প্রবাসীদের দুর্দশা

গোলাম রসুল (মনির), কুয়ালালামপুর-মালয়েশিয়া

Img

প্রবাসীদের কথা শুনলেই অনেকেরই মনে হয় তারা ভিন্ন গ্রহের মানুষ বাংলাদেশি না। কিন্তু তারা আমার আপনার পরিবারের একজন। একটা মায়ের কলিজার ধণ, একটি পরিবারের রত্ন, দেশের একজন রেমিটেন্স সৈনিক।

যে মানুষটি আজ প্রবাসী সেই তো এক সময়ের স্কুলের সবার প্রিয় ছাত্র ছিলো
অন্য দশজন ছেলের মত তারও জীবন ছিলো আনন্দময়, পরিবারের চাপে  অথবা পরিবারের অন্য ভাই-বোনদের সুখের চিন্তা করে সেই স্কুলের সেরা ছাত্রটিই পড়ালেখা বন্ধ করে দিয়ে, সংসারের হাল ধরার জন্যই তাকে প্রবাস জীবন বেছে নিতে হয়।

খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি  একজন  প্রবাসী বিদেশে পাড়ি জমায় তার পরিবারের জন্যই, কখনোই তার নিজের সুখের জন্য নয়। এই পরিবারের সুখের জন্য অনেক প্রবাসী আছে ঠিক সময়ে বিয়েটা পর্যন্তও করতে পারেনা। কারন একজন প্রবাসীর সকল সুখই বিসর্জন করতে হয়, যখন যে প্রবাসের মাটিতে পা রাখে ,  এবং যা চলতে থাকে নিজ দেশে স্থায়ীভাবে না ফিরে যাওয়া পর্যন্ত। তার চিন্তা করতে হয় ভাই-বোনের পড়াশুনার খরচ বাবা-মায়ের চিকিৎসার খরচ। যার কারনে একজন প্রবাসী তার নিজের জন্য চিন্তা করার সময়ই পায়না। প্রবাস জীবন হলো একটা “স্বল্প পানির কুপের মতো” না পারে পানিতে ঢুবে মরে যেতে, না পারে কুপের উপরে উঠতে।

সারা পৃথিবী মিলে প্রায় এক কোটি ২৫ লক্ষেরও বেশি প্রবাসী রয়েছে। 
এর মধ্যে স্টুডেন্ট ব্যাতীত  কেউই তার নিজের ক্যারিয়ারের জন্যে প্রবাসে আসেনা, সবাই কাজ বা চাকুরি করে টাকা ইনকামের জন্যেই আসে। 
বিদেশে আসা সম্পর্কে পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় সবারই ভরসা করতে হয় ভিসা এজেন্সির উপর আমাদের দেশের কিছু অসাধু এজেন্সিগুলো ওয়ার্ক পারমিট ভিসার কোটা শেষ হবার পরও স্টুডেন্ট ভিসায় নিয়ে আসেন হাজার হাজার মানুষ। আর এই সকল প্রবাসীদের প্রবাসের আসার পর পরই পড়তে হয় নানান সমস্যায়।

 আমরা যে ভূলটা করে থাকি, কোন দেশে ওয়ার্ক পারমিট  না চালু থাকলে সেদেশের স্টুডেন্ট ভিসায় যেয়ে কাজের আশা করা আর স্টুডেন্ট ভিসায় সে দেশে যাওয়া দুইটায় একদম বোকামি ও ঝুকি সমপন্ন। 

আর এরকম বুঝি সমপন্ন জীবন কাটাতে হয় বেশিরভাগ প্রবাসীদের। খুবই কম মানুষেরই তাদের ভিসা পাসপোর্ট এর সাথে কাজের মিল আছে।প্রায়ই ধরা পড়তে হয় পুলিশের হাতে, কিছু কিছু সময় পুলিশের হাতে কিছু টাকা দিলেই ছাড় মিলে আবার কখনো ছাড় মিলেনা আবার কপাল খারাপ হলে ভাগ্যে জেল-জরিমানাও ও ব্লাক লিস্টে পড়ে একেবারে দেশেও পাঠানোও হতে পারে।

তারপরও আমরা স্টুডেন্ট ভিসায় ক্রমাগত বিদেশে আসছি এবং বোকামি ও ঝুঝিতে থাকছি। আমার দেখা মালয়েশিয়াতে একটা কন্সট্রাকশন কাজের  সময় মালয় পুলিশ অপারেসি চালাচ্ছিলো, এক মুরুব্বি বাংলাদেশি বয়স পয়তাল্লিশ উর্ধ ।  পুলিশ তার পাসপোর্ট চেক দিয়ে দেখে সে একজন কলেজের ছাত্র, ডিপ্লোমা কোর্সের রানিং একজন ছাত্র উনি।, দেখুন কি আজব ব্যাপার, আসলে  এত বয়স্ক লোকটার স্টুডেন্ট ভিসা কেমনে হলো, কে করলো উনার ভিসা, কিভাবে সম্ভব হলো  এই বয়সে ডিপ্লোমা কোর্স এ আসার?  এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আরো অনেক কথা বলতে হবে, অন্য এক দিন এ বিষয়ে বিস্তারিত  আরোচনা করা যাবে ইনশায়াল্লাহ।


যদি পড়াশুনার উদ্দেশ্য না হয়, তাহলে কখনোই সুডেন্ট ভিসায় কাজ করার নিয়্যতে আসা ঠিকনা। আর এমনই অনিয়মের ফাদেঁ স্টুডেন্ট ভিসায়, কাজ করার নিয়্যতে  আসছেন অনেকে। বিভিন্ন এজেন্সি বা দালাদের ক্ষপ্পরে পড়ে পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে বাধ্য হয়ে আসতে হচ্ছে। যার পরিণাম সারা জীবনের জন্য জেল-জারিমানা বা বড় অংকের অর্থ জরিমানা, সেই সাথে নির্যাতন তো আছেই।

এক বুক আসা নিয়ে একটা মানুষ প্রবাসে পাড়ি জমায়, আর এজেন্সিগুলোও তাদের রঙ্গিন রঙ্গিন সপ্ন দেখায়, আর সেই স্বপ্নে মুখোরিত হয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে আমরা বিদেশে আসি। 

চলুন দেখি  কিভাবে প্রাবাসীদের পদে পদে ঠকানো হয়:- 

যেখানে খরচ লাগে ১ থেকে ২ লক্ষ টাকা। সেখানে একজনের ভিসার জন্য নেওয়া হয় ৩ থেকে ৪ লক্ষ্য টাকা। একজন মানুষ  তার গৃহপালিত গরু-ছাগল, ক্ষেতের জমি বিক্রি করে দিয়ে বিদেশে পাড়ি জমায়। 
বিদেশ আসার পর পরিবারের ভাই-বোন আত্বীয় স্বজন মনে করেন যে, বিদেশ মানেই গাদা গাদা টাকা পয়সা ইনকামের রাস্তা, কিন্তু একজন প্রবাসী যে কত কষ্ট করে টাকা ইনকাম করে, সেটা কেউ যদি স্বচক্ষে দেখে তাহলে প্রবাসীদের পাঠানো টাকা খরচ করতে তাদের হৃদ্বয় নাড়া দিতো।

দিন-রাত কঠোর পরিশ্রম করে গায়ের ঘাম পায়ে ফেলে বড় বড় বিল্ডিং কনস্ট্রাকসনের, রড সিমেন্টের কাজ, কৃষি বা ফ্যাক্টরির কাজ করতে হয়, খুব কম মানুষই তাদের ভিসা অনুযায়ি কাজ পায়, এজেন্সিগুলো ভিসার আগে বলে আপনার কাজ ফুল গাছে পানি দেওয়া যার বেতন মাসে ৬০,০০০ হাজার টাকা , আসলে ফূল গাছে পানি দেওয়া আর বাগানে গাছের পরিচর্যা করার কোন কাজই বিদেশে নাই, সব মিথ্যা ভূয়া। 

বলবে ভালো শপিং মলে এসি রুমে ডিউটি, বেতন ৭০,০০০ হাজার টাকা। আসার পর দেখবেন আপনাদেক ১৫ তলা বিল্ডিং এর উপরে জীবনের রিস্ক নিয়ে দেওয়াল রং এর কাজ করতে হচ্ছে,  এজন্সি বলবে; বসের ছেলে-মেয়েকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া আর নিয়ে আসা এটাই হচ্ছে আপনার কাজ বেতন মাসে ৫০,০০০ হাজার টাকা, আসার পর দেখবেন আপনাকে মটর গ্যারেজের গাড়ির যন্ত্রপাতির তৈরি কারখানায় কাজ করতে হচ্ছে, আর এ সব কাজের পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় একটু সতর্কতার অভাব হলেই ভারি ভারি এই মেশিনে কেট যেতে পারে আপনার হাত-পা, মূহুর্তেই হয়ে যেতে পারে আপনার মৃত্যু, এবং আগুনের বিরাট তেজে খুব সহজেই আপনার সুস্থ শরীরে বেধে যাবে অসুস্থের দানা।

 এত প্রতারনা করা হয় এই প্রবাসীদের সাথে, ভাবছেন এই এজিন্সির নামে মামলা অভিযোগ করবেন, প্রবাসীর অভিযোগে তাদের কিছুই হবেনা, বরং আপনারই ক্ষতি হতে পারে।তবে প্রবাসীরা তাদের নিজ নিজ দূতাবাসে তাদের অভিযোগগুলো জানালে কখনো সমাধান মিলে অথবা কখনো সমাধান মিলেও না।

এত কিছুর পর এত কষ্টের পরও একজন প্রবাসী বছরকে বছর কাজ করে চলছে, যখন বিদেশে আসছিলো বয়স ছিলো ২১/২২ কিংবা বছর
কবে যে ত্রিশ-পয়ত্রিশ বা তার বেশি বয়স পার করে দিছে, যা তার নিজের হিসাবেও নাই, তার জীবন যৌবণ সবটুকুই পার করে দিতে থাকে এই প্রবাস জীবনে, শুধু তার পরিবার-পরিজনের চিন্তা করে। 

একজন প্রবাসীর টাকায় চলে তার পরিবারের ঈদের খরচ।
 প্রবাসী  ঈদের দিনে বাবা-মাকে ফোন দিয়ে খোঁজ-খবর নেয়, মিষ্টান্ন, হালুয়া-রুটি,   খাইছে কিনা অথবা নতুন  শাড়ী বা জামা কিনছে কিনা?

দেশের তার পরিবারে ঈদ ঠিকই জাক-জমক লাগিয়ে পালিত হয়। কিন্তু একজন প্রবাসীর ঈদের দিনও যে তাকে ডিউটি করতে হয়! এটার খবর কি কেউ রাখে !

শুধুমাত্র পরিবার ভালো থাকুক, বাবা-মা ভালো থাকুক, ভাই-বোন ভালো থাকুক এটাই একজন প্রবাসীর কাম্য থাকে, ডিউটি করতে করতে কাজর ফাকেঁ এভাবেই  বলে আমার তো এক সপ্তাহ ছুটি, আমি বাসায় বসে বিরিয়ানী খাচ্ছি , পরিবার যাতে তাকে নিয়ে চিন্ত না করে এজন্যই এমন মিথ্যা কথার আশ্রয় নিতে হয় তাকে। 
ভাবছেন প্রবাসীরা মিথ্যাবাদী ! এছাড়াও অনেক নাটক করে চলতে হয় একজন প্রবাসী, সে চায় তার জীবনে বিনিময়ে ভালো থাকুক তার পরিবার পরিজন। 

এরপরও একজন প্রবাসী পরিবারের কাছে ভালো হতে পারেনা। এক দুই মাস দেশে টাকা একটু কম পাঠাইলেই শুরু হয়ে যায় ফোনে অত্যাচার, কেন কম টাকা পাঠালে, অমুকে এত টাকা পাঠাইছে, বেতন পেয়ে কি আজে-বাজে খরছ করোছো? সব টাকা বিদেশেই খরচ করে ফেলো আমাদেরকে অল্প টাকা দাও, আরো কত কথা শুনতে হয়, যদি কোন কারনে এক দুই মাস কম টাকা পাঠানো হয়।

দেখেছি অনেক প্রবাসী পরিবারের এই যন্ত্রণা সহ্য না করতে পেরে হাতে থাকা দামি  ফোনটি আছাড় দিয়ে ভেঙ্গে ফেলতে।

একটা সরকারি কর্মচারির পরিবারের কেউ মারা গেলে বা চাকুরি বয়স শেষ হয়ে গেলে পায় পেনশন, ভাতা, তাছাড়া চাকুরি চলাকালীন সময়েও পায় নানান সরকারি সুবিধা। একটা খেলোয়াড় একটু  ভালো পারদর্শীতা দেখাতে পারলেই তার জন্য ঘোষণা হয়ে যায় গাড়ি-বাড়ির, আজ পর্যন্ত একটা প্রবাসীর জন্য আমরা কি পেরেছি একটা সুবিধা  দিতে !

প্রবাসীর রেমিটেন্সের টাকায় চলে দেশ, আবার এই প্রবাসীদের যখন দেশে যায় তখন স্বীকার হতে হয় নানান ধরনের হয়রানি, নিজের বৈধ টাকায় স্ত্রী-পরিবারের জন্য নিয়ে যায় কিছু স্বর্ণালংকার, কসমেটিকস, টেলিভিশন ও অন্যান্য ব্যবহারের সামগ্রী সেটাই চুরি হয়ে যায় এয়ারপোর্টে, যা প্রায়ই দৈনিক প্রতিকার শিরোনামে আসে বা কিছু ভাইরাল ভিডিও দেখা যায় সোস্যাল মিডিয়াতে, প্রবাসীর লাগেজ উধাও, বা লাগেজ কাটা ভেতরের জিনিস অর্ধেক নাই। 

আর কত অত্যাচারিত হবে এই প্রবাসীরা?
কবে শেষ হবে প্রবাসীদের দূর্দশা? 
কবে পাবে একজন প্রবাসী তার ন্যায্য সম্মাণ?

প্রতিক্রিয়া মন্তব্য শেয়ার