নিষেধাজ্ঞা কাগজে-কলমে

দিনের বেলায় চলছে ট্রাক-কাভার্ডভ্যান। মোড়ে মোড়ে চাঁদা দিলেই মিলে অবাধ যাতায়াতের লাইসেন্স

Img

চট্টগ্রাম নগরীতে যানজট নিরসনে সিএমপির নেওয়া উদ্যোগ ভেস্তে যাচ্ছে মাঠ পর্যায়ের ট্রাফিক সদস্যদের কারণেই। আর সুযোগটা নিচ্ছে পরিবহন চালক মালিকরা। ‘নিষেধাজ্ঞা অমান্য’ করেই দিনের বেলা চলছে ট্রাক-কাভার্ডভ্যান-ট্রাংক লরি। এর ফলে যানজটের কবলে পড়ে নরক যন্ত্রণা ভোগ করতে হচ্ছে নগরবাসীকে।

সিএমপির ট্রাফিক বিভাগের বিধি অনুযায়ী, ট্রাফিক উত্তর বিভাগের আওতাধীন এলাকায় চট্টগ্রাম বন্দর কেন্দ্রিক প্রধান সড়কসহ আন্ত:জেলা যোগাযোগের সড়ক ব্যতীত নগরীর বালুছড়া, বিআরটিএ থেকে অক্সিজেনমুখী, অক্সিজেন মোড় থেকে ষোলশহর ২ নং গেটমুখী, কাপ্তাই রাস্তার মাথা থেকে বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল মুখী, আটমার্সিং থেকে স্টেশন রোড মুখী, কদমতলী (নিচের অংশ) থেকে আটমার্সিং মুখী, কর্ণফুলী নতুন ব্রিজ থেকে বাকলিয়া ও কোতোয়ালী থানা মোড় মুখী, মাঝিরঘাট রোড থেকে নিউমার্কেট মুখী, নেওয়াজ হোটেল থেকে সিটি কলেজ মুখী সড়কের অভ্যন্তরে প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, রং ভ্যাহিক্যাল, প্রাইম মুভারসহ অন্যান্য পণ্য/ মালবাহী যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে। এসব ট্রাক-কাভার্ড ভ্যানের মধ্যে কিছু কিছু বিজিএমইএ’র ‘বিশেষ টোকেন’ নিয়ে নগরে প্রবেশ করে বলে জানা গেছে।

ব্যবসায়ী বিভিন্ন সংগঠনের নেতাদের অনুরোধে সিএমপি ‘বিশেষ টোকেন’ থাকা যানবাহনগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় না। এ সুযোগে অন্যান্য ট্রাক-কাভার্ড ভ্যানও নগরে প্রবেশ করে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন জেলা থেকে পণ্য নিয়ে নগরে প্রবেশ করে এসব ট্রাক। ট্রাকের পাশাপাশি কাভার্ড ভ্যানেও পণ্য পরিবহন করা হয়।

এমনিতেই চট্টগ্রাম বন্দরে বিভিন্ন রফতানি পণ্য আনা নেওয়ার কাজে ব্যবহৃত ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও লরির অতিরিক্ত চাপে অনেকটা ‘নিরুপায়’ সিএমপির ট্রাফিক বিভাগের সদস্যরা। নতুন একটি ট্রাক রাস্তায় নেমেই নিয়ম ভেঙে। আর চলাচলের ক্ষেত্রে নিয়ম মানার কোন বালাই থাকে না। এরপর যতদিন ট্রাকটি রাস্তায় চলাচল করে এর মাশুল গুণে যেতে হয়।

নিয়ম অনুযায়ী একটি ট্রাকের বডির যা সাইজ হওয়া উচিত বেশিরভাগ ট্রাকই সে নিয়ম মেনে তৈরি করা হয় না। প্রতিটি বডি বেশি পণ্য নেয়ার জন্য তার বডি বড় করে তৈরি করে। দুই ট্রাকের মাল যায় এক ট্রাকে। এই যে ট্রাক মালিকের ইচ্ছায় একটি ট্রাক নিয়ম ভেঙে রাস্তায় নামলো এরপর থেকে এই নিয়ম ভাঙার মিছিলে যোগ দেয় ট্রাক ড্রাইভার, হেলপার। তারপর তা আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে জিম্মি হয়ে পড়ে। মাসোহারা বা দৈনিক টাকা দেয়া তখন নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়।

একেকটি ট্রাক সরকার নির্ধারিত সাইজের বাইরে তৈরি করা হয়। পাঁচ টনের একটি ট্রাকের অনুমোদিত বডি সাইজ হয় লম্বায় ১৪.৬ ফুট এবং চওড়ায় ৭.৮ ফুট। এই ট্রাকের বডি সাধারণত ১৮ ফুট করা হয় আর যেসব ট্রাক গরু পরিবহনে ব্যবহার করা হয় সেসব কোন কোনটি লম্বায় ২৪ থেকে ২৫ ফুট হয়। এছাড়া পাঁচ টনের একটি ট্রাকে যেখানে ১২ টনের বেশি মাল তোলা ঠিক না সেখানে ২২ টন থেকে ২৫ টন মাল তোলা হয়। শুধু তাই নয় রড, বাঁশসহ ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যগুলো খোলা রাস্তায় পরিবহন করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, দিনের বেলা ট্রাক, কাভার্ডভ্যানসহ পণ্যবাহী ভারি যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা না মানার প্রধান কারণ, চালকরা চাঁদা দিয়েই চলাচল করে। নগরীতে চলাচল করা গাড়ি থেকে সবচেয়ে বেশি চাঁদা তোলা হয়। মোড়ে মোড়ে চাঁদা দিলেই মিলে অবাধ যাতায়াতের লাইসেন্স। বেশিরভাগ গাড়ির কোনো ধরনের কাগজপত্র ঠিক থাকে না। এমনকি অনেক চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স পর্যন্ত নেই। কারও কারও আবার লাইন্সেসের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় মামলার ভয়ে বেশিরভাগ চালকই ট্রাফিক পুলিশকে চাঁদা দিচ্ছেন।

গত ২৩, ২৪ ও ২৫ জুন নগরীর জিইসি মোড়, বারিক বিল্ডিং, সিটি গেট, নয়াবাজার, সিমেন্ট ক্রসিং, নতুন ব্রিজ এলাকা ঘুরে অভিন্ন দৃশ্য চোখে পড়েছে। ট্রাফিক পুলিশের হয়ে চাঁদা তুলছেন সাদা পোশাকের কিছু মানুষ যাদের ‘টেন্ডল’ নামে চেনেন চালকরা। অনুসন্ধানে নেমে এ ধরনের বেশ কয়েকজন টেন্ডলের নাম পাওয়া গেছে। তারা বিভিন্ন এলাকায় ট্রাফিক পুলিশের সদস্যদের পাশাপাশি অবস্থান নিয়ে সক্রিয় থাকেন। এর মধ্যে রয়েছেন ২ নম্বর গেটে রহিম ও কামাল, অলঙ্কার মোড়ে জসিম ও আমীর, সিটি গেটে আনোয়ার, নয়াবাজারে সোহেল, সিমেন্ট ক্রসিংয়ে আফসার ও আকতার, বারিক বিল্ডিংয়ে শাহেদ ও সাহাবুদ্দিন, নতুন ব্রিজে রফিক ও হৃদয়, চাক্তাই চাসড়ার গুদাম এলাকায় সুমন ওরফে লম্বা সুমন, সল্টগোলা ক্রসিংয়ে জহির ও জাবেদ, জিইসি মোড়ে দুলাল ও পুলিশের ভাগ্নে নামে পরিচিত এক যুবক।

তবে দিনের বেলা নিয়ম ভঙ্গ করে কিছু ট্রাক কাভার্ড ভ্যান চলাচলের বিষয়টি স্বীকার করলেও চাঁদাবাজির বিষয়টি অস্বীকার করেন সিএমপির উপ পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক-উত্তর) হারুণ অর রশীদ হাযারী।

তিনি বলেন, দিনের বেলায় বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বন্দর, এবং আমিন জুট মিলের ট্রাক কাভার্ড ভ্যান স্টিকার দিয়ে নগরীতে ঢুকে। এর ফাঁক ফোকড় দিয়ে কয়েকটা ট্রাক কাভার্ড ভ্যান এমনিই ঢুকে পড়ে -বিষয়টি অস্বীকার করবো না। আর সার্জেন্টকে টাকা দিয়ে ট্রাক কাভার্ড ভ্যান চলার যে অভিযোগ করছেন, এ ধরনের অভিযোগের প্রমাণ নেই। প্রমাণ পেলে অবশ্যই আমরা ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। আমি মাঠে কাজ করা মানুষ। তবুও, আমি এ ব্যাপারে আগামীতে সতর্ক থাকবো।

প্রতিক্রিয়া মন্তব্য শেয়ার