বিদ্যাকুট উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষকের দুর্নীতির পাহাড়

Img

ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার নবীনগর উপজেলার শত বছরের প্রাচীন ও পুরনো বিদ্যাপীঠ বিদ্যাকুট অমর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়। ১৯৪৭ সালের ৭ আগস্ট কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক স্থায়ী স্বীকৃতি পাওয়া এই বিদ্যালয়টি ১৯১৩ সালে বিদ্যাকুট গ্রামের নিঃসন্তান দানবীর স্বর্গীয় বাবু অমর চন্দ্র ভট্টাচার্য্যের হাতে প্রতিষ্ঠিত হয়।

দেশভাগের আগ পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের শিক্ষা প্রসারে বিদ্যালয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বর্তমানে বাংলাদেশ ছাড়াও এই বিদ্যালয়টির হাজার হাজার সাবেক শিক্ষার্থী ভারতের কলকাতায় বসবাস করছে। বিদ্যালয়টি নিয়ে এসকল শিক্ষার্থীর রয়েছে আবেগ ও ভালবাসা।

জানা যায় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দ্বারা দীর্ঘদিন বিদ্যালয়টি পরিচালিত হলে, ২০১৬ সালে সরকারি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি মোতাবেক প্রধান শিক্ষকের পদ ভারমুক্ত করে নিয়োগ দেওয়া হয় মো. রফিকুল ইসলামকে। নিয়োগ পরীক্ষায় দ্বিতীয় হয়েও প্রভাব খাটিয়ে মো. রফিকুল ইসলাম প্রধান শিক্ষক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মো. রফিকুল ইসলাম বিদ্যালয়টিতে যোগদানের পর থেকেই এলাকার স্থানীয় মানুষের সাথে তার সম্পর্ক ভাল ছিলনা। নিজের গাম্ভীর্যের জন্য তিনি সমালোচিত হয়েছেন অনেকের কাছে।

২০১৯ সালের বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীন নিরীক্ষা প্রতিবেদন ও  ২০২০ সালের নবীনগর উপজেলা প্রশাসন কর্তৃক গঠিত তদন্ত/নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বেড়িয়ে আসে প্রধান শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলামের দুর্নীতি ও অনিয়মের চিত্র। 

বিদ্যালয় কর্তৃক অভ্যন্তরীন ৫ সদস্য নিরীক্ষা কমিটি সদস্যরা হলেন, আব্দুল হান্নান (সাবেক দাতা সদস্য), আবু হানিফ (সাবেক অভিভাবক সদস্য), শাহজাদা রানা (সাবেক অভিভাবক সদস্য), আশরাফুল আলম (শিক্ষক প্রতিনিধি), বাবু বিমল দেবনাথ (শিক্ষক প্রতিনিধি)।

নবীনগর উপজেলা প্রশাসন কর্তৃক গঠিত তদন্ত/নিরীক্ষা অফিসারগন হলেন- মো. মোকাররম হোসেন, উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার, মো. গোলাম মহিউদ্দিন, উপজেলা সমবায় অফিসার ও আহবায়ক তদন্ত/নিরীক্ষা কমিটি।
 
সাময়িক বরখাস্ত হওয়া প্রধান শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীন ও উপজেলা প্রশাসনের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে যেসকল অনিয়ম ও দুর্নীতির কথা উল্লেখ করা হয় তা হলো- 

প্রধান শিক্ষকের হাতে বিদ্যালয়ের নগদ ৭,৯২,০০০ টাকা যা এখনো জমা হয়নি, মসজিদ খাতে ৩,৫০,০০০ টাকা, দোকান ঘরের জামানত খাতে ১,৫০,০০০ টাকা, দোকান নির্মাণ খাতে অতিরিক্ত ৫৯,৪৩,০০০ টাকা ব্যয় দেখানো, অনুমোদন বিহীন খরচের ভাউচার ৫২,৫৩,২২১ টাকা, অনুমোদন বিহীন বেতন বৃদ্ধি ৮০,১০০ টাকা, উপবৃত্তির টিয়েশনি ফি ২,৮০,০০০ টাকা সহ মোট ১ কোটি ২৯ লক্ষ তিনশত একুশ টাকা অনিয়ম/ আত্মসাৎ করেছে বলে উল্লেখ করা হয়।

২০১৫ সালের জুলাই মাস থেকে শুরু করে ২০১৯ সালের জুলাই পর্যন্ত বিদ্যালয়টির পাঁচ বছরের আয়/ব্যয় হিসেবে এ চিত্র ফুটে ওঠে।

উল্লেখ যে মসজিদ খাতের ৩ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা দুই বছর পর কমিটির চাপে জমা দেয় সাময়িক বরখাস্ত হওয়া প্রধান শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম। বাকি টাকা উদ্ধারে বার বার কমিটির পক্ষ থেকে বলা হলেও জমা দেয়নি মো. রফিকুল ইসলাম। 

এ বিষয়ে বিদ্যালয়টির বর্তমান সভাপতি মো. সফিকুর রহমান বলেন সাময়িক বরখাস্ত হওয়া প্রধান শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্তকরণ ও তদন্ত/নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাৎ বিষয়ে চিঠির মাধ্যমে অবহিত করা হয়েছে। 

তিনি আরও বলেন, ব্যক্তি মসজিদের টাকা আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে বছরের পর বছর নিজের কাছে রাখতে পারে তার দ্বারা সব কিছুই আত্মসাৎ করা সম্ভব। তার জিম্মায় থাকা বিদ্যালয়ের সকল নথিপত্র ও ব্যাংকের চেক বহিগুলো বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. বিল্লাল মিয়া চৌধুরীর নিকট জমা দেওয়ার জন্য তাকে বিশেষ ভাবে বলা হয়েছে।নবীনগরের বর্তমান সংসদ সদস্য মো. এবাদুল করিম বুলবুল মহোদয় সাময়িক বরখাস্ত হওয়া প্রধান শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলামের অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাৎ করার বিষয়ে অবগত আছেন এবং তিনি প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ডিও লেটারও দিয়েছেন। 

নবীনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ মাসুদ স্যার নিজে প্রশাসন কর্তৃক প্রদত্ত বিদ্যালয়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই করে আমাদের চিঠির মাধ্যমে অবহিত করেছেন। আশা করছি সাময়িক বরখাস্ত হওয়া প্রধান শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলামের অর্থ আত্মসাৎ এর বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তি করে শত বছরের পুরনো এ বিদ্যালয়টিকে কলংক মুক্ত করা হবে।

এ বিষয়ে বিদ্যাকুট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. এনামুল হক ভিপি এনাম বলেন, আমার কাছে উক্ত বিদ্যালয় থেকে আসা এক চিঠিতে অভ্যন্তরীন ও উপজেলা প্রশাসনের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া প্রধান শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলামের অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাৎ করার বিষয়ে প্রমাণ পাওয়া গেছে। আমি আশা করছি বর্তমান কমিটি অভ্যন্তরীন ও উপজেলা প্রশাসনের নিরীক্ষা প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই করে তার বিরুদ্ধে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

সাময়িক বরখাস্ত হওয়া প্রধান শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলামের কাছে তার বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীন ও উপজেলা প্রশাসনের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে যে সকল অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাৎ করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে সে বিষয়ে তা কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অডিট রিপোর্টে আমার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ সম্পূর্ণ সত্য নয় এবং বিদ্যালয়ের অডিট চলাকালে আমার মতামত ও সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়নি। বর্তমানে অডিটর রিপোর্টের কোনো কপি আমার হাতে আসেনি। রিপোর্টের কপি হাতে পেলে অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারব।

এ বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার ও প্রশাসন কর্তৃক নিয়োজিত অডিট কমিটির সদস্য মোকাররম হোসেন বলেন আমাদের কাজ ছিল নিরপেক্ষ ভাবে নিরীক্ষা প্রতিবেদন তৈরি করা। নিরীক্ষা কাজে কারও সাক্ষাৎকার ও মতামত নেওয়ার প্রয়োজন হইনা। আমাদের নিরীক্ষা প্রতিবেদন নবীনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ মাসুদ স্যার যাচাই-বাছাই করে একতম পোষণ করেছেন।

প্রতিক্রিয়া মন্তব্য শেয়ার