রাখে আল্লাহ মারে কে? ঢাকার শ্যামবাজারের ফরাশগঞ্জ এলাকায় বুড়িগঙ্গা নদীতে লঞ্চডুবির ঘটনায় সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত নারী ও শিশুসহ ৩২ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছে উদ্ধার কাজে নিয়োজিতরা। দীর্ঘ ১২ ঘণ্টা পর ডুবে যাওয়া লঞ্চের ভেতর থেকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার হলেন মধ্যবয়সী এক ব্যক্তি। সোমবার রাত ১০টার দিকে ডুবুরিরা যখন টিউবের মাধ্যমে লঞ্চটি ওপরে তোলার চেষ্টা করছিলেন এবং লঞ্চটির একাংশ ওপরে উঠে আসছিল ঠিক তখনই ওই ব্যক্তি লঞ্চ থেকে বেরিয়ে আসেন।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ফায়ার সার্ভিসের ডেপুটি ডিরেক্টর দেবাশিষ বর্ধন জানান, আমরা ধারণা করছি উদ্ধার হওয়া এই ব্যক্তি সম্ভবত ইঞ্জিন রুমে ছিলেন। সাধারণত ইঞ্জিন রুম এয়ারটাইট হওয়ার কারণে সেখানে পানি প্রবেশ করে না। ১০টা ১০ মিনিটের দিকে কুশন পদ্ধতি ব্যবহার করে জাহাজ ভাসানোর চেষ্টা করা হলে সম্ভবত ইঞ্জিনরুম খুলে যায়। সে সময় তিনি বের হয়ে আসেন। এবং উদ্ধারকর্মীরা তাকে উদ্ধার করেন।

তাৎক্ষণিকভাবে তাকে উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। ডুবুরিরা তাৎক্ষণিকভাবে তাকে লাইফ জ্যাকেটে ঢেকে এবং শরীর মেসেজ করে তার শরীর গরম করার চেষ্টা করেন। এরপর ওই ব্যক্তি চোখ মেলে তাকান।

উদ্ধার ব্যক্তির নাম সুমন ব্যাপারী। বাড়ি মুন্সিগঞ্জের টঙ্গীবাড়ীর আব্দুল্লাহপুর। তাকে মিডফোর্ড হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

কোস্টগার্ড ও নেভির কর্মকর্তারা জানান, তারা যখন উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিটিকে বিভিন্ন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছিলেন তিনি চোখের ইশারায় কথার জবাব দেয়ার চেষ্টা করছিলেন। তবে দীর্ঘ সময় পানির নিচে আটকে থাকায় তার শরীরের তাপমাত্রা নেমে গিয়েছিল। পানির নিচে তলিয়ে গেলেও এ ব্যক্তি কীভাবে বেঁচে গেলেন তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলছে।

প্রসঙ্গত, সকাল ৯টার দিকে মুন্সিগঞ্জ কাঠপট্টি থেকে প্রায় শতাধিক যাত্রী নিয়ে ঢাকায় আসছিলো এমভি মর্নিং বার্ড নামের একটি যাত্রীবাহিী লঞ্চ। অপরদিকে, চাঁদপুর থেকে ঢাকায় আসছিল ময়ূরী-২ লঞ্চটি। হঠাতই ময়ূরী-২ লঞ্চটি মর্নিং বার্ড লঞ্চটির উপর উঠিয়ে দিলে দুমরেমুচড়ে পানির নিচে তলিয়ে যায় মর্নিং বার্ড লঞ্চটি। এসময় অনেকেই সাঁতরে তীরে আসলেও অনেকেই ডুবন্ত লঞ্চের মধ্যে আটকা পড়েন।

এদিকে, উদ্ধার হওয়া ৩২ জনের মধ্যে ২০ জন পুরুষ, ৯ জন নারী ও ৩ জন শিশু রয়েছে বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাজ্জাদ হোসাইন।

নিহতরা হলেন- সুমন তালুকদার (৩২), মনির হোসেন (৫০), বিউটি বেগম (৩৮), আবু তাহের (৫০), শাহাদাত (৩৫), ময়না (৩৮) ও তার ছেলে সাজিদ (১২) এবং মেয়ে মুক্তা (১৪), আবু সাঈদ (৪৫), মারুফা (২৫) ও তার শিশু পুত্র তাহা (২), সত্যরঞ্জন (৫৫), সিপন (২৫), গোলাম হোসেন ভূঁইয়া (৩৫), শিপলু (২২), সুমনা বেগম (৩৫), সুফিয়া বেগম (৬০), গোলাপ হোসেন (৫০), মনিরুজ্জামান (৪৫), আফজাল হোসেন (৪৪), আবু তাহের (৪৫), সুবর্না আক্তার (৩৫), শাহাদাত হোসেন (৪০), হাফেজা খাতুন (৩৮), শহিদুল (৩৪), আমির হোসেন (৫৫), মাহিম (১৭) এবং দিদার (৪৫)। অপর তিনজনের পরিচয় পাওয়া যায়নি।

মজিবর সিকদার (৩৮) নামে বেঁচে যাওয়া এক লঞ্চযাত্রী জানান, লঞ্চের মধ্যে প্রায় ১৫০ জনের মতো লোক ছিল।

এদিকে, লঞ্চ দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যেয়ে লঞ্চডুবির ঘটনায় নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে দেড় লাখ টাকা এবং লাশ দাফনে আরও ১০ হাজার টাকা দেয়ার ঘোষণা দেন নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী।

তিনি বলেন, নিহত প্রতিটি পরিবারকে দেড় লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে এবং ঢাকা জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে লাশ দাফনের জন্য ১০ হাজার টাকা করে দেয়া হবে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, লঞ্চডুবির সিসিটিভির ফুটেজ দেখে মনে হচ্ছে এটি দুর্ঘটনা হতে পারেনা, এটি একটি পরিকল্পিত ঘটনা। দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

অপরদিকে, লঞ্চডুবির ঘটনায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (উন্নয়ন) মো. রফিকুল ইসলাম খানকে আহ্বায়ক এবং বিআইডব্লিউটিএ’র পরিচালক (নৌ নিরাপত্তা) মো. রফিকুল ইসলামকে সদস্য সচিব করে কমিটি গঠন করেছে মন্ত্রণালয়।

কমিটিকে আগামী সাতদিনের মধ্যে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দিয়ে একটি আদেশ জারি করা হয়েছে।

কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- নৌপরিবহন অধিদপ্তরের চিফ নটিক্যাল সার্ভেয়ার ক্যাপ্টেন জসিম উদ্দিন সরকার, বিআইডব্লিউটিসি’র প্রধান প্রকৌশলী, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নেভাল আর্কিটেকচার অ্যান্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক পর্যায়ের একজন প্রতিনিধি, ফায়ার সার্ভিস অধিদপ্তরের একজন উপযুক্ত প্রতিনিধি, নৌ পুলিশের একজন উপযুক্ত প্রতিনিধি।