আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী পাহাড়ি ছন এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। মাত্র ১৫/১৬ বছর আগেও দেশের গ্রামাঞ্চল কিংবা পাহাড়ি অঞ্চল প্রায় সবখানেই ঘরের ছাউনি হিসেবে ব্যবহার হতো ছন। তীব্র গরমের সময় ছনের ঘর ছিল খুবই আরামদায়ক। গ্রামের প্রায় প্রত্যেকটি ঘরেই দেখা যেত ছনের ছাউনি। তখন ছন আহরণ ও বিক্রি করে সংসার চালাতো অনেক দরিদ্র পরিবার। 

বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার আগে থেকেই ঘরের পুরোনো ছনের ছাউনি ফেলে দিয়ে নতুন ছন লাগাতে ব্যস্ত সময় পার করতো সমাজের দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষরা। বিশেষ করে মাটি ও বেড়ার ঘরে ব্যবহার হত পাহাড়ি ছন। বর্তমানে শতকরা ২/১ জন অ-স্বচ্ছল মানুষরাই কেবল ছনের ব্যবহার ধরে রেখেছেন। 

ছন কি? বর্তমান প্রজন্মের কাছে এখন অপরিচিত একটি বস্তু। চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার ২টি পৌরসভা ও ৮টি ইউনিয়নের কোথাও এখন ছনের ছাউনি তেমন চোখে পড়ে না। টিনসহ ঘর তৈরির অপরাপর জিনিসপত্র সহজলভ্য হওয়ায় মানুষ সেদিকে ঝুঁকে পড়ায় ইতিহাসে স্থান হতে যাচ্ছে পাহাড়ি ছন। ফলে হাজার বছরের দরিদ্র জনগোষ্টির পরম বন্ধু ছন’র অস্তিত্ব এখন বিলীন হতে বসেছে। 

এক সময় চন্দনাইশ উপজেলার পাহাড়ি অঞ্চল জামিজুরী, জঙ্গল জামিজুরী, হাশিমপুর, জঙ্গল হাশিমপুর, দোহাজারী লালুটিয়া, দিয়াকুল, হাতিয়াখোলা, কাঞ্চনাবাদ, এলাহাবাদ, লট এলাহাবাদ, ছৈয়দাবাদ, ধোপাছড়িতে প্রচুর ছন চাষ হতো। তখন দলে দলে লোকজন ছন খোলায় ছন কাটতে যেতো। বাংলা বছরের আশ্বিন থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত ছন আহরণ করা হয়ে থাকে। আহরণের পর পর্যাপ্ত রোদে ১৫/১৬ দিন শুকিয়ে নিয়ে তা বিক্রির উপযুক্ত করা হতো। এরপরই তা ব্যবহার উপযোগী হয়। বর্তমানে ছনের ব্যবহার কম হওয়ায় ধীরে ধীরে এর চাহিদা কমে যাচ্ছে। ফলে এসব এলাকায় আগের মত ছন চাষ করা হচ্ছে না। অথচ ঐতিহ্যগত এবং পরিবেশগত কারণে ছনের চাষ বৃদ্ধি করা উচিত বলে মনে করেন পরিবেশবাদীরা। 

উপজেলার বৈলতলী এলাকার পল্ল্লী চিকিৎসক অশোক সুশীল জানান, ১০/১২ বছর আগেও এলাকায় প্রচুর ছনের ছাউনির ঘর দেখা যেত। তিনি আরো বলেন, ছনের ছাউনির ঘর হারিয়ে যাওয়ার মূল কারণ হলো অগ্নি ঝুঁকি। এক সময় ছনের ঘরে প্রচুর অগ্নিকান্ড হতো। তাছাড়া ছন পঁচনশীল হওয়ায় প্রতিবছরই ঘরের চালায় নতুন ছন লাগাতে হয়। ফলে মানুষ আস্তে আস্তে সেমিপাকা ঘর নির্মাণ করে টিনের ছাউনির দিকে ঝুঁকে পড়ছে। তাছাড়া বর্তমানে টিন অতিব সহজলভ্য পণ্য হয়ে উঠেছে। ফলে টিনের ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে। 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এক সময় বিভিন্ন এলাকার লোকজন চন্দনাইশের দোহাজারী, খানহাট, বাগিচাহাট এসে ছন ক্রয় করতো। তবে এখনো অল্প-বিস্তর ছন বিক্রি হয় উপজেলার খানহাটে। বর্তমানে প্রতি ভার ছন প্রকারভেদে ৪শ’ থেকে ৫শ’ টাকায় বিক্রি হয়। 

চাষীদের মতে, ঢেউটিনের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় পাহাড়ে ছনের উৎপাদন কমে গেছে, ব্যবহারও কমে গেছে। ছন এখন অনেকটা বিলুপ্তির পথে। তারপরও গ্রামবাংলার অনেক সাধারণ মানুষ এখনো ছনের চালা সম্বলিত ঘর ব্যবহার করে পুরোনো ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।