মিলছে না চিকিৎসা-ওষুধ, করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু বাড়ছে

বিষয়: করোনাভাইরাস
Img

বেসরকারি কন্টেনার ডিপো এছাক ব্রাদার্সের মালিক হাজী মোহাম্মদ ইউনুস চিকিৎসার জন্য হাসপাতালের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে মারা গেলেন।

একটু অক্সিজেন পাননি বিদায়বেলায়। প্রবীণ আলেমে দ্বীন আল্লামা কাজী নুরুল ইসলাম হাশেমী লাখো মানুষের প্রিয়। তিনিও হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরে হয়রানির শিকার হয়েছেন। শেষে মারা গেছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সাবরিনা ইসলাম সুইটি শ্বাসকষ্ট নিয়ে মারা গেলেন।

চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ কবির চৌধুরী মারা গেছেন। তবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাননি।

এদিকে চন্দনাইশে মাওলানা রেজাউল করিম কোরাইশী মারা গেছেন চিকিৎসা সংকটে। হোন্ডা মিউজিয়ামের ম্যানেজার এ কে এম শামসুদ্দিন, পাঁচলাইশে নুরুন নবী নুরু, রাউজানে জে এম মহসিন, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের কর্মকর্তা করিম উল্লাহ, সাতকানিয়ার দক্ষিণ কাঞ্চনা নুর আহমদ চৌধুুরী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নটন কুমার পাল মারা গেছেন।

এভাবে প্রতিদিন অনেক মানুষ মারা যাচ্ছেন। করোনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কিংবা করোনা পজিটিভ হয়েছে এমন মৃত্যুগুলো হিসেবে থাকলেও করোনা উপসর্গ নিয়ে এক প্রকার বিনা চিকিৎসায় মারা যাওয়া মানুষের কোনো হিসেব নেই। প্রতিদিনই চেনাজানা অনেক মানুষ হারিয়ে যাচ্ছেন।

অপরদিকে, ওষুধের দোকান খোলা থাকলেও করোনা উপসর্গে ব্যবহৃত ওষুধের আকাল চলছে। দেড়শ টাকার ঔষধ দেড় হাজার টাকায়ও পাওয়া যাচ্ছে না। এই অবস্থায় মানুষ দিশেহারা।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার হটস্পট হয়ে উঠেছে চট্টগ্রাম। সামাজিক সংক্রমণ বাড়ায় প্রতিদিনই এখানে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। চট্টগ্রামে সরকারি হিসেবে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা তিন হাজার ছাড়িয়েছে। তবে পরীক্ষার সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেকেই শনাক্তের বাইরে রয়েছেন। তারা বলেছেন, পরীক্ষার সুযোগ না পেয়ে করোনা উপসর্গ নিয়ে অনেক মানুষ হাসপাতালের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছেন। হাসপাতালে ভর্তি হতে পারছেন না। প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না।

চট্টগ্রামে করোনা আক্রান্ত কিংবা করোনা উপসর্গ আছে এমন রোগীর পাশাপাশি সাধারণ রোগীও চিকিৎসা ক্ষেত্রে সংকটে আছেন। কোথাও চিকিৎসা পাওয়া যাচ্ছে না। হাতেগোনা কয়েকজন মানুষ আইসিইউ সাপোর্টসহ কিছু চিকিৎসা পেলেও বেশিরভাগের অভিজ্ঞতা ভয়াবহ।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্ল্যানিং অ্যান্ড এডমিন) মোহাম্মদ জাফর আলম জানান, আমাদের প্রায় চল্লিশ হাজার মানুষ রয়েছেন। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন মারা গেছেন। আক্রান্ত হয়েছেন কয়েকজন। করোনা উপসর্গও আছে অনেকের। তবে চিকিৎসা ক্ষেত্রে আমাদের অভিজ্ঞতা তিক্ত। বন্দরের কর্মীরা যাতে এই তিক্ততা থেকে নিস্তার পান, তাই বন্দর হাসপাতালে ৫০ বেডের করোনা ইউনিট করছি। আমরা হাইফ্লো অঙিজেন সাপ্লাইটা নিশ্চিত করতে চাই।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে পিতাকে হারিয়েছেন শিক্ষিকা মিনু রওশন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, চিকিৎসায় আমাদের অভিজ্ঞতা ভয়াবহ। আমার বাবাকে অঙিজেন সিলিন্ডার দেয়া হলেও গ্যাস ছিল না। একটির পর একটি পাল্টিয়ে তিনটি সিলিন্ডার দেয়া হয়। কিন্তু একটিতেও গ্যাস ছিল না। কষ্ট পেয়ে মারা যান বাবা।

ব্যাংক এশিয়ার ডিএমডি লায়ন মোহাম্মদ রোসাঙ্গির। শারীরিক অসুস্থতায় হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরছেন। কোথাও চিকিৎসা পাচ্ছেন না। শেষ পর্যন্ত তাকে ঢাকায় নিয়ে চিকিৎসার চেষ্টা করা হয়। এর আগে চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য সেক্টরের অন্যতম নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা, বিভাগীয় পরিচালক ডা. হাসান শাহরিয়ার কবির নিজের মায়ের চিকিৎসা চট্টগ্রামে করাতে না পেরে ঢাকায় চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

ভুক্তভোগীরা জানান, শত শত মানুষ এখন ন্যূনতম চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না। শুধু করোনা আক্রান্ত লোকজনই নন, জটিল নানা রোগে আক্রান্ত অনেক মানুষ চিকিৎসা না পেয়ে দুর্ভোগে পড়েছেন। কোভিড পজিটিভ কিনা নিশ্চিত না হয়ে রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি করা হচ্ছে না। কিন্তু চট্টগ্রামে তিনটি ল্যাবে করোনার নমুনা পরীক্ষা হলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল।

করোনা টেস্টের জন্য নির্ধারিত হাসপাতালগুলোতে সকাল হওয়ার আগে থেকে লাইন ধরে থাকতে হচ্ছে মানুষকে। নমুনা দিতে হিমশিম খেতে হয়। আবার নমুনা দিতে পারলেও টেস্টের রিপোর্ট আসতে লেগে যাচ্ছে সাত-আট দিন। জীবিত অবস্থায় করোনা টেস্ট করাতে না পারলেও মৃত্যুর পরে অনেকের নমুনা নেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রতিটি ল্যাবে জট তৈরি হয়েছে।

বেসরকারি ডায়াগনোস্টিকে করোনার নমুনা পরীক্ষার অনুমোদন দেয়া হলেও তা কার্যকর না হওয়ায় অনেক মানুষ টাকা থাকলেও কোভিড পরীক্ষা করাতে পারছেন না। এতে করে পদে পদে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। কোভিড পরীক্ষার সনদ না পেয়ে বিনা চিকিৎসায় মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটছে প্রতিদিন। এতে করে উদ্বিগ্ন মানুষ।

এ বিষয়ে বেসরকারি একটি হাসপাতালের একজন কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমরা চিন্তাভাবনা করছি। এটা যে অমানবিক এবং কষ্টকর তা বুঝতে পারছি। কিন্তু একজন কোভিড-১৯ রোগীকে সাধারণ রোগীর মাঝে এনে ভর্তি করতে পারি না। কোভিড পরীক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া ছাড়া রোগী ভর্তি করানো মানে পুরো হাসপাতালকে ঝুঁকির মাঝে ফেলা। তাই আমরা কোভিড রেজাল্ট দেখে রোগী ভর্তি করছি। চট্টগ্রামের বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক কোভিড ইউনিট চালু করছে। বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে কোভিড রোগী ভর্তি শুরু হলে সংকট কমে আসবে।

বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। যে হারে বাড়ছে সেই হারে চিকিৎসাসেবা বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। তবে সরকারি-বেসরকারিভাবে কোনো রোগী যাতে চিকিৎসা নিয়ে কষ্ট না পান সেই চেষ্টা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালে রোগী ভর্তির নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডাক্তার সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বেড বাড়ানো হয়েছে। আইসিইউ বাড়ানো হচ্ছে। হলি ক্রিসেন্ট হাসপাতাল চালু করা হচ্ছে। বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগী ভর্তির প্রক্রিয়া চলছে। করোনা রোগী নিয়ে সংকট কমে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

ওষুধ সংকট : চট্টগ্রামে করোনা উপসর্গে ব্যবহৃত দেশীয় কোম্পানিগুলোর ওষুধের সংকট দেখা দিয়েছে। বেশিরভাগ দোকানে পাওয়া যাচ্ছে না এসব ওষুধ। পরিচিত হলে কিংবা প্রভাব থাকলে কেউ কেউ পাচ্ছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেড়শ টাকার ওষুধের দাম নেয়া হচ্ছে দেড় হাজার টাকার বেশি।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ব্যবসায়ীরা মর্জিমাফিক চড়া দামে ওষুধ বিক্রি করছেন। অনেকে ওষুধের মজুদ গড়ে তুলেছেন। একাধিক মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিদেশি কোম্পানির ওষুধের সংকট হলে মেনে নিতে পারতাম। কিন্তু দেশীয় কোম্পানির ওষুধের সংকট মেনে নিতে পারছি না। তারা হাজারী গলিসহ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাতে জেলা প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান।

তবে একজন ঔষধ ব্যবসায়ী বলেন, কারখানাগুলোর উৎপাদনের একটি সীমা আছে। করোনায় ব্যবহৃত হয় এমন প্রচারণায় এসব ওষুধ মানুষ কিনে নিয়ে মজুদ করছে। তাই বাজারে সংকট সৃষ্টি হয়েছে।

প্রতিক্রিয়া মন্তব্য শেয়ার