মালয়েশিয়া বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অসাধারণ। বলছেন, মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মহ.শহীদুল ইসলাম।  দেশটিতে ভিবিন্ন সেমিনারে অংশ গ্রহনেই তার বাস্তব প্রমান। এটা মালয়েশিয়ার কাছে অনন্য আর অসাধারণ বাংলাদেশের স্বীকৃতি। মালয়েশিয়ার সাথে আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক এটা উচ্চতায়। সেখানে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অসাধারণ সম্মান তা সকল স্তরেই।
কারণ দুটি দেশেরই নেতৃত্বে এখন দুজন বলিষ্ঠ নেতা। বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সন্তান শেখ হাসিনা। যিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। আর আধুনিক মালয়েশিয়ার রুপকার তুন ডা: মাহাথির মোহাম্মদ।
এছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর গতিশীল নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রেখে দেশটির ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছেন।


বাংলাদেশ-মালয়েশিয়ার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে ১১ জুলাই উভয় দেশের দূতাবাসের সহায়তায় বিএমসিসিআইয়ের উদ্যোগে মালয়েশিয়ায় অনুষ্টেয়   শোকেস বাংলাদেশ গো-গ্লোবল ২০১৯ সম্মেলনে প্রবাসী দিগন্ত অনলাইন পোর্টালের এ প্রতিবেদকের সাথে একান্ত আলাপচারিতায় এ কথাই বলছিলেন মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার শহীদুল ইসলাম।  নানা বর্ণ, ধর্ম, সংস্কৃতির মানুষের দেশ মালয়েশিয়া। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কেন্দ্রে অবস্থিত দেশটিতে বাংলাদেশের দূত হিসেবে চার বছর আগে হাইকমিশনারের দায়িত্বে আসেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ১৯৮৪ ব্যাচের পেশাদার এই কূটনীতিক।
এর আগে সৌদি আরবে রাষ্ট্রদূত ও দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। এ ছাড়াও ব্রাসেলস, কলম্বো, আবুধাবি, রোম ও লসএঞ্জেলেসে বাংলাদেশ মিশনের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে মাস্টার্স এবং বেলজিয়ামের ইউনির্ভাসিটি লিব্রে ডি ব্রুসেলস থেকে আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিষয়ে দ্বিতীয়বার মাস্টার ডিগ্রি অর্জন করা এই কূটনীতিক মালয়েশিয়ায় আসার পর দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নিয়ে যান অনন্য উচ্চতায়।


দেশের ভাবমূর্তি উন্নয়ন, অভিবাসী শ্রমিকদের স্বার্থ সুরক্ষা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণসহ নানা বিষয়ে কাজ করেন তিনি।
দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদানের প্রশংসা করে শহীদুল ইসলাম বলেন, তাদের কর্ম, শিষ্টাচার, মেধা ও প্রজ্ঞা বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছে। এখন কমিউনিটির পক্ষ থেকে সভা করলেও হৈচৈ বা কোন গোলমাল হয় না। এটাই সম্ভাবনার বাংলাদেশ। নতুন বাংলাদেশ। এমন ভালো কিছুই দেখতে চাই আমরা। মালয়েশিয়াই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য সহযোগী দেশ। এশিয়ায় ভারত ও পাকিস্তানের পরই আমাদের অবস্থান।


গত ২০১৫ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারি তারিখের স্নিগ্ধ সকালে আমি মালয়েশিয়ায় হাইকমিশনারের কার্যভার গ্রহণ করার জন্য মালায়েশিয়ায় অবতরণ করি। সেই দিন থেকে আজ চার বছর পর এখন অনেক কিছুই বদলে গেছে। অনেক মালয়েশিয়ার কোম্পানি এখন বাংলাদেশের সাথে ব্যবসা করতে আগ্রহী। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ প্রসারিত হয়েছে। আমাদের দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বেড়েছে প্রায় ২৭.৩%  যা ২০১৭ সালের মার্কিন ডলার ১.৭৫ বিলিয়ন হতে ২০১৮ সালে এসে তা মার্কিন ডলারে ২.৩৭ বিলিয়নে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কগুলি গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে।
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে সম্পর্কের ইতিহাস অনেক পুরনো। পূর্ব-ইসলামিক যুগে, আরব ব্যবসায়ীরা তাদের দেশে ফিরে যাওয়ার পথে সুগন্ধি এবং মশলা নিয়ে কেলাং, মালক্কা, মালাবর উপকূলে এবং বিশ্বের অনেক অংশ দেশের মত বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরেও তাদের জাহাজ ভিড়াতেন। ঢাকার বিখ্যাত মসলিন সহ তারা বাংলাদেশ থেকে অনেক পণ্য কিনতেন। এমনও জনশ্রুতি আছে যে, রানী ক্লিওপেট্রাও মুসলিনে নিজেকে সজ্জিত করতেন। বস্তুত, বাণিজ্য ও সংস্কৃতির এই মেলবন্ধন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরেই বহমান।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মহান গতিশীল ও দূরদর্শী নেতৃত্বের অধীনে বাংলাদেশ এখন দ্রুত উন্নয়ন প্রত্যক্ষ করছে যার ফলে এখন একটি "উন্নয়নের মিরাকেল " হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে এবং বিশ্বের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে একটি অন্যতম দেশ হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে। এই বছর আমরা জিডিপি বৃদ্ধির হার ৮.১৩% অর্জন করেছি, বিশ্বের সর্বোচ্চ হারের মধ্যে একটি হিসাবে গন্য করা হচ্ছে।


বেসরকারি খাত আমাদের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। বাংলাদেশ দেশীয় ও বিদেশী উভয় উদ্যোক্তাদের উন্নয়ন ও ব্যক্তিগত বিনিয়োগের উপর সর্বাধিক  অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। সারা দেশে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছে। জিটুজি ভিত্তিতে এবং পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ মডেলের অধীনে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার জন্য চটগ্রামের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্প নগরে প্রচুর পরিমাণে জমি আছে। সফটওয়্যার বাংলাদেশের অন্যতম একটি সম্ভবনাময় শিল্পখাত। বাংলাদেশের ৮০০ টি সফটওয়্যার ও আইটি কোম্পানিগুলির মধ্যে ১৫০ টিরও বেশি বিদেশী প্রতিষ্ঠান করেছে। ২০,০০০ এরও বেশি বাংলাদেশি পেশাদার আইটি বিশেষজ্ঞ মাইক্রোসফ্ট, ইন্টেল, আইবিএম, ওরাকল এবং সিস্কো সহ বিভিন্ন আইটি কোম্পানিগুলিতে কাজ করে যাচ্ছে। আমরা আইটি পার্ক স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। দুটি সফ্টওয়্যার টেকনোলজি পার্ক ইতোমধ্যে তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে এবং ২৬টী হাই টেক পার্ক / সফ্টওয়্যার টেকনোলজি পার্ক নির্মাণাধীন রয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে দেশের ৬৪টি জেলার প্রতিটিতে কমপক্ষে একটি হাই-টেক পার্ক স্থাপন করার পরিকল্পনা গ্রহন করা হয়েছে। বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং জিডিপির পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বের ৪১ তম। শিল্প খাতের দ্রুতত বিস্তার আমাদেরকে আমাদের বার্ষিক রপ্তানি আয় মাত্র পাঁচ বছরে দ্বিগুণ করতে সক্ষম হয়েছে যা মার্কিন ডলারে ৩৬.৬৭ বিলিয়ন । ২০২৩-২০২৪ সাল নাগাদ রপ্তানি আয় আমাদের লক্ষ্যমাত্রা ৭২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। কৃষি ও সেবা খাতে টেকসই উন্নয়ন আমাদের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা দিয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যে আমরা সঠিক পথে এগিয়ে যাচ্ছি। প্রাইস ওয়াটারহাউস কোপার্স এর একটি রিপোর্টে শীর্ষ ৩২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশকে তালিকাভুক্ত করেছে যারা ২০৫০ সালের মধ্যে বৃহত্তম এবং সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতির হয়ে উঠবে। প্রতিবেদনটিতে আরও উল্ল্যেখ করা হয় যে, ২০৫০ সালের পিপিপি অনুসারে বাংলাদেশ ৩.০৬৪ মার্কিন ডলার জিডিপি নিয়ে ২৩তম অবস্থানে নিয়ে নেবে। ম্যাকিন্সি এন্ড কোম্পানি আরও উল্লেখ করে বাংলাদেশ দ্রুততম ক্রমবর্ধমান উৎপাদনশীল গন্তব্যস্থল, উদীয়মান উৎপাদন ও বিতরণ কেন্দ্র, এবং একটি ক্রমবর্ধমান উন্নয়ন অর্থনীতির দেশ হতে যাচ্ছে। আসলে এসব কিছুই নতুন এক বাংলাদেশের প্রতিবিম্ব। যোগ করেন হাইকমিশনার শহীদুল ইসলাম।
তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশে যে উন্নয়ন চলছে এবং সন্ত্রাসের হুমকি মোকাবেলা করে দেশ যেভাবে এগিয়ে চলেছে, তাতে বাংলাদেশকে এখন সবাই সম্মান জানাতে শুরু করেছে।


তিনি মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশিদের সমস্যা নিরসনে হাইকমিশনের তৎপরতার কথা তুলে ধরে বলেন, আমি গ্রাম থেকে উঠে আসা ছেলে। সমস্যার মধ্যে বড় হয়েছি। সমস্যাকে কীভাবে সম্ভাবনায় রূপান্তর করতে হয় তা দেখেছি। আমি (হাইকমিশনারের) দায়িত্ব নেওয়ার পর মালয়েশিয়া প্রবাসীদের সুবিধার বিষয়াদি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলেছি। প্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রমিকের চাহিদা বুঝতে এবং কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করতেই তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা হয়।
তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, আজকের উন্নত বাংলাদেশের সঙ্গে আগের বাংলাদেশের আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে সম্মানের জায়গায় নিয়ে এসেছেন। আজ কোনো অনুষ্ঠানে গেলে বাংলাদেশকে ঘিরে জানতে চান অন্য দেশের রাষ্ট্রদূতেরা। আমরা কীভাবে সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা করছি, কীভাবে এমডিজি পেরিয়েছি, এসডিজি নিয়ে কাজ করছি সে সম্পর্কে জানতে চান কূটনীতিকরা।


প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসী নেতৃত্বে রোহিঙ্গা ইস্যু বাংলাদেশ যেভাবে সামলেছে, তাতে মাথা উঁচু করে বিশ্ব দরবারে দাঁড়াতে পারছে আমাদের দেশ। মালয়েশিয়াও প্রবাসীদের জন্য সংকট নয়, অসাধারণ সম্মানবোধের জায়গা। আমরা সম্মানবোধের জায়গায় চলে এসেছি। এখন কেবল শ্রমখাতে নয়, বাংলাদেশিরা অন্যান্য সব খাতেও নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। যোগ করেন হাইকমিশনার।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জনগোষ্ঠীর বসবাস এই মালয়েশিয়ায়। উদীয়মান অর্থনীতির এই দেশে বাংলাদেশিদের রয়েছে যেমন অফুরন্ত সম্ভাবনা, তেমনি রয়েছে কিছু সমস্যাও। চিকিৎসা এবং ভ্রমণের জন্যও বাংলাদেশিদের কাছে দেশটি এগিয়ে।
মালয়েশিয়ার গণমাধ্যম থেকে পাওয়া তথ্যমতে, গত বছরের জুন মাসের পর থেকেই মালয়েশিয়ায় অনিবন্ধিত বিদেশিদের ধড়পাকড় বেড়ে যায়। বিভিন্ন সময়ে হাজারের ওপর বাংলাদেশি আটকের খবর পাওয়া যায়। তবে শহীদুল ইসলাম বলেন, এটি মালয়েশিয়ায় একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এর সঙ্গে পুনঃনিবন্ধনের কোনো সর্ম্পক নেই। বিভিন্ন অপরাধে বাংলাদেশিসহ অন্য দেশের বিদেশিরা আটক হন। এর মধ্যে নিবন্ধন না থাকাও একটি অপরাধ। মালয়েশিয়াই প্রথম সোর্স কান্ট্রি হিসেবে ঘোষণা করেছে বাংলাদেশকে। মালয়েশিয়ার তালিকায় থাকা ১৫টি দেশের অবৈধ জনশক্তির মধ্যে ৬১ ভাগ বৈধতা পেয়েছে কেবল বাংলাদেশেরই। অবশিষ্ট ৩৯ ভাগ বৈধতা পাবে ১৪টি দেশের। আর শ্রমবাজার খুলে যাবার সাথেই এই খাতে অফুরন্ত সম্ভাবনা অপেক্ষা করছে বাংলাদেশের জন্যে।