নেতা ও নেতৃত্ব।

হামিদুর রহমান পলাশ | নিজস্ব প্রতিবেদক : মে ১৫, ২০১৮

আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে নেতৃত্বের শূন্যতা ও ব্যর্থতা নিয়ে প্রতিনিয়তই অভিযোগ শোনা যায়। আসলে নেতা কে ? নেতৃত্ব আসলে কী ? নেতৃত্ব মানে কি কর্তৃত্ব প্রয়োগ ? নেতৃত্ব প্রদর্শন আর দাফতরিক ক্ষমতা ব্যবহার কি এক ? নেতা হয়ে কি কেউ জন্মায়? নেতা হলেন সেই ব্যক্তি যিনি এমন কিছু ঘটান যা সাধারণভাবে ঘটার কথা নয়। বস্তুত যা স্বাভাবিকভাবে ঘটবে, তার জন্য নেতার প্রয়োজন হয় না_ যে কোনো ব্যক্তিই তা করতে পারেন। সত্যিকারের নেতা অনন্য, অসাধারণ, অতুলনীয়, অভাবনীয় কিছু সৃষ্টি করেন। নেতা বড় কাজ করেন। অর্থাৎ ‘ইনক্রিমেন্টাল চেঞ্জে’র বা ক্ষুদ্র পরিবর্তনের জন্য নয়, বড় কিছুর জন্য নেতৃত্বের প্রয়োজন পড়ে। তাই নেতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ‘আনরিজনেবলনেস’ বা দুঃসাহসিকতা।

বাস্তববাদিতা নেতার গুণাবলির অংশ নয়, যদিও নেতা বাস্তবকে উপেক্ষা করেন না। নেতা বরং নতুন বাস্তবতা সৃষ্টি করেন। নেতা সাধারণত অসম্ভবকে সম্ভব করেন। জর্জ বার্নার্ড শ’ বলেছেন, ‘রিজনেবল’ বা বাস্তববাদী মানুষেরা পৃথিবীর সঙ্গে নিজেদের খাপখাইয়ে নেন, দুঃসাহসী মানুষ পৃথিবীকে পরিবর্তন করেন আর পৃথিবীর সব অগ্রগতিই দুঃসাহসী মানুষের ওপর নির্ভর করে। তাই সত্যিকারের নেতা শুধু সাহসীই নন, তিনি দুঃসাহসীও। বস্তুত পৃথিবীর ইতিহাস অনেক দুঃসাহসী মানুষেরই ইতিহাস, যারা বাক্সবন্দি বা প্রথাগত চিন্তার বাইরে আসতে পেরেছেন। সব সমস্যাকে ভিন্নভাবে বা নতুন করে দেখতে পেরেছেন। আর দুঃসাহসিকতাই নেতাকে অসাধারণ করে।নেতা হয়ে কেউ জন্মান না। নেতৃত্ব উত্তরাধিকারের বিষয় নয়।

নেতৃত্ব জোর করেও অর্জন করা যায় না। নেতৃত্ব ‘অথরিটি’ বা কর্তৃত্বের বিষয় নয়। হুকুম দেওয়ার ক্ষমতা আর নেতৃত্ব এক কথা নয়।নেতৃত্ব হল এমন এক সামাজিক প্রভাবের প্রক্রিয়া যার সাহায্যে মানুষ কোনও একটি সর্বজনীন কাজ সম্পন্ন করার জন্য অন্যান্য মানুষের সহায়তা ও সমর্থন লাভ করতে পারে। জিনতত্ত্ববিদের এলান কিথ মতে, "নেতৃত্ব হল মানুষের জন্য একটি পথ খুলে দেওয়া যাতে তারা কোনও অসাধারণ ঘটনা ঘটানোর ক্ষেত্রে নিজেদের অবদান রাখতে পারে।" কেন অগবন্নিয়ার কথায় "প্রাতিষ্ঠানিক বা সামাজিক লক্ষে পৌঁছনোর জন্য অন্তর্বর্তী ও বাহ্যিক পরিবেশে প্রাপ্ত সম্পদকে সফলভাবে সমন্বয় সাধন করাও তা থেকে সর্বাধিক লাভ তোলার ক্ষমতাই হল কার্যকরী নেতৃত্ব।" কার্যকর নেতার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে অগবন্নিয়া বলেন "যে কোনও পরিস্থিতিতে যে ব্যক্তি ধারাবাহিকভাবে সফল হওয়ার ক্ষমতা রাখেন এবং কোনও সংস্থা বা সমাজের প্রত্যাশা পূরণকারী হিসেবে স্বীকৃতি পান", তিনিই কার্যকর নেতা। কিন্তু নেতৃত্বের সঠিক সংজ্ঞা দেওয়া বেশ কঠিন।

লিঙ্কন ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক এন মেরি ই. ম্যাকসোয়েনের মতে, "নেতৃত্ব আসলে ক্ষমতা: নেতাদের শোনার ও পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতা, সব স্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আলোচনা শুরু করায় উৎসাহদানের জন্য নিজেদের দক্ষতাকে কাজে লাগানোর ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সঠিক প্রক্রিয়া ও স্বচ্ছতাকে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষমতা, জোর করে চাপিয়ে না দিয়ে নিজেদের মূল্যবোধ ও দূরদর্শিতাকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করার ক্ষমতা। নেতৃত্ব মানে শুধুই সভায় আলোচ্য বিষয়সূচির প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখানো নয়, নিজে সেই কর্মসূচি স্থির করা, সমস্যা চিহ্নিত করা এবং শুধুই পরিবর্তনের সঙ্গে সামাল দিয়ে না চলে নিজেই এমন পরিবর্তনের সূচনা করা যা উল্লেখযোগ্য উন্নতির পথ প্রশস্ত করে।"- সান জু বলেন, নেতৃত্ব হল বুদ্ধিমত্তা, বিশ্বাসযোগ্যতা, মানবিকতা, সাহস, ও শৃঙ্খলাবোধের বিষয়। শুধু বুদ্ধিমত্তার উপর ভরসা করলে বিদ্রোহী মনোভাব দেখা দিতে পারে। শুধু মানবিকতার ব্যবহার দুর্বলতার জন্ম দেয়। অবিচল বিশ্বাস থেকে দেখা দেয় মূর্খতা।

সাহসের শক্তির উপর নির্ভরতা রূপ নিতে পারে হিংসার। অতিরিক্ত শৃঙ্খলাবোধ এবং কঠোরতা থেকে জন্ম নিতে পারে নিষ্ঠুরতা। যখন এই পাঁচটি গুণ একত্রিত হয়, প্রতিটি গুণ নিজের কাজের প্রতি যথাযথ হয়, তখনই একজন মানুষ নেতা হয়ে উঠতে পারেন।নেতা অন্যের আত্মশক্তি বিকাশের এবং তা কাজে লাগানোর প্রচেষ্টায় নিবেদিত। কারণ আত্মশক্তি হলো প্রত্যেকের নিজের ভেতরকার ধন বা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ পুঁজি, যার বিকাশ ঘটলে আর্থিক পুঁজির অভাব সহজেই মেটানো সম্ভব। সৃজনশীলতা, ইচ্ছাশক্তি, আত্মবিশ্বাস ইত্যাদি যার অন্যতম উপাদান। আত্মশক্তিতে বলীয়ান ব্যক্তি অদম্য ও অপ্রতিরোধ্য। তাই আত্মশক্তিতে বলীয়ান ব্যক্তিরাই নেতৃত্ব প্রদানে সক্ষম। অর্থাৎ নেতা মানুষের শ্রেষ্ঠ গুণাবলি বা অন্তর্নিহিত ক্ষমতা বিকাশের পথ উন্মুক্ত করেন।

নেতা হয়ে যেমন কেউ জন্মান না, তেমনিভাবে নেতা আকাশ থেকেও পড়েন না। নেতা নিজে হয়ে ওঠেন। নিজেকে রূপান্তরের মাধ্যমে। নিজের রূপান্তর ঘটাতে পারলেই নেতা অন্যের রূপান্তর ঘটাতে সক্ষম হন। নেতা সত্যিকারার্থেই পরিবর্তনের রূপকার। তবে সেটা যেন ক্ষুদ্র স্বার্থজনিত কোন পরিবর্তন না হয়।বৃহত্তর পরিবর্তনের স্বার্থেই যেন নেতার নেতৃত্ব বিকশিত হয়।Leader বা Responsible person শব্দটির বাংলা হচ্ছে নেতা, পরিচালক, দায়িত্বশীল। আরবিতে বলা হয় খলিফা, ইমাম বা আমির। নেতৃত্ব ছাড়া কোনো জাতি, দেশ এমনকি কোনো সংগঠনও চলতে পারে না। জাতির উত্থান পতন অনেকাংশে নির্ভর করে নেতৃত্বের ওপর।নেতৃত্বকে কোন একটি বাক্যে সংজ্ঞায়িত করা খুব কঠিন। বিভিন্ন ব্যক্তি বিভিন্নভাবে নেতৃত্বকে সংজ্ঞায়িত করেছেন।

অধ্যাপক ওয়ারেন বেনিস বলেছেন, নেতৃত্ব হচ্ছে নিজেকে জানা, দক্ষ যোগাযোগ, পারস্পরিক আস্থা ও প্রয়োজনীয় কাজের মাধ্যমে সহযোগীদের কাছে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা।’ পরিস্থিতি জয় করার সামর্থ্যকেই নেতৃত্ব বলে। বলা হয় তিনিই নেতা যিনি পথ জানেন, অনুসরণ করেন ও দেখান। সমাজের সকল অধিবাসীর চোখগুলোর সমন্বয় নেতার দু’চোখ । মনে করতে হবে নেতা যখন ঘুমায় পুরো সমাজও ঘুমায়। নেতা যখন নিথর-নিস্তব্ধ, সমাজও নিথর-নিস্তব্ধ। নেতা যখন কোনো কিছু দেখেও না দেখার ভান করে, সমাজও তখন অন্ধত্ব ধারণ করে। নেতা যখন ভালো মন্দ পার্থক্য করার শক্তি হারিয়ে ফেলে, সমাজেও বধিরের সংখ্যা বেড়ে যায়। নেতা যখন আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে, জনসাধারণ তাকে অনুসরণ করতে শুরু করে।

যোগ্য নেতৃত্ব তার অধিবাসীদেরকে যেমনি দিয়েছে আনন্দ, তেমনি সৃষ্টি করেছে কর্ম। যে কর্মের মধ্য দিয়েই কর্মীরা খুঁজে পেয়েছে তাদের কাজ, দায়িত্ব ও কর্তব্য। নেতার অন্যতম দায়িত্ব নিজে যেভাবে কর্ম সম্পাদন করবেন, কর্মীবাহিনীর মাঝেও কর্ম বন্টন করে দিবেন। নচেৎ তার ব্যতিক্রম ঘটবে। একটি প্রবাদ বাক্য আছে “বেকারের মাথা শয়তানের দোকান”। কর্মী বাহিনী কাজের অভাবে হবে সমালোচনামুখর, নিস্তব্ধ ও অযোগ্য। সময়ের ব্যবধানে হয়ত কর্মীবাহিনী খুঁজে পাওয়াও দুরূহ হবে। এক সময়ে দেখা যাবে নেতা-নেতৃত্ব, সাম্রাজ্য ও জনসাধারণ হয়ত খুঁজে পাওয়া যাবে, কিন্তু সবকিছু মরীচিকা ও উইপোকা খেয়ে ফেলেছে।নেতার নেতৃত্ব যেমনি পুরো সমাজ পরিবর্তন করে দিতে পারে, তেমনি জাহাজের পাটাতন কাত হয়ে ডুবে যাওয়ার মতো সমাজটাকেও ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাতে পারে।

পৃথিবী সৃষ্টির শুরু থেকে অদ্যাবধি যতো মহানায়ক নেতৃত্ব দিয়েছেন, হয়তো তাদের অধীনে পরিচয় দেয়ার মতো লোকও খুঁজে পাওয়া যায়নি। কিন্তু নেতৃত্বের বলিষ্ঠতায় অধীন ও কর্মীবাহিনীর মাঝে কর্ম সম্পাদনে ব্যাপক আগ্রহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। যা সমাজকে সফলতার চূড়ান্ত পর্যায়ে রূপ দিতে সহায়ক হয়েছে।নেতার এক পা অগ্রসর হলে কর্মী বাহিনীর দুই পা অগ্রসর হয়। নেতার এক মিনিটের কাজ, কর্মী বাহিনীর শত মিনিটের কাজ। নেতা যদি সকল কর্মীকে কাজে লাগাতে পারেন, যে কাজ তিনি এক ঘন্টায় সম্পাদন করতেন, সেটি সম্পন্ন হবে এক মিনিটে। সেজন্য নেতাকে কাজ করা থেকে কাজ বের করার চিন্তাই বেশি করতে হয়। নেতা যদি চিন্তাহীন ও অকর্মণ্য হন, তাহলে পুরো সাম্রাজ্যই গতিহীন হয়ে পড়ে। তা্ই নেতাকে হতে হয় প্রজ্ঞাবান। নেতৃত্বের অবহেলা ও অসচেতনার অভাবে সৃষ্ট বিপর্যয়ের ভুক্তভোগী শুধুমাত্র নেতাই হননা, বরং রাষ্ট্রের সকল জনসাধারণই হয়।

তথ্য:

বিভাগ:

প্রকাশ: মে ১৫, ২০১৮

প্রতিবেদক: হামিদুর রহমান পলাশ

পড়েছেন: 554 জন

মন্তব্য: 0 টি