রমাদান একটি বরকতপূর্ণ মাস, ভাল কাজের প্রতিদান বৃদ্ধির মাস। ভাল কাজে যথাসম্ভব প্রতিযোগিতা করার মাস। প্রত্যেক সুবুদ্ধি ও বিবেকবান মানূষের উচিত, এ মাসের প্রতিটি মুহুর্তকে গুরুত্ব দেয়া এবং ভাল কাজে ব্যবহার করার চেষ্টা করা এমন ভাবে যে, একটি মিনিটও যেন নষ্ট না হয়। ঈমানদার ভাইদের সুবিধার্থে আমরা কয়েকটি কাজের কথা উল্লেখ করছি। প্রত্যেক মুসলিম নর নারী এ কাজগুলো করে রমাদানকে যথাযথ মর্যাদা দান করতঃ আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সন্তুষ্টি অর্জনে ধন্য হতে পারেন।

১) ফজরের ছলাতের পর মসজিদে বসে আল্লাহর যিকির করা, কুরআন তেলাওয়াত করা বা কুরআন শিক্ষা দেয়া। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ ‘যে ব্যক্তি জামাতের সহিত ফজরের ছলাত আদায় করবে, তারপর সূর্যোদয় পর্যন্ত বসে আল্লাহর যিকর করবে অতঃপর দুরাকাত ছলাত আদায় করবে, তার জন্য পরিপূর্ণ হজ্জ ও উমরার ছওয়াব হবে।’ {তিরমিযী, সহীহুল জামেঃ ৬৩৪৬।}

২) সিয়ামাবস্থায় ফরয ছলাত সমূহ নিয়মিত আদায়ের সাথে সাথে যথাসম্ভব কুরআন তেলাওয়াত করা উচিত। তাছাড়া কুারআন মজীদ মুখস্থ করা, অর্থ বুঝে পড়া এবং অধ্যয়ন করারও বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কুরআনের সাথে সিয়ামের বড় সম্পর্ক রয়েছে। যার কারণে সিয়ামের মাসেই কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। হাদীসে বর্ণিত আছে যে, রমাদান মাসের প্রত্যেক রাত্রিতে জিবরীল (আঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে সাক্ষাৎ করতেন এবং কুরআন পড়াশোনা করতেন। {বুখারী, মুসলিম।} ইমাম যুহরী (রহঃ) রমাদান আগমন হলে বলতেনঃ ‘এটি তো কুরআন তেলাওয়াত এবং গরীবদের খাওয়ানোর মাস’। ইবনু আব্দিল হাকীম বলেনঃ ‘রমাদান যখন আসত, তখন ইমাম মালেক (রহঃ) হাদীস পড়া এবং জ্ঞানীদের সাথে বসা বাদ দিতেন এবং দেখে দেখে কুরআন পড়ায় মগ্ন হতেন’। ইমাম আব্দুর রাজ্জাক বলেনঃ ‘রমাদান যখন আসত তখন ইমাম সাউরী অন্য সব নফল ইবাদত বাদ দিতেন এবং কুরআন তেলাওয়াতে লেগে যেতেন। হাদীসে বর্ণিত আছে যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের কোন একটি অক্ষর পাঠ করবে, তার বদলে সে একটি নেকী পাবে, আর একটি নেকী দশ নেকীর সমান হবে’। {সহীহ তিরমিযী/হাঃ ২৯১০।} সুতরাং যারা কুরআন তেলাওয়াত করতে জানে তারা যেন রমাদানে দৈনিক নিয়মিত তেলাওয়াত করে। আর যারা পুরো কুরআন তেলাওয়াত করতে জানে না, তারা ছোট ছোট সূরা গুলি পড়তে পারে। এতেও অনেক ছওয়াব রয়েছে। এমনকি কাজ করতে করতেও এরূপ অনেক সূরা পাঠ করা যায়।

৩) যিকর, দুআ ও ইস্তেগফার করা, প্রত্যেক মুসলমান নিজের পরিবারের জন্য এবং সকল মুসলিম নর নারীর জন্য বেশী বেশী দুআ ও ইস্তেগফার করবে। বিশেষ ভাবে রাত্রির এক তৃতীয়াংশ বাকী থাকাকালীন সময়ে বেশী দুআ ও ইস্তেগফার করবে। কারণ এসময় আল্লাহ তা’আলা নিচের আসমানে অবতরণ করেন এবং বলেনঃ ‘কেউ কি আছ ক্ষমা প্রার্থী? আমি তাকে ক্ষমা করে দেব। {তিরমিযী, সহীহুল জামেঃ ৮১৬৮।}

৪) সিয়াম পালনকারীদেরকে ইফতার করানো। এটি অনেক বড় একটি ছওয়াবের কাজ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ ‘যে ব্যক্তি কোন সিয়াম পালনকারীকে ইফতার করাবে সে সিয়াম পালনকারীর সমান ছওয়াব পাবে। আবার সিয়ামপালনকারীর ছওয়াবে কম করা হবে না। {নাসায়ী, তিরমিযী, ইবনু মাজাহ, সহীহুল জামেঃ ৬৪১৫।}

৫) তারাবীহের ছলাত এবং কিয়ামুল্লাইল বা তাহাজ্জুদ পড়া। এমনিতেই বছরের যে কোন রাত্রে কিয়ামুল্লাইল {রাত্রিকালীন ছলাত} বৈধ ও অতি উত্তম প্রতিদান সম্পন্ন কাজ, তবে বিশেষভাবে রমাদান মাসের কিয়ামুল্লাইলকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুবই গুরুত্ব দান করেছেন। তিনি বলেনঃ ‘তোমরা রাত্রের ছলাত {তাহাজ্জুদ}কে ধরে রাখ। কেননা তা তোমাদের পূর্বে সকল ভাল লোকদের অভ্যাস ছিল। তাহাজ্জুদ তোমাদের জন্য তোমাদের রবের নৈকট্য লাভের বড় কারণ। এটি পাপমোচনকারী এবং পাপ থেকে বাধা দানকারী।’ {সহীহুল জামেঃ ৪০৭৯।} তারাবীহের ছলাত খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও তাগিদ সম্পন্ন সুন্নাত। রমাদান মাসের রাত্রে তারাবীহ পড়া পূর্বের সকল গুণাহ ক্ষমা হওয়ার কারণ হয়। সকল মুসলমানদেরকে তা আদায় করা উচিত। {বুখারীঃ ৩৬,মুসলিমঃ ১৬৫৪।} তারাবীহের ছলাত জামাতের সহিত আদায় করা সুন্নাত। ইচ্ছা করলে মহিলারাও মসজিদে গিয়ে তারাবীহের ছলাত আদায় করতে পারে। তবে তাদের জন্য তাদের ঘরে ছলাত আদায় করা বেশী উত্তম। {মুসলিম,হাঃ ১৬৫৪,আবি দাউদ/ ১৩৭৫ ও ৫৩০।} তারাবীহের ছলাত ইশা থেকে ফজর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে আদায় করতে হবে। {মুসলিম,হাঃ ১৫৮৮,ছহীহা, ১০৮।}

৬) বেশী বেশী নফল ইবাদত করা। যেমন ছলাত, ছদকা, আত্মীয়তা বজায় রাখা এবং অসুস্থ ব্যক্তিদেরকে দেখা ইত্যাদি।

৭) দান করা, অর্থাৎ আর্ত, মুখাপেক্ষী এবং গরীব লোকদের জন্য ব্যয় করা। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্য মাসের তুলনায় এই মাসে সব চেয়ে বেশী দান-খয়রাত করতেন।  

৮) উমরা আদায় করা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ ‘রমাদানে একটি উমরা আদায় করা আমার সাথে হজ্জ করার সমান ছওয়াব হবে।’ {সহীহুল জামেঃ ৪০৯৮।}

৯) শেষ দশ তারিখে ই’তিকাফ করা। ই’তিকাফের ফযীলত অনেক বেশী। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় প্রতি বছরই ই’তিকাফ করতেন।

১০)যাকাতুল ফিতর বা ছদকায়ে ফিতর আদায় করা সিয়ামে রমাদানের ক্রটি বিচ্যুতির ক্ষতিপূরণ হিসেবে এবং আর্তমানবতার সহায়তার লক্ষ্যে ঈদের ছলাতের পূর্বে শরীয়ত কর্তৃক ধার্য্যকৃত যে খাদ্য বস্তু প্রদান করা হয়, তাকেই যাকাতুল ফিতর বা ছদকা ফিত্রা বলা হয়। আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ নবী কারীম  সিয়াম পালনকারীদের অপ্রয়োজনীয় কার্য্যকলাপ ও অশ্লীল বাক্যালাপের পাপ হতে পবিত্র করণের জন্যে এবং দুস্থ মানবতার ভক্ষণের উদ্দেশ্যে যাকাতুল ফিত্বর ফরয করেছেন। যে ব্যক্তি ঈদের ছলাতের পূর্বে তা আদায় করবে তা যাকাতুল ফিতর হিসেবে গণ্য হবে, আর যে ব্যক্তি ঈদের পরে আদায় করবে তা সাধারণ ছদকার মত হবে। {ইবনে মাজা,হাঃ ১৪৮০।}

যাকাতুল ফিতর প্রত্যেক মুসলিম নর-নারী, ছোট বড়, স্বাধীন, দাস দাসী, ধনী-দরিদ্র সকলের উপর ফরয। (সহীহ বুখারী।) ঘরের দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে মাথা পিছু সবার পক্ষ থেকে যাকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে। {সহীহ বুখারী।} যাকাতুল ফিতরের পরিমাণ হল, এক ছা, যা আড়াই কিলোগ্রামের সমান। {সহীহ বুখারী।} অথবা অর্ধ ছা গম, যা প্রায় দুই সেরের সমান। {আবু দাউদঃ ১৬২০, সহীহাঃ ১১৭৭,সহীহুল জামেঃ ২৪১।} যাকাতুল ফিতর আদায়ের সময় হল, শেষ রোযার ইফতারের পর থেকে ঈদের ছলাতের পূর্ব পর্যন্ত। কিন্তু ঈদের দু’এক দিন পূর্বে আদায় করে দেয়াতে দোষের কিছু নেই। {সহীহ বুখারী।} উল্লেখ্য, যাদেরকে যাকাত দেয়া যায় তাদেরকে ছদকা ফিতর দিতে হবে।