণনায় শেষ দশকের রাতগুলোতে, বরং বিশেষ করে বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর তালাশ করার কথা রয়েছে, তথাপি কোন রাতে লাইলাতুল কদর হবে এটার নিশ্চিত কোন বর্ণনা হাদীসে নেই। বরং রমাদানের শেষ দশকের রাতগুলোতে তালাশ করতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ কেউ যদি শেষ দশ রাতগুলো জেগে ইবাদত করতে পারে তাহলে নিশ্চিত বলা যাবে যে সে লাইলাতুল কদর পেয়েছে। অনকের উক্তি মতে রমাদানের সাতাশ তারিখের রাত হ’ল, লাইলাতুল ক্বদর। {সহীহ আবুদাউদঃ ১২৪৭।}

লাইলাতুল কদরের ছালাত ও দুআঃ কেউ যদি লাইলাতুল কদর পেয়ে যায় তাহলে সে যেন সেই রাতে বেশী বেশী নামায পড়ে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি ঈমানের সহিত ছাওয়াবের আশায় লাইলাতুল ক্বদরে নামায পড়বে, তার পূর্বের সকল পাপ ক্ষমা করা হবে। {বুখারী, হা/১৭৬৬।}

লাইলাতুল ক্বদরে এই দুআ পড়া সুন্নাত- اَللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّى `আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আ’ফুউন তুহিব্বুল আ’ফওয়া ফা’ফু আ’ন্নী’ অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা পছন্দ করেন, সুতরাং আমাদেরকেও ক্ষমা করে দিন। {তিরমিযী/৩৭৬০।}

ছদকায়ে ফিতর আদায়ঃ রোযার ক্রটি বিচ্যুতির ক্ষতিপূরণ হিসেবে এবং আর্তমানবতার সহায়তার লক্ষ্যে ঈদের ছালাতের পূর্বে শরীয়ত কর্তৃক ধার্য্যকৃত যে খাদ্য বস্তু প্রদান করা হয়, তাকেই যাকাতুল ফিতর বা ছদকা ফিত্রা বলা হয়। আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাজিঃ) বলেনঃ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সিয়াম পালনকারীদের অপ্রয়োজনীয় কার্য্যকলাপ ও অশ্লীল বাক্যালাপের পাপ হতে পবিত্র করণের জন্যে এবং দুস্থ মানবতার ভক্ষণের উদ্দেশ্যে যাকাতুল ফিত্বর ফরয করেছেন। যে ব্যক্তি ঈদের ছালাতের পূর্বে তা আদায় করবে তা যাকাতুল ফিত্র হিসেবে গণ্য হবে, আর যে ব্যক্তি ঈদের পরে আদায় করবে তা সাধারণ ছদকার মত হবে। {ইবনে মাজা, হাঃ ১৪৮০।} যাকাতুল ফিত্র প্রত্যেক মুসলিম নর-নারী, ছোট বড়, স্বাধীন, দাস দাসী, ধনী-দরিদ্র সকলের উপর ফরয। {বুখারী।}

ঘরের দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে মাথা পিছু সবার পক্ষ থেকে যাকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে। {বুখারী।}

যাকাতুল ফিতরের পরিমাণ হল, এক ছা, যা আড়াই কিলোগ্রামের সমান।{বুখারী।} অথবা অর্ধ ছা গম, যা প্রায় দুই সেরের সমান। {আবু দাউদঃ ১৬২০, সহীহুল জামেঃ ২৪১।}

যাকাতুল ফিতর আদায়ের সময় হল, শেষ রোযার ইফতারের পর থেকে ঈদের ছালাতের পূর্ব পর্যন্ত। কিন্তু ঈদের দু’এক দিন পূর্বে আদায় করে দেয়াতে দোষের কিছু নেই। {বুখারী।} যাদেরকে যাকাত দেয়া যায় তাদেরকে ছদকা ফিতর দিতে হবে।