মাথা নিচু হয়ে আসে

Img

আমার জীবদ্দশায় আমি পেঁয়াজের এত ঝাল এর আগে কক্ষনো দেখিনি। অন্তত গত দুই সপ্তাহ যাবত যে কোন বাংলা সংবাদপত্র, ফেইসবুক এমন কি দেশে এবং প্রবাসী বাংলাদেশীদের যে কোন আড্ডার মুল আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এই পেঁয়াজ। আমাদের বাঙালি রসনার অন্যতম অঙ্গ এই পেঁয়াজ সব সময় যেন একটু আরালে আবডালে থাকতেই পছন্দ করতেন বাড়ীর সুবোধ ছেলেটির মত। বাড়ীর সুবোধ ছেলেটিকে নিয়ে মা বাবাকে খুব বেশি ঝক্কি পোহাতে হয় না কারন সে আর যাই করুক মা বাবাকে বিব্রত কর অবস্থায় পরতে হয় এমন কিছু করবে না এটাই সাধারন বিশ্বাস।

এই সুবোধ পেঁয়াজ আর বাসার সুবোধ ছেলেটি হয়ে থাকতে চাইলনা। বিদ্রোহ করল আর তাতেই সংবাদের শিরোনাম। বাংলা সংবাদপত্র যুগান্তরের অনুসন্ধানী রিপোর্ট হতে জানতে পারলাম প্রতি কেজি হিসাবে বাংলাদেশে এখন পেঁয়াজ পৃথিবীতে সবচেয়ে দামি। ভাল, ভালইত, ভালনা সারা বিশ্বে খুব বেশি বিষয়ে আমরা প্রথম না। সেই দিক থেকে বিবেচনা করলে অন্তত কোন সান্তনা আছে কিনা তা কেবল ভুক্তভোগীরা বলতে পারবেন।

এই যে পেঁয়াজের হঠাৎ করে সম্রাট হয়ে উঠা তা কতটা সার্বজনিন একটু খেয়াল করলেই অনুধাবন করা যাবে। বাংলাদেশে অর্থনৈতিক ভাবে প্রান্তিক মানুষটি হতে শুরু করে দেশে সব চাইতে ক্ষমতাবান মানুষটিকও এই পেয়জোলচনায় অংশ গ্রহণ করতে হচ্ছে। গত কয়েক দিনের প্রথম আলোর পেঁয়াজ নিয়ে শিরোনাম গুল ছিল এইরকম।পেঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ আরও বাড়াতে পারে ভারত। কাল রাতে আকাশ পথে আসছে পেঁয়াজের প্রথম চালান। পেঁয়াজের দাম অভিযানে কমল, শেষে আগের মতো। প্রধান মন্ত্রীর বাসায় পেঁয়াজ ছাড়াই রান্না। পেঁয়াজের দাম বাড়ানোর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যাবস্থা। ক্রেতা নেই, হাট থেকে ফেরত গেল বেশির ভাগ পেঁয়াজ। পেঁয়াজ বিমানে উঠে গেছে চিন্তার কিছু নেই, ইত্যাদি ইত্যাদি।

‘পেঁয়াজ বিমানে উঠে গেছে চিন্তার কিছু নেই’ গত ১৬ই নভেম্বর প্রধান মন্ত্রী এই সুসংবাদ জানালেন দেশবাসীকে আর আজ ১৯ই নভেম্বর বাণিজ্য সচিব জানালেন ‘কাল রাতে আকাশ পথে আসছে পেঁয়াজের প্রথম চালান’। কোনটা সত্য আমাদের মত সাধারন মানুষের পক্ষে কোন দিন তার জবাব পাওয়া দূরের কথা বরং প্রশ্ন করবারও সুযোগ নাই। আমার বিশ্বাস বাংলাদেশের ইতিহাসে আমাদের বর্তমান প্রধান মন্ত্রী হচ্ছে সব চাইতে ক্ষমতাশালী প্রধান মন্ত্রী। তিনি প্রায় আইনের শাসনের মধ্য থেকেই একটি বিরোধী দলকে ফাসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে নিঃশেষ করেছেন। একটি বিরোধী দলকে সরকারের অংশ বিরোধী দল অথবা গৃহপালিত বিরোধী দল কারো কারো মতে নিজস্ব বিরোধী দল বানিয়েছেন।

আর যে দলটির সত্যকার অর্থে বিরোধী দল হবার সুযোগ ছিল তাদেরকে হামলা, মামলা এবং কৌশলে মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দিয়েছে। আমাদের প্রধান মন্ত্রীর বিরুদ্ধ চারন করার দু;সাহস এখন বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডে কারো আছে বলে আমার মনে হয়না। এমন একটি চরম শক্তিশালী সরকারের বিরুদ্ধে কারা এবং কোন গোষ্ঠী এই রকমের একটা কন্সপেরিছি করবার সাহস দেখায় আমার চিন্তায় কুলায় না। তবে আমাদের অত্যান্ত ভোকাল তথ্য মন্ত্রী ইতি মধ্য ঘোষণা করেছেন ‘পেঁয়াজের দাম বাড়ানোর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যাবস্থা’। এখন সরকারের সকল গোয়েন্দা সংস্থা সর্ব শক্তি নিয়োগ করে দেখবে এই পেঁয়াজ কেলেঙ্কারির সাথে বিরোধী দলের কোন নেতার ভায়রা কিংবা ভাসুরের ছেলে জড়িত কিনা। তবেই তথ্য মন্ত্রী বাহাদুর বিরোধী দলকে শায়েস্তা করবার সূজোগ নিতে পারবেন।

‘প্রধান মন্ত্রীর বাসায় পেঁয়াজ ছাড়া রান্না’। একছত্র ক্ষমতার অধিকারী প্রধান মন্ত্রীর বাসায় যখন পেঁয়াজ ছাড়া রান্না হয় আর এই ম্যাসেজ আমাদেরকে ঢালাও করে দেবার মানে হতে পারে আমরাও যাতে পেঁয়াজ খাওয়া ছেড়ে দেই। যে দেশের প্রধান মন্ত্রী পেঁয়াজ ছাড়া খাবার খেতে পারে সেখানে আমিত নামকাওয়াস্তে মানুষ। এর আগে নিকট অতীতে কাচা মরিচের দাম বেড়ে যাবার ফলে কাচা মরিচ ছাড়া রান্নার পরামর্শ দিয়েছিলেন। বিশ্বাস করেন এমতাবস্থায় এমন পরাক্রমশালী প্রধান মন্ত্রীকেও খুব অসহায় মনে হয়। পৃথিবীর ইতিহাস বলে যেনতেন ভাবে ক্ষমতায় দীর্ঘ কাল থাকবার ফলে সরকার গুলো এভাবেই অসহায় হয়ে পরে। বিরোধী দল গুলো যখন অর্থব হয়ে উঠে তখন নিজ দলের মধ্যকার শক্তির বিরোধী পক্ষ হয়ে উঠবার অপেক্ষা করতে হয়। আমাদের সরকার এবং প্রধান মন্ত্রীর বেলাতেও কি একই রকম কিছু ঘটছে। শুধু মাত্র সময়ই তা বলতে পারবে।

‘পেঁয়াজের দাম অভিযানে কমল, শেষে আগের মতই’ এবং ‘ক্রেতা নেই, হাট হতে ফেরত গেল বেশির ভাগ পেঁয়াজ’। আমাদের বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা নিয়ে অন্তত শহর গুলোতে বিশেষত ঢাকায় মেয়র সাহেবেরা অনেক কবিতা শুনিয়ে ফেলেছেন ইতিমধ্য। আর শুধু একক ভাবে কাউকে দোষারোপ করব কোন বিচারে। পাইকারি হতে খুচরা ব্যবসায়ী সকলের প্রধান অস্র হচ্ছে মজুতদারী এবং উচ্চ মুল্য আদায় সেখানে আমরা শুধু মাত্রই ফুটবল।

‘পেঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ আরও বাড়াতে পারে ভারত’। আমাদের এমন অকৃতিম বন্ধু দেশ ভারত আমরা স্বাধীনতার প্রায় পঞ্চাশ পরও শুধুই বন্ধুত্বের ঋণ শোধ দিয়েই যাচ্ছি। প্রধান মন্ত্রী বলেছিলেন ‘এমন কিছু দিয়ে এসেছি যা ভারত সারা জীবন মনে রাখবে’। প্রায় চার বছর হয়ে গেল আমরা আজও জানতে পারলাম না সেই এমন কিছুটা কি? হয়ত কোন দিনই জানতে পারবনা। আমরা সারা জীবন মনে রাখবার মত কিছু দিয়ে এসেও পানির ন্যায্য হিস্যা পাইনা। উল্টো মজাদার ইলিশ পাঠিয়ে প্রতিদান হিসেবে পাই অকাল বন্যা। সবই অকৃতিম বন্ধুত্বের নিদর্শন।

অচিরেই হয়ত আমাদের লবণ ছাড়া তরকারি খাবার পরামর্শ শুনতে হতে পারে। আজকের পত্রিকার খবর লবণ বাজারে তার লোনা ছড়াতে শুরু করেছে। ছোট বেলায় মায়ের কোলে শুয়ে সেই যে এক রাজার গল্প শুনতাম, রাজা তিন মেয়েকে প্রশ্ন করল তোমরা আমাকে কেমন ভালবাস? বড় মেয়ে বলল মধুর মত, মেঝ মেয়ে চিনির মত সবচেয়ে আদরের ছোট মেয়ে বলল বাবা আমি তোমাকে লবণের মত ভালবাসি, বাবা রেগে তাকে ত্যাজ্য করল। আজ যদি কোন মেয়ে বাবাকে বলে বাবা আমি তোমাকে লবণের মত ভালবাসি। লবণের এই তেজি বাজারে বাবা হয়ত মেয়েকে ত্যাজ্য না করে বলবে মাগো তরকারি রান্নার সময় লবণের পরিবর্তে আমাকেই এক চিমটি দিয়ে দিও। কারন নিত্য পণ্যর এই মুল্য বৃদ্ধিতে আমাদের বাবাদের মাথাই সবচেয়ে বেশি নিচু হয়ে আসে। 

প্রতিক্রিয়া (২২) মন্তব্য (০) শেয়ার (৫)