হিন্দু পুরাণ মতে পরমেশ্বরের সাথে প্রেমকেই পরকীয়া বলা হয়েছে। অর্থাৎ ঈশ্বরের সাথে আমাদের আত্মার যে প্রেম সেটাকে হিন্দু পুরাণে পরকীয়া হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। শ্রুতি,  স্মৃতিশাস্ত্র,পুরান ও দর্শনে পরকীয়া সম্পর্কে অনেক মতামত দেওয়া হয়েছে। কোথাও এটাকে জঘন্য অপরাধ  হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, আবার কোথাও নমনীয়তার উদাহরণ অনেক। শ্রুতির দিক হতে পরকীয়া একটি জঘন্য পাপ হিসেবে গণ্য। 

ইসলামে পরকীয়াকে বলা হয়েছে জঘন্যতম ব্যভিচার ও অনাচার। এটা সম্পূর্ণ একটি হারাম কাজ। বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক অর্থাৎ পরকীয়া সেটা ছেলে করুক বা মেয়ে করুক অর্থাৎ স্বামী করুক বা স্ত্রী করুক উভয়ের ক্ষেত্রেই এটা হারাম। এই কাজটি স্বামী করলে স্ত্রীর জীবন ধ্বংস আর স্ত্রী করলে স্বামীর জীবন ধ্বংস আর ছেলে মেয়ের জীবনও ধ্বংস এবং আখেরাত তো ধ্বংস হবেই। 

আমরা পরকীয়াকে যেভাবেই ধরি না কেন, পরকীয়া যে বর্তমান যুগে একটি মহামারীর আকার ধারণ করেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই পরকীয়ার উৎস ধরেই বর্তমান যুগে স্বামী হত্যা করছে স্ত্রীকে, স্ত্রী হত্যা করছে স্বামীকে। আবার কখনো তার প্রভাব পড়ছে সরাসরি গিয়ে সন্তানের উপরে। কখনো ঘটছে বিবাহ বিচ্ছেদ যার ফলশ্রুতিতে সন্তানেরা হয়ে পড়ছে মানসিক বিকারগ্রস্থ। পরকীয়া কখনোই কোনো ব্যক্তিগত সমস্যা নয়। এটা একটা পারিবারিক সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সমস্যা। এতে কত সহজেই একটা পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়, কত পুরুষ বা নারী আত্মহননের পথ বেছে নেয় তা হিসেব ছাড়া। পরকীয়া নিঃসন্দেহে একটি প্রতারণা। 

পরকীয়ার মত ব্যাধিতে স্বাভাবিক যে সব কারণে নারী বা পুরুষ আক্রান্ত হয় তার কিছু কারণ উল্লেখ করতে চেষ্টা করলাম।

যে সব নারী বা পুরুষ তার সঙ্গি বা সঙ্গিনীর সান্নিধ্য কম পায় বা অবহেলার স্বীকার হয় তারা অনেক সময় নিঃসঙ্গতা থেকেই পরকীয়ার সম্পর্কে জড়িয়ে পরে।

লোভ থেকেও সৃষ্টি হতে পারে এই জটিল ব্যাধি। যেমন স্বামী যদি আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল হয় তাহলে অর্থের লোভে স্ত্রী অন্য পুরুষের সাথে পরকীয়ায় জড়াতে পারে। আবার অন্যদিকে পুরুষ মানুষ যদি যৌন জীবনে অসুখী হয় সেক্ষেত্রেও প্রক্রিয়াতে জড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বৌদ্ধিক তারতম্য বা ইন্টেলেকচুয়াল ডিফারেন্স এর কারনেও পরকীয়া সম্পর্কের সৃষ্টি হতে পারে। অর্থাৎ স্ত্রী যদি স্বামীর থেকে বেশি বুদ্ধিমতি হয় তাহলে স্ত্রী তার সমপর্যায়ের বুদ্ধিমত্তা লোককেই খুজবে সঙ্গী হিসেবে। যার ফলশ্রুতিতে সৃষ্টি হবে পরকীয়া।

কোন স্ত্রী যদি তার স্বামীর দৃষ্টি আকর্ষণে ব্যর্থ হয় এবং স্বামীর স্ত্রীর প্রতি নজর না থাকে সে ক্ষেত্রে ফলাফল পরকীয়া দাঁড়াতে পারে।

 ক্ষমতা এবং অর্থ লোভে অনেক পুরুষই আপন স্ত্রীকে ছেড়ে অন্য কারোর সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলে এবং পূর্ববর্তী সংসার ভেঙে দেয়।

এবার আমরা আলোচনা করবো পরকীয়ার জন্য দায়ী কে? 
এই ব্যাধির জন্য নারী বা পুরুষ যে কেউ দায়ী হতে পারে। তবে পর্যবেক্ষণ করে জানা গিয়েছে বিয়ের পরবর্তী সম্পর্ক গুলোর জন্য নারীদের থেকে পুরুষরাই বেশি দায়ী। অনেক সময় দেখা যায় সমাজে অনেক পুরুষ আছে যারা সুযোগ সন্ধানী। তারা নারীদের দূর্বলতা খুঁজতে থাকে যেমনঃ একটি বিবাহিত নারী কোন জায়গাটায় অসুখী সেটাকে টার্গেট বানিয়ে সেই নারীকে ঘায়েল করতে চেষ্টা করে। একদিন দুইদিন করতে করতে হয়তো যে কেউ এই ফাঁদে পা দিতে পারে। এমন কাজ যে নারীদের দ্বারা সংঘটিত হবেনা তা কিন্তু নয়। তবে এ বিষয়টি নারীদের চেয়ে পুরুষদের দ্বারাই বেশি হয়ে থাকে। নারীরা শুধু ফাঁদে পা দেয়। আর এই পা দেয়াতেই ধ্বংস হয় একাধিক জীবন এমনকি শেষ হয় দুইটি পরিবার। আর সন্তানদের জীবনে নেমে আসে আমাবস্যার আধার।

ধর্ষণের মত পরকীয়াও একটি নৈতিক অবক্ষয়। আর এখান থেকে বাঁচার উপায় ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা। নিজ পরিবারের সুখ দুঃখ অন্য কারোর সাথে ভাগাভাগি না করা। এই ভাগাভাগি করতে গেলেই ভাঙ্গা বেড়া দিয়ে ঢুকবে বেড়াল। নিজেদের পারিবারিক সমস্যা নিজেরাই সমাধান করতে পারলে সবচেয়ে ভাল। তারপরেও যদি সম্ভব না হয় তাহলে পরিবারের বড়দের সাহায্য নিতে হবে। এ অবস্থায় পরিবারের বাহিরের লোকজন দিয়ে সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করলে বহিরাগতদের আগমন ঘটার সম্ভবনা খুব বেশি। তাই নিজেদের সমাজ, সংসার, পরিবার ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে এই নৈতিক অবক্ষয় থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে হবে।