ঐই রাতে আমরা উঠোনে লুকোচুরি খেলতাম। লুকোচুরিকে বলতাম, 'টুক পলান্তি'। ধবধবে জোছনায় উঠোনে সার দিয়ে রাখা অজস্র পাঁটকাঠীর আঁটি। আঁটির ভেতরে ঘাপটি মেরে বসে থাকতাম। কেউ একজন চোর হত, সে খুঁজে বের করবে সবাইকে। খুঁজে খুঁজে না পেলে চেঁচিয়ে বলবে, 'টুক দে, নাইলে চোর হও...'

টুক না দিয়ে চোর হওয়ার রিস্কে কেউই যেত না। আমরা আমাদের লুকানো জায়গা থেকে সতর্কতার সাথে চেঁচিয়ে বলতাম, 'টুক্কুরু টুক'। শব্দ লক্ষ্য করে সে ছুটে আসত, কিন্তু টুক্কুরু টুক বলার সাথে সাথেই আমরা ততক্ষণে আমাদের আগের জায়গা থেকে সরে গেছি। অন্য কোন ঘাপটি মেরে লুকানোর জায়গায়।

সেই রাত বৃহস্পতিবারের রাত। পরদিন স্কুল নেই, কাক ভোরের মক্তব নেই। সুতরাং বৃহস্পতিবার রাতে পড়াও নেই। দক্ষিণের খোলা মাঠ, তার পারে নদী, ফুরফুরে হাওয়ারা বুকের ভেতর কেমন তিরতির ছুঁয়ে দিত। আমরা সারাটা সপ্তাহ জুড়ে অপেক্ষা করতাম বৃহস্পতিবারের। স্কুলে তৃতীয় পিরিয়ডের পর ছুটি। ভুট্রু স্যার প্রায়ই থার্ড ক্লাসে আসতেন না। আমরা উৎকর্ণ হয়ে অপেক্ষা করতাম ছুটির ঘণ্টার। আহা, ছুটির ঘণ্টা!

স্লেটের ভেতর চকে লেখা যোগ বিয়োগ ভাগেদের থুথু দিয়ে মুছে আমরা ছুটতাম দিক্বিদিক। একটা আম, জাম কিংবা বরই গাছে স্লেট ছুড়ে মারতে পারলেই টুপটাপ ফলবৃষ্টি। তবে সেই স্লেট মারার কায়দাটাও জানা চাই। কায়দা জানলে যত জোরেই মার, স্লেট ভাংবে না। আর না জানলেই সর্বনাশ। একখানা স্লেট ভেঙ্গে গেল, কে কিনে দিবে? দামী মেটে স্লেট কুচকুচে কালো। চকে ঘষে যতই লেখা হোক, এক টুকরো কাপড় জলে ভিজিয়ে মুছে দিলেই, ব্যাস, আবার কুচকুচে কালো। কিন্তু আমরা যারা কাঠের স্লেটের মালিক, তাদের ভারি দুঃখ। আমাদের স্লেটের চকের দাগ ওঠে না। যতই ঘসি, সে হয়ে থাকে ধুসর। সেই ধুসর স্লেটে চক দিয়ে লিখলে তাতে দাগ ওঠে না। আম্মা তাই শিখিয়ে দিলেন, রোজ বৃহস্পতিবার রাতে, রান্নার শেষে, চুলা থেকে খানিক কয়লা তুলে সেই কয়লা জলে ভিজিয়ে স্লেটে ঘষতে হবে। তাহলে ধূসর স্লেট আবার কালো হবে, কুচকুচে কালো। সাদা চকের দাগ উঠবে স্পষ্ট। আমাদের বৃহস্পতিবারের রাতের গল্পে তাই কাঠ কয়লা আর স্লেটের গল্পও থাকত বেশ। কে জানে, সেই পোড়া

কয়লারা লুকিয়ে লুকিয়ে প্রতি ঘসায় স্লেটের বুকে তাদের পুড়ে যাওয়ার দুঃখ লিখে দিত কি না! কারণ প্রতিবার ধূসর হয়ে যাওয়া স্লেটের দিকে তাকালেই অসংখ্য এলোমেলো অর্থহীন আবছা দাগ দেখা যেত স্লেটের বুক জুড়ে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেই আমার মনে হত, ওই দাগগুলোয় যেন কোথাও কিছু লেখা আছে। কি? কি লেখা? কাঠকয়লার কষ্ট? পুড়ে যাওয়ার কষ্ট?

এই কত কত বছর বাদেও বৃহস্পতিবার রাতেরা রয়ে গেছে অদ্ভুতই। অফিসের ছুটির ঘণ্টা কখন? বাসায় ফিরে ঘুমানোর তাড়া নেই। পরদিনের সেই স্কুল কিংবা মক্তবের মতন অফিসও নেই। কিন্তু সেই লুকোচুরি? টুক পলান্তি? টুক্কুরু টুক? আছে? হা আছে। স্মৃতিরা লুকোচুরি খেলে। টুক্কুরু টুক করে জানান দেয়, তারা আছে। সেই দক্ষিণের খোলা মাঠ নেই, নদী নেই, তবুও কি যেন কি বুকের ভেতর তিরতির দীর্ঘশ্বাস হয়ে ছুঁয়ে যায়। এই শহুরে রাতের ধূসর অন্ধকারেরা যেন সেই আবছায়া ধূসর কাঠের স্লেটের মতন। এই রাতের অন্ধকারের শরীর জুড়েও যেন এলোমেলো অজস্র দাগ। সেই দাগে চোখ রাখলেই যেন পড়া যায় অগন্তি দীর্ঘশ্বাসের গল্প। স্লেটের বুকে কাঠকয়লার গল্পের মতন। জীবন কি কাঠকয়লা নয়? রোজ রোজ পুড়ে যাওয়া! আহা জীবন! আহা বৃহস্পতিবার! আহা সময়!
তবুও একটা জনম কেটে যায়, কেটে গেল, বৃহস্পতিবারের অপেক্ষায়! কাঠকয়লার দহনে, গল্পে, স্মৃতিতে...

লেখক: সাংবাদিক।