একটি প্রশ্ন বারবার উত্থাপিত হচ্ছে- জনগণ প্রস্তুত, বিএনপি শেষ সময়ে, কিন্তু জনগণ তাদের সঙ্গে রাস্তায় নামছে না কেন? না নামার কারণ কি এটা হতে পারে? বিশ্বাস এবং জন আস্থার সংকট এ দলটির উপর।

মন্ত্রিপরিষদের সাবেক সচিব ড. সা’দাত হুসাইন প্রায় একটি কথা বলতেন, ‘সরকারের হাত অনেক লম্বা। তারাই একমাত্র স্বাধীন যা খুশি তা করতে পারেন। ’ কথাটি অপ্রিয় হলেও সত্য। জনগণের ভোটে নয়; যে ভাবেই হোক ক্ষমতাসীন দল আবার ক্ষমতায় থাকতে চায়। সে জন্য কলে-কৌশলে ক্ষমতা ধরে রাখতে প্রশাসন সাজায় তারা। মাঠ প্রশাসন, পুলিশ বাহিনী, কিছু বিচারক, নির্বাচন কমিশন সবকিছুই থাকে তাদের নিয়ন্ত্রণে। তাই বলে কি আজীবন টিকে থাকতে পেরেছে?

বাস্তবতা হলো; ইতিহাসের শিক্ষা নিয়ে যদি জনতাকে মাঠে নামানো যায় তাহলে রাজনীতির দৃশ্য হবে অন্যরকম।

১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগের অফিসে বাতি জ্বালানো মতো লোক ছিল না। একমাত্র জেলের বাইরে ছিলেন আমেনা বেগম। কিন্তু মাঠ আওয়ামী লীগের দখলে থাকায় ’৭০ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ঠেকানো যায়নি। এখন যা অবস্থা তাতে পুলিশ, ডিসি-এসপি, আদালতের কিছু দলবাজ বিচারক, নির্বাচন কমিশন মিলে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় না বসালে তাদের কি ক্ষমতাসীনরা ছেড়ে কথা বলবে? ইতিহাস বলে জনতাকে নামাতে পারলে সবকিছু ভেসে যেত।

এখন কথা হলো; জনগণকে সাথে নিয়ে বিএনপি মাঠের রাজনীতি করলো না কেন? নির্বাচন ইস্যুতে ঐক্যফ্রন্ট গঠন করা হলো। সে জন্য বিএনপির নিজস্বতা থাকবে না? সারাদেশে যে দলের লাখ লাখ কর্মী বাহিনী, কোটি সমর্থক সে দলকে ভোটের মাঠে অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াতে হবে? বিএনপির সিনিয়র নেতারা কি এই ব্যর্থতার দায় এড়াতে পারেন?

রাজনীতির মাঠে ‘জোর যার জলা তার’ প্রবাদের মতোই ‘মাঠের দখল যার নির্বাচনের ফলাফল তার’। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টালে আমরা সে চিত্রই দেখি।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনের আগে ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি, পাকিস্তান গণতন্ত্রী দল ও পাকিস্তান খেলাফত পার্টির সঙ্গে মিলে গঠিত হয় যুক্তফ্রন্ট। সেই ফ্রন্ট ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগকে ভোটে ধরাসায়ী করেছিল শুধু মাঠের রাজনীতির জন্যই। ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন একটি ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। ১৯৬৬ সালের ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারী লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর এক সম্মেলনে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ‘৬ দফা দাবি’ পেশ করলেন। ৬ দফার আন্দোলনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রের প্রায় সব পর্যায়ের নেতাকে গ্রেফতার করা হয়।

১৯৬৬ সালের ৭ জুন আমেনা বেগম ও মিজানুর রহমান চৌধুরী ধর্মঘটের ডাক দেন। অতপর মিজানুর রহমান চৌধুরীও গ্রেফতার হন। ওই সময় আমেনা বেগম ছাড়া আওয়ামী লীগের আর কেনো নেতা কারগারের বাইরে ছিলেন না। তারপরেও কিন্তু আন্দোলনের মাঠ ছাড়েনি আওয়ামী লীগ। আন্দোলনের সিঁড়ি বেয়ে ’৬৯ সালের গণঅভ্যূত্থান ও ৭০ সালের নির্বাচন দিতে বাধ্য হয় তৎকালীন পাকিস্তানী স্বৈরশাসক।

ওই সময় আজকের মতো তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার ও যোগাযোগ ছিল না। তারপরও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছিল আওয়ামী লীগ। ‘৭০ এর নির্বাচনের প্রস্তুতি এবং অসহযোগ আন্দোলন একই সঙ্গে চলায় নির্বাচনের ফলাফলে আওয়ামী লীগ ভোটবিপ্লব ঘটায়।

এরপর আসুন, এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের চিত্রের দিকে দেখি? এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের আগে দুই নেত্রী তথা শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়ার আবির্ভাব ঘটে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গণে। শুরু হয় যুগৎপত আন্দোলন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৫ দল, বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ৭ দল। সে আন্দোলনের সঙ্গে যুগৎপত কর্মসূচি পালন করে আব্বাস আলী খানের নেতৃত্বে জামায়াত। তীব্র আন্দোলনের মুখে এরশাদ উপজেলা নির্বাচন পিছিয়ে দিতে বাধ্য হয়। আন্দোলনের এক পর্যায়ে চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানে ঘোষণা দেয়া হয় এরশাদের অধীনে নির্বাচনে যারা যাবেন তারা বেঈমান হবেন।

বেগম জিয়া আপোষহীন ঘোষণা দেয় ‘স্বৈরাচারের অধীনে নির্বাচন নয়’। কিন্তু ১৫ দলীয় জোটে নির্বাচনে যাওয়া না যাওয়া নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। ১৫ দলীয় জোট থেকে রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বে ৭ দল। আওয়ামী লীগের নের্তৃত্বাধীন ৮ দল ও জামায়াত ’৮৬ তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করে।

অথচ বেগম জিয়ার আন্দোলনের মুখেই সে সংসদ ভেঙ্গে দিতে বাধ্য হয় এবং ’৮৮ সালের পুরনায় পাতানো নির্বাচন করা হয়। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে রাজনৈতিক দলগুলো মাঠ ছেড়ে যায়নি। সে সময়ও বহু নেতা বছরের পর বছর গ্রেফতারের ভয়ে ঘরে ঘুমাতে পারেননি। রাজনৈতিক দলগুলোর মাঠের আন্দোলন ছিল বলেই ছাত্ররা গঠন করে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। পরবর্তীতে ২৪টি ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে গড়ে উঠে ‘সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য’। রাজপথে নেতৃত্বের আপোষহীন দৃঢ়তায় ’৯০ এর স্বৈরশাসক এরশাদ ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়। অথচ এরশাদ বিরোধী ওই আন্দোলন রাজধানী ঢাকার বাইরে কিন্তু তেমন ছিল না।

’৯১ সালের নির্বাচনে প্রচারণা ছিল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসছে। কিন্তু সকলকে অবাক করে দিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার মাঠের আপোষহীন নেতৃত্বের সাফল্য আসে বিএনপির ঘরে।

এ সময় ফিলিস্তিনের হেবরন মসজিদে ব্যপক হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় আওয়ামী লীগ সংসদে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে চাইলে বিএনপি সরকারের মন্ত্রী ব্যারিষ্টার নাজমুল হুদার ‘আওয়ামী লীগ হঠাৎ মুসলমান হয়েছে’ বেফাঁস কথা বলায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনে আওয়ামী লীগকে মাঠে ঠেলে দেয়।

ফলে, পঞ্চম জাতীয় সংসদে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের পর জামায়াত হঠাৎ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের একটি বিল সংসদে উত্থাপন করে। কিন্তু সেসময় সেটা তেমন গুরুত্ব পায়নি। ‘৯৪ সালের মাগুরা-২ আসনের আওয়ামী লীগের এমপি মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানের মৃত্যুর পর ওই আসনে উপনির্বাচনে ভোট ডাকাতিই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন গড়ে ওঠে। আওয়ামী লীগ, ৫ দলীয় বাম জোট ও জামায়াত যুগৎপত কর্মসূচি পালন করে।

আন্দোলনের মধ্যেই ’৯৬ সালে বিএনপি ৬ষ্ট জাতীয় সংসদ নির্বাচন করেছে। কিন্তু মাঠ ছাড়েনি আওয়ামী লীগ ও জামায়াত। আন্দোলনের মুখেই ৬ষ্ট জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেই দেড় মাসের মাথায় সংসদ ভেঙ্গে দিতে বাধ্য হয় বিএনপি। আন্দোলনে মাঠের নিয়ন্ত্রণ রাখায় ’৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সাফল্য পায়।

এখানেই কিন্তু খালেদা জিয়া নির্বাচন না দিলে পারতেন। কিন্তু তিনি গণতন্ত্রের সাথে লোভ লালসার আপোষ করেননি।

আবার ওই সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথের আন্দোলনের চিত্র দেখলে কি দেখি? ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর পশ্চিমবঙ্গের বাম জোট সরকারের মতোই প্রশাসনের স্তরে স্তরে নিজেদের লোকজন বসিয়ে দেয়। তারপরও বিএনপির নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ’৯৮ সালে ৭ দলীয় জোট গঠন করে মাঠের আন্দোলন শুরু হয়। সেই ৭ দলীয় জোট ধীরে ধীরে মাঠের আন্দোলন বেগবান করে এবং এক পর্যায়ে ৪ দলীয় জোট গঠন করা হয়। সে আন্দোলনের মধ্যেই ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি বিপুল সাফল্য পায়।

বর্তমানে প্রশাসনযন্ত্র আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে। প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি। তারপরও দলীয়করণ, আত্মীয়করণের মাধ্যমে প্রশাসন এবং আইন শৃংখলা বাহিনীকে আওয়ামী লীগ কুক্ষিগত করেছে। মাঠের জুলুম-নির্যাতনে এখন পুলিশ আর ছাত্রলীগ-যুবলীগের মধ্যে পার্থক্য খুঁজে পাওয়া দুস্কর। এর মধ্যেও যারা সক্রিয় তারা ভোটের মাঠে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। পুলিশের ব্যাপক ধরপাকরের মধ্যেই ফরিদপুরে নির্বাচনী মাঠ দখলে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করে নিক্সন চৌধুরী। এবং সত্যি সত্যি তিনি নির্বচিত। এখানে তিনি নির্বাচনী এলাকায় জনতাকে সঙ্গে নিয়ে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফরুল্লাহকে নাকানিচুবানি খাওয়ায়েছেন এবং প্রশাসন সেখানে জনতার কাছে অসহায় হয়ে পড়তে বাধ্য হয়েছে।

কই? দেখলামনাতো নিক্সন চৌধুরীর মত বিএনপির একজন নেতাও জনতার ঢল মাঠে নিয়ে টিকে থাকতে? ব্যর্থতা তবে কার?

আসলে, রাজনীতি হলো ফুটবল খেলার মতো। মাঠের নিয়ন্ত্রণ রাখতেই হবে। মাঠ ছেড়ে দিলে আপনি ‘নেই’ হয়ে যাবেন। ফুটবল খেলায় যারা সুপার স্টার প্রতিপক্ষ তাদের আটকিয়ে রাখার চেষ্টা করবেই। মাঠে মেসি-রোনাল্ডোদের জন্য প্রতিপক্ষ দল দুই/তিনজন খেলোয়াড়কে ব্যতিব্যস্ত রাখেন। তাদের এই কৌশলের কারণে কী মেসি-রোনাল্ডোরা খেলা ছেড়ে দেন? না কি তারা আরো তীব্র বেগে গোল দেয়ার জন্য মাঠে নিজেদের হাজির করেন।

পাকিস্তান ও ভারতের সম্প্রতি রাজনীতির দিকে তাকালে কি দেখি? কয়েক বছরে পাকিস্তানে অনেক জঙ্গী হামলার ঘটনা ঘটেছে। প্রাণ হারিয়েছে বহু মানুষ। তারপরও রাজনৈতিক নেতারা মাঠ ছাড়েননি। তারা জনগণকে রাস্তায় নামিয়েছেন, মানুষের অধিকার আদায়ের চেষ্টা করেছেন। অথচ আমরাও মাঝে মাঝে পাকিস্তানকে ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ বলে গালি দিয়ে পুলকিত হই। কিন্তু সেই পাকিস্তানে বিচার বিভাগ প্রধানমন্ত্রীকে সরিয়ে দিয়ে দুর্নীতির দায়ে তাকে শাস্তি দিয়েছে। ক্রিকেট খেলোয়াড় ইমরান খান নতুন দল গঠনের ‘মাঠের রাজনীতি’তে সক্রিয় থাকায় নির্বাচনে জিতে প্রধানমন্ত্রী হয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। এখানেই বাস্তবতা!

বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিএনপির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নানাভাবে বিশ্লেষণ হচ্ছে। অনেকে বলতে চাইছেন যে, বিএনপি ‘পথ হারিয়েছে’। কারো কারো বিশ্লেষণে বিএনপির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত বা অন্ধকার। বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থা এলোমেলো বলেও অনেকের অভিমত। বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীল হিসেবে পরিচিত- এমন অনেক বিশ্লেষকও বিএনপির আদর্শচ্যুতির অভিযোগ তুলছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন খালেদা জিয়া করাগারে থাকায় বিএনপি সঠিক নেতৃত্বের মধ্যে নেই। আবার বিএনপির বাঘা বাঘা নেতারা দুষছেন হিম্মৎ হারা নেতা কর্মীদের। ডাকলে তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না বলে।

প্রথমে আদর্শচ্যুতির অভিযোগ নিয়ে আলোচনা করা যাক। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। প্রতিষ্ঠাকালে তার রাজনীতির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল স্বচ্ছ ও সুস্পষ্ট। জাতিকে কোথায় নিতে চান, সে সম্পর্কে তার মধ্যে কোনো ধোঁয়াশা ছিল না। ‘আমার রাজনীতির লক্ষ্য’ নিবন্ধে তার দলে সদ্য যোগ দেয়া সদস্যদের উদ্দেশে বলেছিলেন- ‘এখন আরো শক্ত রাজনীতি করতে হবে। এ ধারায় যারা টিকতে পারবে না, তারা থাকতে পারবে না।’ তিনি বলেন, ‘শুধু জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করে বসে থাকলে চলবে না। এর সদস্য হওয়াই সব কিছু নয়। জাতীয়তাবাদের অনুশীলন করতে হবে, প্র্যাকটিস করতে হবে। তবেই আপনারা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের অনুসারী হতে পারবেন।’

দূরদর্শী ও বিচক্ষণ জিয়াউর রহমান তখনই বুঝেছিলেন, কেবল বিপুল সমর্থক দিয়েই কোনো রাজনীতি সফল হয় না। দলের কোটি কোটি সদস্য থাকলেই প্রতিপক্ষের কূটচাল ও অপরাজনীতি মোকাবেলা করে বিজয় অর্জন করা যায় না। রাজনৈতিক বা আদর্শিক বিশ্বাস নিয়ে ঘরে বসে থাকলেই সাফল্য ধরা দেয় না; বরং সেই আদর্শের রাজনীতি করতে হবে শক্তভাবে। অনুশীলন করতে হবে দৃঢ়প্রত্যয়ে। তবেই না সাফল্য।

আসলে বিএনপি পথ হারিয়েছে না সঠিক পথে আছে তা মূল্যায়নের জন্য দলের প্রতিষ্ঠাতার রাজনৈতিক দর্শন কতটা অনুসৃত হচ্ছে তা পরখ করে দেখা যেতে পারে। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ঐক্য ও সমন্বয়ের রাজনীতি এখনো বিএনপির রাজনীতির মূল কথা। শহীদ জিয়ার সুযোগ্য উত্তরসূরি বিএনপির বর্তমান চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ঐক্যের রাজনীতিকে প্রাধান্য দিয়ে এগোনোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। জিয়াউর রহমানের উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতিকে আরো বেগবান করতে নিরলসভাবে তিনি কাজ করেছেন।

তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেগম জিয়া এখনো জাতীয়তাবাদী রাজনীতির পুরোধা। রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি ঐতিহ্যের ধারক এবং এ দেশের জনগণের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ প্রদর্শক।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি প্রহসনের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে দেশবাসীকে এক কাতারে দাঁড় করানো খালেদা জিয়ার অবিস্মরণীয় সাফল্য। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট শুধু নয়, দেশের নিবন্ধিত বেশির ভাগ দলকে নির্বাচনটি বর্জনে এক করতে পেরেছিলেন তিনি। এ কারণে মাত্র ৫ শতাংশের মতো ভোটারের উপস্থিতিতে কলঙ্কিত নির্বাচনী মহড়া সম্পন্ন করতে হয়েছে। অর্ধশত কেন্দ্রে একটি ভোটও পড়েনি।

এটাকে শহীদ জিয়ার ঐক্যবদ্ধ ও সুসংহত গণচেষ্টার যে নীতি, তারই একটি সাফল্য হিসেবে দেখা যেতে পারে। ভোটারবিহীন নির্বাচনের পরও আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে টিকে যাওয়া কিংবা ভোট বর্জনের ফসল ঘরে তুলতে না পারা আঞ্চলিক আধিপত্যবাদ ও স্বার্থবাদী রাজনীতির আলাদা পাঠ। এটা খালেদা জিয়া বা বিএনপির একক ব্যর্থতা হিসেবে চিত্রিত করলে সুবিচার করা হবে না।

স্বাধীনতা-উত্তর সরকার সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে একদলীয় বাকশাল কায়েম, রক্ষীবাহিনীসহ বিভিন্ন বাহিনী গঠন এবং ভিন্নমত প্রকাশের সব পথ রুদ্ধ করে দেয়ার পর এ দেশে আবার বহুদলীয় গণতন্ত্র, বাক-ব্যক্তির স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে- তখন তা কেউ ভাবেনি। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি এবং ৩ নভেম্বরের প্রতিবিপ্লবের পর বস্তুত ৭ নভেম্বর থেকে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের রাজনীতির সূচনা। সে দিন সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা বীর উত্তম জিয়াউর রহমান সিপাহি-জনতার সমর্থনে ক্ষমতাকেন্দ্রে আবির্ভূত হলেন।

১৯৭৮ সালের ৩ জুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জাতীয় ফ্রন্টের প্রার্থী জেনারেল ওসমানীকে হারিয়ে জিয়াউর রহমান বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন। নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিষিক্ত হওয়ার অব্যবহিত পরই ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।

১৯৮১ সালে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক ও সফল রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমানের শাহাদতবরণের মধ্য দিয়ে শিশু বিএনপির অপমৃত্যু ঘটতে পারত, কিন্তু তা ঘটেনি।

চাপ, প্রলোভন আর কেনাবেচার হাট বসিয়েও বিএনপির অগ্রযাত্রা রোধ করা যায়নি; বরং গৃহবধূ খালেদা জিয়ার আপসহীন নেতৃত্বে ৯ বছরের স্বৈরাচারবিরোধী নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের পথ বেয়ে ১৯৯১ সালে সবচেয়ে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে স্বমহিমায় ক্ষমতায় ফেরে বিএনপি। দেশে যতবার সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে ততবারই জাতীয়তাবাদী রাজনীতির মাথায় বিজয়ের মুকুট উঠেছে। ১৯৯৬ সালের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করতে না পারলেও ১১৬ আসন নিয়ে বসেছিল দেশের ইতিহাসের বৃহত্তম বিরোধী দলের আসনে।

২০০১ সালের অবিস্মরণীয় ভোটবিপ্লবে সংসদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন জয়ের মধ্য দিয়ে আবারো দেশ পরিচালনার দায়িত্ব বর্তায় বেগম জিয়ার ওপর। ওয়ান-ইলেভেনে মইন-ফখরুদ্দীনের জরুরি সরকারের সময়ও প্রধান টার্গেট ছিল দলটি। খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করে, তারেক রহমানের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়ে সংস্কারের নামে বিএনপি ভাঙা এবং ‘খালেদা মাইনাস ফর্মুলা’ বাস্তবায়নের মরিয়া অপচেষ্টা হয়। তখনো দোর্দণ্ড প্রতাপশালীদের প্রচণ্ড চাপের কাছে নতিস্বীকার করেননি গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী বিএনপি। নির্বাসনে পাঠানোর প্রাণপণ চেষ্টাও বিফল হয়ে যায়। দল ভাঙার মিশনও নস্যাৎ হয়ে যায়।

বিপর্যয় কাটিয়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিল এই দল। কিন্তু আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী শক্তির ক্রীড়ানকদের নীলনকশায় ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিরোধী দলের আসনে বসতে হয় দলটিকে। তার পর থেকে ১০ বছর ধরে বিএনপি ধ্বংসের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্ত চলছে বিরামহীনভাবে। মামলা, হামলা, খুন, গুম, নির্যাতন, নিপীড়নের সব সীমা ছাড়িয়েছে। তবুও বিএনপির জনপ্রিয়তা ও খালেদা জিয়ার দৃঢ়চেতা নেতৃত্বকে হুমকিতে ফেলা যায়নি।

সর্বশেষ খালেদা জিয়াকে জেলে নিয়ে বিএনপিকে দুর্বল ও টুকরো টুকরো করার মিশনও মুখ থুবড়ে পড়েছে। উল্লেখ করার মতো একজন নেতাকেও দলচ্যুত করা যায়নি। অসুস্থতা সত্ত্বেও বেগম জিয়ার মনোবল দৃঢ় ও অটুট। আপস নয়, সংগ্রামই তার পছন্দের পথ।

আসলে বিএনপির ভাগ্য এমনই। যে দলের প্রতিষ্ঠাতা ১৯৭৫ সালের ১৬ জুনে এক আদেশে বিলুপ্ত হওয়া শত শত সংবাদপত্রকে পুনর্জীবন দিয়েছিলেন, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও সংবাদপত্র প্রকাশনাকে করেছেন অবারিত, যে দলের চেয়ারপারসন বহু সংবাদপত্রের ডিক্লারেশন ও বেসরকারি টিভির লাইসেন্স দেয়ার মাধ্যমে গণমাধ্যমের বিকাশে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন, সে দল সব সময়ই বেশির ভাগ মিডিয়ার বিরাগভাজন। কী ক্ষমতায়, কী বিরোধী দলে-সব সময়ই মিডিয়ায় সাধারণত নেতিবাচক শিরোনাম হয়ে আসছে বিএনপি।

সব দল ও সংগঠনেই কিছু বর্ণচোরা, সুবিধাবাদী ও স্বার্থান্ধ লোক থাকে। দীর্ঘ এক যুগ ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির হতাশাগ্রস্ত কোনো কোনো নেতার মধ্যে কর্তব্যপরায়ণতা ও নিষ্ঠার কিছু ঘাটতি যে দেখা দেয়নি, তা হলফ করে বলার সুযোগ কম। শহীদ জিয়া ঘোষিত বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে অনুপ্রাণিত ও সংহত ইস্পাতকঠিন ঐক্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে অক্লান্ত প্রয়াসের অভাবও দেখা গেছে সময়ে অসময়ে।

তবুও সময় এখন বসে থাকার নয়। সময় এখন আরও একতাবদ্ধ হয়ে কর্মীদের হতোদ্যম মনোবল ফিরিয়ে খালেদা জিয়ার মুক্তি ও পূনঃনির্বাচনের দাবিতে বাহিরে নয় মানবর্মে রাজধানী অচলের টার্গেট নিয়ে আগামী দিনে আরও সজাগ ও সতর্ক হয়ে আঞ্চলিক আধিপত্যবাদের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নিজেদের স্বক্ষমতায়ন করুক, এটাই দেশপ্রেমিক ও গণতন্ত্রকামী বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশা।