বাড়ছে কিশোর অপরাধ, নজরদারি নেই আড্ডাস্থলে

Img

ছোট থেকে বড়। ছিনতাই থেকে খুনখারাবি। নানা অপরাধে জড়াচ্ছে কিশোররা। গড়ে তুলছে নিজস্ব গ্যাং। সারা দেশেই ক্রমশ বাড়ছে কিশোর অপরাধীর সংখ্যা। ভিনদেশি সংস্কৃতির প্রভাব আর পরিবারের যথাযথ দেখাশোনার অভাবের কারণেই শিশু-কিশোররা অপরাধে জড়াচ্ছে বলে মনে করেন সমাজ বিশ্লেষকরা।

সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে মত তাদের। কৈশোরে শিশুর শারীরিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানসিক পরিবর্তনও হতে থাকে। আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না কিশোররা। পরিস্থিতি, পরিবেশ তাদের যৌন হয়রানি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন ধ্বংসাত্মক কাজে উৎসাহিত করতে পারে বলে মত মনোবিজ্ঞানীদের। মাদকের ভয়াবহতা ও কথিত বড় ভাইদের উসকানিকে কিশোরদের অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠার অন্যতম কারণ বলে মনে করেন সমাজবিজ্ঞানীরা। কেউ কেউ মনে করেন, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পাশাপাশি পারিবারিক শিক্ষার অভাবও এর জন্য দায়ী।

সন্তানের শিক্ষা ও চরিত্র গঠনের প্রতি অভিভাবকদের যতটা মনোযোগ দেয়া দরকার, প্রায়ই তা দেয়া হয় না। অন্যদিকে মাদক বিক্রেতা থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ পর্যন্ত অনেকেই নিজের সামান্য লাভের জন্য কিশোরদের অপরাধ জগতে টেনে নেন। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে কিশোরদের ব্যবহার করেন। ফলে একসময় এ কিশোররা পরিবারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তখন শুধু পাড়াপড়শির নয়, নিজের পরিবারের জন্যও তারা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।

কিশোর আড্ডা থেকে ঘটছে খুনের ঘটনা: রাজধানীর উত্তরায় কিশোর ‘গ্যাং গ্রুপ’র হাতে ট্রাস্ট স্কুল এন্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র আদনান কবীর খুন হয় ২০১৭ সালের ৬ জানুয়ারি। এর ঠিক একবছর ১০দিন পর ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি চট্টগ্রাম শহরের জামাল খানে আরেক আদনান খুন হয় গ্যাং গ্রুপের হাতে। আদনান খুনের পর নগর পুলিশের উত্তর ও দক্ষিণ জোনের আট থানায় চিহ্নিত করা হয়েছিলো ১৭৩ কিশোরদের আড্ডাস্থল। কয়েকদিন নজরদারি রাখার পর তা আর অব্যাহত থাকেনি।

আদনান খুনের এক বছর চার মাসের মাথায় ফের কিশোরের গুলিতে গত ৬ এপ্রিল খুন হয় কিশোর ‘গ্যাং গ্রুপের’ নেতা লোকমান হোসেন রনি। লোকমানের নেতৃত্বে একদল কিশোর নগরীর গোলাপাহাড় এলাকায় নিয়মিত আড্ডা দিতো। নিজের গ্রুপের এক কিশোরের প্রেমের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাকলিয়া খালপাড় এলাকায় আরেক কিশোর গ্রুপের সদস্যের ওপর নিজের আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে খুন হন লোকমান। এ ঘটনায় পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয় বাকলিয়া খালপাড় এলাকার কিশোর গ্রুপের আরেক বড় ভাই সাইফুল।

নগর পুলিশের দক্ষিণ জোনের উপ-কমিশনার (ডিসি) মেহেদী হাসান জানান, কিশোর অপরাধ রোধে স্কুল কলেজগুলোতে আমরা নিয়মিত সমাবেশ করছি। তবে কিশোরদের বিষয়ে সবচেয়ে বেশি সচেতন হতে হবে অভিভাবকদের। কিশোররা সাধারণত এডভেঞ্চার প্রিয় হয়। অনেক সময় এতে তারা বিপদগামী হচ্ছে।

তিনি বলেন, কিশোর অপরাধ বন্ধ করতে পারিবারিক ও সামাজিক অনুশাসন খুবই গুরুত্ব বহন করে। বর্তমানে সামাজিক অনুশাসন অনেকটা নেই বললেই চলে। এ অবস্থায় পারিবারিক অনুশাসন বাড়াতে হবে। একজন কিশোরের কাছে তার অভিভাবকের চেয়ে ভাল বন্ধু অন্য কেউ হতে পারে না। কিশোর বয়সে সন্তান ছোটখাটো ভুল করতেই পারে। সন্তানের পিছনে অভিভাবকদের বেশি বেশি সময় দিতে হবে। কিশোর অপরাধীদের নেপথ্যে থাকা বড় ভাইদের আইনের আওতায় আনার কাজ চলছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, হাতেগোনা কয়েকটি আড্ডারস্থান ছাড়া বাকিগুলোতে মাদক সেবন, মাদক ব্যবসা, কিশোর ও উঠতি বয়সী যুবকদের নিয়ে বড় ভাইদের আড্ডা, স্কুল কলেজগামী ছাত্রীদের ইভটিজিং, রাজনৈতিক গ্রুপিং এবং এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তার নিয়ে মারামারি আর খুনের ঘটনা সৃষ্টি হচ্ছে।

লোকমান হোসেন রনি হত্যা মামলায় অভিযুক্ত গ্রেপ্তার জিয়াউদ্দিন বাবলু আদালতে দেয়া স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দিতে বলেন, সদ্য কৈশোর পার হওয়া দুই তরুণের প্রেমের ঘটনাকে কেন্দ্র করে খুন হয় লোকমান। নগরীর গোলপাহাড় এলাকায় নিয়মিত আড্ডা দিতো কিশোর জয় ও অনিকদের একটি গ্রুপ। আর এ কিশোর গ্রুপের নেতৃত্ব দিতো লোকমান। খালপাড় এলাকার বড় ভাই সাইফুলের নিয়ন্ত্রণেও কয়েকটি কিশোর গ্রুপ রয়েছে। সাইফুলের অনুসারী কিশোর ছোটন লোকমানের মাথা লক্ষ্য করে প্রথমে গুলি করেছিলো।

নগর পুলিশের উত্তর জোনের উপ-কমিশনার (ডিসি) বিজয় বসাক জানান, কিশোর আড্ডাস্থলগুলোক নজদারিতে রয়েছে। তবে কিশোর অপরাধ কমাতে অভিভাবকদের সচেতনতা খুবই গুরুত্বপুর্ণ। আমরা ইতোমধ্যে স্কুল কলেজগুলোত স্টুডেন্ট কমিউনিটি পুলিশিং চালু করেছি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্র/ ছাত্রীদের সাথে নিয়মিত বৈঠক করছি। অনেক ছাত্র/ছাত্রী আমার মুঠোফোনে সরাসরি ফোন করে তাদের বিভিন্ন সমস্যার কথাও জানায়। সন্তানদের বিষয়ে নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রত্যেকে সচেতন হলে কিশোর অপরাধ রোধ করা অনেকটা সহজতর হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মূলত রাজনৈতিক সমর্থন, বিপুল অর্থপ্রাপ্তি এবং এলাকায় প্রভাব প্রতিপত্তির কারণে কিশোররা নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। রাজনীতির খোলসে কথিত বড় ভাই কিশোরদের হাতে তুলে দিচ্ছে ভয়ংকর অস্ত্র। ২০১৮ সালের কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র আদনান খুনের ঘটনার পর কিশোর আড্ডাস্থলে নজরদারি বাড়িয়েছিলো নগর পুলিশ। নগর পুলিশের উত্তর ও দক্ষিণ জোনের আট থানায় কিশোরদের ১৭৮টি আড্ডাস্থল চিহ্নিত করেছিলো পুলিশ।

এরমধ্যে উত্তর জোনের খুলশী থানায় ৩৪টি,পাঁচলাইশ থানা এলাকায় ৩৩টি, চান্দগাঁও থানায় ২৩টি, বায়েজিদ বোস্তামী থানা এলাকায় ১৫টি ও দক্ষিণ জোনের চার থানার মধ্যে কোতোয়ালিতে ৩২,বাকলিয়া থানা এলাকায় পাঁচটি, চকবাজার থানায় ১৪টি, ও সদরঘাট থানায় ২২টিসহ ১৭৮ টি আড্ডার স্থান চিহ্নিত করা হয়েছিলো। তবে এসব আড্ডাস্থল কয়েকদিন নজরদারি রাখার পর তা আর অব্যাহত রাখেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

প্রতিক্রিয়া মন্তব্য শেয়ার