ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে বলছি শুনছেন কি?

image
image

সাম্প্রতিক সময়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া যেসব কারণে খবরের শিরোনাম হচ্ছে তা কোন অর্থেই প্রত্যাশিত নয়!
শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ, বিপ্লবী উল্লাস কর, ব্যারিস্টার এ রসুল, নবাব স্যার সৈয়দ শামসুল হুদা, কথা সাহিত্যিক অদ্বৈত মল্ল বর্মণ, কবি আবদুল কাদিরের ব্রাহ্মণবাড়িয়া শিল্প, শিক্ষা, সাহিত্য-সংস্কৃতিতে অগ্রসরমান অসাম্প্রদায়িক অঞ্চল হিসেবে পরিচিত ছিলো। মেধা, যোগ্যতা ও আত্মসম্মানবোধে স্বকীয় মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত এই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ।

অথচ সেই তীর্থস্থান আজ ভুল কারণে শিরোনাম হচ্ছে।রত্নগর্ভা ব্রাহ্মণবাড়িয়া সংঘর্ষের জনপদ হিসেবে ক্রমশ পরিচিত হচ্ছে! একসময়কার শান্তির জনপদে প্রায়শই ঘৃণার বিষ্ফোরণ ঘটছে। ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ কোন ক্রেডিটের বিষয় নয়!! এটা ভালো উদাহরণ হতে পারে না।

যেখানে অন্যান্য জনপদ ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছে; ব্রাহ্মণবাড়িয়া পিছিয়ে পড়ছে। আমার ব্যক্তিগত পর্যালোচনায় মনে হয়েছে কিছু মানুষের আত্নঅহং একটু বেশি! এমন মানুষেরাই আলোচনার পথ বন্ধ করে একশনে (সহিংসতা) সমাধান হাতড়ে বেড়ায়! একটা ভুলে বিভ্রমে জীবন পাড় করে দিচ্ছে।

অবশ্য এসব মানুষের হিপোক্রেসি ও কম! একটা বৈশিষ্ট্য লক্ষ্যনীয় এরা যাকে বন্ধু ভাববে তার জন্যে জান দিবে; শত্রু হলে কুরুক্ষেত্র! বন্ধুকে জান দিলে দিক তবে এই কুরুক্ষেত্র নীতি অবশ্যই অগ্রহণযোগ্য! 

তবে এটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একক সমস্যা নয়; এখানে হয়তো একটু বেশি হচ্ছে। দেশের কমবেশি সব অঞ্চলে/জেলাতেই এই সমস্যা বিদ্যমান। সহিংসতা অবশ্যই সমর্থনযোগ্য নয়! এটা সাহস কিংবা শক্তিমত্তা নয়। সাহস, শক্তিমত্তা অন্তর্নিহিত বিষয়! নায্যতার পক্ষে রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করার সাহসই প্রকৃত সাহস!!

এটা সত্য, এই করোনা পরিস্থিতিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে আল্লামা জুবায়ের আহমেদ আনসারী সাহেবের জানাজায় বিপুল সংখ্যাক লোক সমাগমের যে ঘটনা ঘটেছে সেটা নিঃসন্দেহে অবিবেচনাপ্রসূত ও অসচেতনতার পরিচয় বহন করে! এমন ভুল আচরণ নিয়ে কোন সাফাই গাওয়ার সুযোগ নেই। হয়তো এখানে সবাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নয়; অন্যান্য জেলা থেকেও এসেছে। কথা হলো,যে জেলার লোকই হোক এই মুহূর্তে এমন লোকসমাগম অপ্রত্যাশিত! এই মুহূর্তে এটা একটি ট্র‍্যাজেডি ও বটে।

আত্নসমালোচনার জায়গা থেকে যদি বলি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সন্তান হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতীত ঐতিহ্য, মহৎ কর্ম নিয়ে আমি/আমরা যেমন গর্ব করি তেমনি নেতিবাচিক ঘটনাগুলো নিয়ে তেমনি বিব্রত ও লজ্জিত!! এগুলো সমর্থনযোগ্য নয়। 

সভ্যতা, শিক্ষা, সংস্কৃতির একসময়কার অগ্রসর জনপদ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অবস্থা এমন কেন সেটা নিয়ে ভাববার প্রয়োজন অবশ্যই আছে!

কথা হলো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কিছু সংখ্যক মানুষের অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের জন্যে র‍্যাশনাল, উদার, বন্ধুত্বপূর্ণ প্রগতিশীল মানুষদের খুব বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়!! 
তবে সাম্প্রতিক ঘটনায় গুটিকয়েক মানুষের অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের জন্যে পুরো জেলাকে ঢালাওভাবে দোষী সাব্যস্ত করা সমীচীন নয়; এটা অবিবেচনাপ্রসূত! বিশেষত অনেকের আক্রমণাত্মক কথাবার্তা ঘৃণা আর বিদ্বেষই ছড়াচ্ছে কেবল! একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিক তো ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা নিয়েই চরম অগ্রহণযোগ্য কথা বলেছেন!! এমন প্রতিক্রিয়াশীল আচরণ ও কিন্তু অসভ্যতা ও সংকীর্ণতার পরিচয় বহন করে; যা নিন্দনীয়! 

একটা জেলাকে নিয়ে যারা ট্রল করছেন তারা কি জানেন আপনার জেলার মানুষেরাও কোন না কোন ইস্যুতে এইরকমই উন্মাদ/পাগলামি আচরণ করতে পারে! প্রিয় মাতৃভূমির প্রতিটা জেলাই আমাদের; প্রিয় বাংলাদেশের!এখানে ব্রাহ্মণবাড়িয়াও তো বাইরের নয়। এমন জেলাভিত্তিক বিভেদমূলক মানসিকতা তৈরি করাই তো অযৌক্তিক। সবাই তো আমরাই!

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার যা ঘটছে সেটা অন্য জেলায় যে ঘটছে না তা কিন্তু নয়। সাম্প্রতিক বাস্তবতায় আমাদের কাওরান বাজার, নারায়ণগঞ্জ, কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন কিংবা মাওয়া, আরিচায় যা ঘটেছে সবকিছু একসূত্রেই গাথা! আজ মাওলানা আনসারী সাহেবের জানাযায় যা ঘটেছে; আগামী সপ্তাহে কিংবা মাসে চট্টগ্রামে, সিলেটে কিংবা রাজশাহীতে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি যে হবে না তা বলা যায় না!!

এই ধর্মীয় আবেগ, উন্মাদনা কিংবা ধর্মান্ধতা কোন আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য নয় বরং এটা উপমহাদেশীয় চরিত্র! জাতীয় দুর্যোগকে নিজের দুর্যোগ মনে না করা, কিংবা দায়িত্বজ্ঞানহীন ফ্যানাটিক লোকজন তো সর্বত্রই বিরাজমান!!

সমস্যার মূলে সর্বত্র আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা কার্যকর করতে না পারা! ধর্ম এবং বিজ্ঞানকে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী বানানো, ধর্ম ব্যবসায়ীদের কৌশল আর সর্ব সাধারণের ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট সবকিছুই কুশীলব এখানে!!

নিজ জেলা নিয়ে সবারই একটু আধটু বাড়তি আবেগ ভালোবাসা কাজ করে! এটাও সত্য স্বজাতিকেন্দ্রীকতার কারণে নিজের বাড়ি, জেলা, দেশ ও সংস্কৃতির ব্যাপারে মানুষ নির্মোহ হতে পারে না! তবুও বলছি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নেতিবাচক কারণে শিরোনাম হোক এটা চাই না; সমর্থনও করি না!!

সভ্যতা সংগ্রামে, ইতিহাস ঐতিহ্যের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এমন চেহারা মানায় না!! ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সন্তানেরা দেশে বিদেশে নিজের মেধা, যোগ্যতা ও অসীম দেশপ্রেম দিয়ে শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়াকেই নয় প্রিয় বাংলাদেশকেই গর্বিত করার সামর্থ্য রাখে! আগামীর ব্রাহ্মণবাড়িয়া হোক এমন শুভ চেতনায়, শুভ কর্মে দীপ্তমান!!

লেখক-

নাজমুল হাসান

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, কুমিল্লা।

প্রতিক্রিয়া মন্তব্য শেয়ার