মুসাফিরের জন্য সালাতের বিধান

Img

যদি কোনো ব্যক্তি সর্বনিম্ন ৪৮ মাইল (৭৭.২৩২ কিলোমিটার) সফর করার নিয়তে নিজ লোকালয় থেকে বের হয় তাহলে শরীয়তের পরিভাষায় তাকে মুসাফির বলে। মুসাফির শব্দের বিপরীত শব্দ হলো মুকিম

মুসাফির হবার কিছু শর্ত

  • দূরত্ব সর্বনিম্ন ৪৮ মাইল (৭৭.২৩২ কিলোমিটার) হতে হবে।
  • নিজ লোকালয় থেকে বের হতে হবে
  • সফরের নিয়ত করতে হবে
  • ১৫ দিনের কম সময় থাকার নিয়ত করতে হবে

কসর আরবি শব্দ অর্থ কম কর, কমানো। ইসলামী শরীয়তে একজন মুসাফির ব্যক্তির ওপর শরীআহ কর্তৃক চার রাকাআত বিশিষ্ট সালাতকে ২ রাকাআতে হ্রাস করা হয়েছে।

মুসাফিরের জন্য সালাত কসর করা ওয়াজিব।

কসরের বিধান

  • মুসাফির ব্যক্তি যোহর, আসর ও এশা ৪ রাকাআত বিশিষ্ট ফরজ সালাতকে ২ রাকাআত করে আদায় করবে। ফজর ও মাগরিব যথা নিয়মে ২ ও ৩ রাকাত পড়বে।

 

  • ১৫ দিনের কম অবস্থানের জন্য নিয়ত করলে মুসাফিরের জন্য সালাত কসর হবে।

 

  • মুসাফির ব্যক্তি ইমামতি করলে আগেই মুক্তাদিদের বলে দিতে হবে যে তিনি মুসাফির এবং দুই রাকাআত পড়ে সালাম ফেরাবেন এবং মুকিম নামাজিরা দাঁড়িয়ে বাকি দুই রাকাআত সালাত যেনো একাকী পড়ে নেন।

 

  • মুসাফির অবস্থায় কোনো সালাত কাজা হলে আর তা মুকিম অবস্থায় পড়া হলেও সেই সালাত কসর পড়তে হবে। এবং মুকিম অবস্থায় কোনো সালাত কাজা হলে তা মুসাফির অবস্থায় আদায় করতে হলে তা পূর্ণই আদায় করতে হবে।

 

  • সুন্নাত সালাতে কসর নেই তাই সফরে অবস্থানকালে সুন্নাত পড়লে পূর্ণটাই পড়তে হবে।

 

  • সফরে অবস্থানকালে সুন্নাত সালাত পড়া না পড়ার ব্যপারে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এবং সাহাবায়ে কেরামেরা (রা) দুই ধরনের আমলই বর্ণিত আছে। কোনো কোনো বর্ণনায় সুন্নাত পড়ার কথা এসেছে আবার কোথাও কোথাও আসে নি।

 

 

  • রাসুলুল্লাহ (সাঃ) সুস্থ, অসুস্থ, মুসাফির, মুকিম কোনো অবস্থাতেই ফজরের সুন্নাত ও বিতরের সালাত ছাড়তেন না। তাই ফজরের সালাত গুরুত্বের সাথে আদায় করা উচিত।

 

  • আর অন্যান্য সালাতের সুন্নাতের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো বা ব্যস্ততা থাকলে সুন্নাত ছেড়ে দেওয়া দুরস্ত আছে। কিন্তু তাড়াহুড়ো বা ব্যস্ততা না থাকলে সুন্নাত পড়ে নেওয়াই উওম। (জামে তিরমিজি ৫৫০)

 

  • মুসাফির ব্যক্তি যদি মুকিম ইমামের পেছনে নামাজ আদায় করে, তাহলে ইমামের অনুসরণে সেও চার রাকাত পড়বে।

 

  • প্রত্যেক নামাজের নিয়ত করতে হবে, কোন ওয়াক্তের কসর পড়বেন।

 

কসর করা কুরআন ও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত

আল্লাহ পাক কুরআনে বলেন,:

وَإِذَا ضَرَبْتُمْ فِي الْأَرْضِ فَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَن تَقْصُرُوا مِنَ الصَّلَاةِ إِنْ خِفْتُمْ أَن يَفْتِنَكُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا ۚ إِنَّ الْكَافِرِينَ كَانُوا لَكُمْ عَدُوًّا مُّبِينًا

অর্থ: তোমরা যখন যমীনে সফর কর এবং তোমাদের আশঙ্কা হয় যে, কাফিরগণ তোমাদেরকে বিপন্ন করবে, তখন সালাত কছর করলে তাতে তোমাদের কোনও গুনাহ নেই। নিশ্চয়ই কাফিরগণ তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন। [সূরা নিসা, ১০১]

মুহাম্মাদ (সা.) হজ্জ, ওমরা, যুদ্ধসহ যে কোন সফরে কছরের নামায পড়তেন। ইবনে ওমর থেকে বর্ণিত: “আমি মুহাম্মাদ (সা.) এর সাথে ছিলাম, তিনি সফরে (চার রাকাআত বিশিষ্ট নামায) দুই রাকাআতের বেশি পড়তেন না। আবুবকর ও ওমর একই রকম নামায পড়তেন।” -বুখারী ও মুসলিম।

একাধিক নামায একত্রীকরণ

মুসাফিরের জন্য দু’টি নামায এক সাথে পড়ার অবকাশ রয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ: জোহরের নামাযকে আসরের নামাযের সময়ে দেরি করে একসাথে পড়া। প্রত্যেক নামাযকে আলাদা আলাদা করে পড়তে হবে। প্রথমে জোহর তারপর আসর পড়তে হবে।

আসরের নামাযকে সময়ের আগে জোহরের সময়ে একসাথে পড়াও জায়েয আছে। এক্ষেত্রেও প্রথমে জোহর তারপর আসর পড়তে হবে।

তদ্রুপভাবে মাগরিব ও ঈশার নামাযের ক্ষেত্রেও করতে পারবে।

ফজর ও জোহর বা মাগরিব ও আসর একত্রে পড়া জায়েয নেই।

কসরের নামায কখন শুরু করতে হবে:

মুসাফির তার নিজের এলাকা ত্যাগ করার পূর্বে করের নামায পড়া জায়েয হবে না। শুধুমাত্র নিজের এলাকা ত্যাগ করে সর্বনিম্ন ৪৮ মাইল দূরত্ব সফরের নিয়ত করে অতিক্রম করলেই কসর নামায পড়া জায়েজ হবে।

সফরের সময় জামাআতে নামায

মুসাফিরের জন্য মুকীমের ইমাম হয়ে নামাজ পড়া জায়েয আছে। এক্ষেত্রে সে দুই রাকাত নামায আদায় করে সালাম ফেরাবে এবং মুকীম একাকী নামায শেষ করে নিবে। মুসাফিরের জন্য মুস্তাহাব হলো সালাম ফিরিয়ে মুক্তাদীর বলা" আপনারা নামায পূর্ণ করুন, আমি মুসাফির"।

মুসাফির ব্যক্তি মুকীম ইমামের পিছনে নামায পড়লে কসর করবে না, পূর্ণ নামাযই পড়তে হবে।

ইমাম মুসলিম ইবনে ওমর থেকে বর্ণনা করেন-“মুসাফির ইমামের সাথে চার রাকাআত পড়বে, আর একা পড়লে দুই রাকাআত পড়বে।”

মুসাফিরের জন্য আরো কতিপয় মাসআলা

মুসাফির ব্যক্তির ব্যস্ততা থাকলে ফজরের সুন্নাত ব্যতীত অন্যান্য সুন্নাত ছেড়ে দেওয়া দুরস্ত আছে। ব্যস্ততা না থাকলে সব সুন্নাত পড়তে হবে।

যারা লঞ্চ, স্টীমার, প্লেন, বাস, ট্রাক ইত্যাদির চালক বা কর্মচারী, তারাও অনুরূপ দূরত্বের সফর হলে পথিমধ্যে কর পড়বে। আর গন্তব্য স্থানের মাসআলা উপর্যুক্ত নিয়ম অনুযায়ী হবে।

১৫দিন বা তার বেশি থাকার নিয়ত হয়নি এবং পূর্বেই চলে যাবে চলে যাবে করেও যাওয়া হচ্ছে না- এভাবে ১৫দিন বা তার বেশি থাকা হলেও কসর পড়তে হবে।

আল্লাহতায়ালা এই সংক্ষেপ করার মাঝে কল্যাণ রেখেছেন।

কোরআনে কারিমে ইরশাদ হচ্ছে,

‘তোমরা যখন জমিনে সফর করবে, তখন তোমাদের জন্য নামাজের কসর করায় কোনো আপত্তি নেই। ’ (সূরা আন নিসা: ১০)
 

এ প্রসঙ্গে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে,

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘আল্লাহতায়ালা তোমাদের নবীর জবানে নামাজকে মুকিম অবস্থায় চার রাকাত ও সফর অবস্থায় দুই রাকাত ফরজ করেছেন। ’ (সহিহ মুসলিম: ৬৮৭)

আর মুকিম অর্থাৎ ভ্রমণরত এলাকার স্থানীয় ইমামের পেছনে নামাজের নিয়ত করলে পূর্ণ নামাজই পড়তে হবে।

এ বিষয়ে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে,

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, মুসাফির যদি মুকিমদের সঙ্গে নামাজে শরিক হয় তবে সে তাদের মতো (চার রাকাত) নামাজ পড়ে। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা: ৩৮৪৯)

কসর নামাজের ফজিলত অপরিসীম। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার প্রিয় বান্দাদের সার্বিক কল্যাণের প্রতি লক্ষ করেই সহজ বিধান দিয়েছেন। আর মুসাফির সফরে অনেক সমস্যায় থাকেন, যে কারণে ইসলাম নামাজের মতো এত বড় ইবাদতেও ছাড় দিয়েছে।

ইমামে আজম আবু হানিফা রহ: বলেন, ‘সফরে চার রাকাত নামাজকে দুই রাকাতই পড়তে হবে।

আল্লাহ তাআলা বলেন,

 يُرِيدُ اللّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلاَ يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ 
“আল্লাহ তোমাদের সহজ চান, কঠিন চান না।” (সূরা আল বাকারাহ, আয়াত: ১৮৫)

আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে কোন দায়িত্ব অর্পন করেন না এবং এমন কোন আদেশ তার উপর চাপিয়ে দেন না, যা পালনে সে অক্ষম। তাই সফরে কষ্টের আশংকা থাকায় আল্লাহ সফর অবস্থায় দুটো কাজ সহজ করে দিয়েছেন।

আল্লাহ মুসলিম উম্মাহকে মুসাফির অবস্থায় সালাত যথাযথ আদায় করার তাওফিক দান করুন। মুসাফিরের জন্য ঘোষিত মহান আল্লাহ অনুগ্রহ লাভের তাওফিক করুন। আমিন।

প্রতিক্রিয়া মন্তব্য শেয়ার