কোরবানির ঈদের মাত্র কয়েকদিন বাকি। কিন্তু ঈদের কেনাকাটা করতে পারছেন না কাশ্মীরিরা। হাটবাজার ও দোকানপাট সব বন্ধ।

অনির্দিষ্টকালের জন্য ছুটি দেয়া হয়েছে স্কুল ও কলেজ। সড়কে ব্যারিকেড আর ফাঁকা রাস্তায় বন্দুক হাতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা কড়া প্রহরায়। যান চলাচল নেই। শুধু হাসপাতালের জরুরি সেবায় নিয়োজিত যানবাহন ছাড়া।

রোববার থেকে কার্যত অচল অধিকৃত কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগর। টেলিযোগাযোগ ও ইন্টারনেট বন্ধ, বিধিনিষেধের বেড়াজালে বন্দি পুরো উপত্যকা।

গ্রাম-শহরের পথ ও অলিগলি থেকে শুরু করে পার্বত্য এলাকায়ও সেনা, পুলিশ এবং বিএসএফ টহল দিচ্ছে। সব রাস্তা বন্ধ করে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। সবখানে কারফিউ। কাউকে বের হতে দেয়া হচ্ছে না বাড়ি থেকে। রাস্তায় কাউকে পেলেই জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে, কোথায় যাবে, কেন যাবে। সাত লক্ষাধিক সেনা মোতায়েনে কাশ্মীরকে দখল হয়ে যাওয়া কোনো শহর মনে হচ্ছে।

স্তব্ধ উপত্যকাজুড়ে শুধু একটা কথাই যেন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে- ভারত কাশ্মীরিদের নয়, এর জমিটুকুই চায়। আরও সহজে বললে, কাশ্মীরের মানুষ নয়, মাটি চায় ভারত। বুধবার ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে কাশ্মীরের দুর্ভাগ্যের এ চিত্র উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ল্যান্ড ও মোবাইল ফোন এবং ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে আগেই। বুধবার সব ক্যাবল টিভি নেটওয়ার্ক বন্ধ করা হয়েছে। এভাবে বাইরে থেকে কাশ্মীরে কেউ যোগাযোগ করতে পারছে না। এমনকি কাশ্মীরের ভেতরেও কেউ কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছে না। সংবাদমাধ্যমও কাজ করতে পারছে না। সংবাদমাধ্যমগুলো তাদের অফিসের আশপাশ থেকে খবর দিচ্ছে যে, মানুষজন বিক্ষুব্ধ।

পায়ে পায়ে নিষেধাজ্ঞার কারণে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এ অঞ্চলের বাসিন্দারা ঈদের কেনাকাটা করতে পারছে না। এর চেয়ে বাজে ও করুণ পরিস্থিতি এর আগে কখনও হয়নি।

তবে ঈদ সামনে রেখে কারফিউ শিথিল করা হতে পারে বলে আশা করছেন বাসিন্দারা। সে ক্ষেত্রে ঈদের জামাত পড়ার মতো শিথিল হবে কি না, সে ব্যাপারে সন্দিহান তারা। বাসিন্দারা তাদের নিজেদের পাড়ার বাইরে বের হতে পারছেন না। এমনকি প্রশাসন নিজেদের কর্মচারীদেরও কারফিউ পাস দেয়নি।

নিরাপত্তা বাহিনী সরকারি আইডি কার্ডও আমলে নিচ্ছে না। সব স্কুল-কলেজ, সরকারি ভবন এবং আদালত ভবনের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে অন্য রাজ্যের আধা-সামরিক বাহিনীর সদস্যরা। মঙ্গলবারও রাজস্থান থেকে ছয়টি বাসভর্তি বিএসএফ সদস্য নগরীর কেন্দ্রস্থল এসে নামে। শ্রীনগরের বাসিন্দারা রাজ্য ভাগের বিষয়টিকে অত্যন্ত ক্ষোভ ও হতাশার চোখে দেখছে। তারা এই পরিবর্তনকে মনে করছে, মুসলিমদের অংশ কমিয়ে আনাই হচ্ছে এর লক্ষ্য।

আবি গুজার (৩০) নামের একজন কাশ্মীরি তার পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমাদের ভাগ্যে কী আছে তা জানি। তারা প্রথম আসবে এ রাজ্যে বিনিয়োগের নাম করে। কাশ্মীর ইস্যুতে ভারত সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে কিছুদিন ধরেই উপত্যকায় দু’ধরনের মনোভাব লক্ষ করা যাচ্ছিল: ক্ষোভ অথবা আশা। কিন্তু কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন ও বিশেষ অধিকার বাতিল এবং জম্মু-কাশ্মীরকে দ্বিখণ্ডিত করে কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলে পরিণত করার খবর শোনার পর মঙ্গলবার কাশ্মীরিদের চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে শুধু পরাজয়ের চিহ্ন।

শ্রীনগরের লাল চকের কাছাকাছি এলাকার ৪৫ বছরের বাসিন্দা সাঈদ খান বলেন, এখন আর মত জানতে চেয়ে কী লাভ? সবকিছুই তো শেষ। কাশ্মীরের রাজধানী যেন এক ভুতুড়ে শহর এবং খানের এই অনুভূতি অনেকের কথাতেই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। হোক তা বাটমালোর এক ফল বিক্রেতা বা জনমানবহীন ঈদগাহের পাশ দিয়ে ছেলে হাঁটিয়ে নেয়া কোনো এক বাবা কিংবা রামবাগে ব্যারিকেডের পাশে প্রহরায় দাঁড়ানো কাশ্মীরি কোনো পুলিশ সদস্য।