নারী ও দেশের জন্য গার্মেন্টসকে টিকিয়ে রাখতে হবে

Img

১৯৬৩ সালে পুরোনো ঢাকার উর্দূ রোডে রিয়াজ ষ্টোর নামে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশের প্রথম গার্মেন্টস। ১৯৬৫ সালে রিয়াজ ষ্টোর এর মালিক জনাব রিয়াজ উদ্দিন করাচি ভ্রমণকালে একটি গার্মেন্টসকে মাসে ১লক্ষ পিস পোশাক রপ্তাপি করতে দেখেন। ভখন থেকেই প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার বিদেশে পোষাক রপ্তানীর স্বপ্ন দেখতে থাকেন। শুরুতে তাঁরা শুধু দেশের চাহিদাই পুরণ করত। ইংরেজি ১৯৬৭ সালে রিয়াজ গার্মেন্টস এর উৎপাদিত ১০,০০০ পিস শার্ট বাংলাদেশ হতে সর্বপ্রথম বিদেশে (ইংল্যান্ডে) রপ্তানি করা হয়। ১৯৭৩ সালে রিয়াজ ষ্টোর এর নাম পরিবর্তন করে রিয়াজ গার্মেন্টস রাখেন এবং বিদেশে পোষাক রপ্তানীর জন্য কাজ শুরু করেন। অবশেষে আসে সেই স্বপ্ন পূরণের দিন। ১৯৭৮ সালের ২৫ জুলাই টিসিবির সহায়তায় বাংলাদেশ থেকে সর্বপ্রথম ৪ লক্ষ টাকা মূল্যের পুরুষদের শার্ট রপ্তানী করা হয় ফ্রান্সে। কারো কারো মতে বাংলাদেশের প্রথম গার্মেন্টস হলো দেশ গার্মেন্টস। 

গার্মেন্টসে মেয়েদের কাজের জন্য  রিয়াজ গার্মেন্টস এর মালিক জনাব রিয়াজ উদ্দিন সর্বপ্রথম নিজের মেয়েকেই রিয়াজ গার্মেন্টেসে পোশাক তৈরির কাজে লাগিয়ে দেন। তাঁর মেয়েকে দেখে আরও কিছু নারী এই পেশায় আসতে আগ্রহী হন এবং আস্তে আস্তে এই সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। আর বর্তমানে পোশাকে শিল্পে নারী শ্রমিকের সংখ্যাতো একটি ইতিহাস। বর্তমানে শ্রমিক সংখ্যা প্রায় ৪৫ লাখ। আছে তন্মধ্যে নারী শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৬০ শতাংশ। নারীর ক্ষমতায়নে এ খাত গুরত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখছে। অধিকাংশ শ্রমজীবী নারী এখন বিয়ে এবং সন্তান ধারণের ক্ষেত্রে নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী সিদ্ধান্তের কথা বলতে পারে। তারা পরিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও অংশ গ্রহণ করতে পারছে। সমাজে বাল্যবিবাহের সংখ্যা কমেছে, সেই সাথে হ্রাস পেয়েছে জন্মহার। শ্রমজীবী মেয়েরা তাদের ছোট ছোট ভাইবোনদের যত্ন নিচ্ছে এবং স্কুলে পাঠাচ্ছে। ফলে দেশে সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, তৈরি পোশাক শিল্পখাতের সম্প্রসারণ নতুন উদ্যোক্তাদল সৃষ্টি করছে যারা উৎপাদনের ক্ষেত্রে শক্তিশালী বেসরকারি খাত গড়ে তুলেছে। এই উদ্যোক্তাদের একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী। বাংলাদেশের অন্যতম পুরনো রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা ‘বৈশাখী’ ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন একজন নারী। বর্তমানে তৈরি পোশাক কারখানায় অনেক নারী ঊর্ধ্বতন নির্বাহী পদে অধিষ্ঠিত।

এখানে স্কিল এবং নন স্কিলের অনেক পেশার কাজের সংস্থান হয়।তৈরী পোশাক শিল্পের কল্যাণে বিভিন্ন সহায়ক সেবা খাত যেমন ব্যাংক, বীমা, আইটি, পরিবহন, পর্যটন  এরুপ অনেক খাত গড়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ তৈরি পোশাক খাত হতে অর্জিত হয়।  ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ খাতে মোট রপ্তানি আয় হয়েছে ৩৪.১৩বিলিয়ন মার্কিন ডলার যা বিগত অর্থবছরের তুলনায় ১১.৪৯% বেশি। তন্মধ্যে ওভেন গার্মেন্টস থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে ১৭.২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার যা বিগত অর্থবছরের রপ্তানি আয়ের তুলনায় ১১.৭৯% বেশি এবং নীট গার্মেন্টস থেকে আয় হয়েছে ১৬.৮৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার যা বিগত অর্থ বছরের রপ্তানি আয়ের ১১.১৯% বেশি। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুল চাবীকাঠির অন্যতম একটি হচ্ছে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প। করোনা ভাইরাসে ধ্বস নেমেছে পোশাক শিল্প। এর সরাসরি এর শিকার হবে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। এমনকি গত দুই দশকে দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসা অনেক পরিবার আবার আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারে। স্বল্প পুঁজির অনেক প্রতিষ্ঠান পুঁজি হারাবে, অনেক মিল-ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে যাবে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে রপ্তানিমুখী তৈরি পোষাক শিল্প। এতে গার্মেন্টস শ্রমিক ও স্বল্প বেতনের চাকুরিজীবীসহ দেশের অধিকাংশ মানুষ কর্মহীন হয়ে যেতে পারে। 

বাংলাদেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে গত ২০১৯ সালের অক্টোবরে বিশ্বব্যাংক একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৫৪ শতাংশই দরিদ্র হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। বিশ্বব্যাংক ব্যক্তিগত আয়ের ভিত্তিতে দারিদ্র্য পরিমাপ করে। দৈনিক ১ ডলার ৯০ সেন্টের কম আয় করলে ওই ব্যক্তিকে গরিব হিসেবে ধরা হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, ২০১৯ সাল শেষে বাংলাদেশের জাতীয় দারিদ্র্যের হার ছিল সাড়ে ২০ শতাংশ। অতিদারিদ্র্যের হার সাড়ে ১০ শতাংশ। দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৫৬ লাখ। সেই হিসাবে দেশে ৩ কোটি ৪০ লাখ গরিব মানুষ আছে। তাদের মধ্যে পৌনে দুই কোটি মানুষ হতদরিদ্র। করোনাভাইরাসে আক্রমণে এই দারিদ্রতার ঝুঁকি আরো বেড়ে যাবে। 

৪ এপ্রিল ২০২০ সাধারণ ছুটির মধ্যেও গার্মেন্টস ও কারখানা খোলার ফলে ঢাকামুখী পোষাকশ্রমিকদের ঢল চোখে পড়ার মত। এ ধরণের ঘটনা যেন আর না ঘটে তা গভীরভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে। বেতনের দাবিতে শ্রমিকদের আন্দোলন করতে যেন আর রাজপথে নামতে না হয়, তাও খেয়াল রাখতে হবে। রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহের শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন/ভাতা পরিশোধ করার জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার একটি আপদকালীন প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়া হয়েছে, তা যথাযথভাবে ব্যবহার করে শ্রমিকদের কল্যানে কাজ করতে হবে। এই পোশাক শ্রমিক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। বৈদেশিক মুদ্রাও সচল হবে।  লকডাউনের মধ্যেও সীমিত পরিসরে আস্তে আস্তে বিভিন্ন জরুরী কারখানা খোলা রাখার সিদ্ধান্তে যেন করোনা ছড়িয়ে না পড়ে, তা সবাইকে সচেতনতার সাথে লক্ষ্য রাখতে হবে। অবশ্য কর্মস্থলে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতের পাশিপাশি শ্রমিকদের জন্য সুরক্ষা সামগ্রী প্রদান, প্রবেশ পথে সাবান-পানি দিয়ে হাত ধৌত করার ও নির্ধারিত পরিবহণে যাতায়াতের ব্যবস্থা করতে হবে।

প্রতিক্রিয়া (৪৭) মন্তব্য (০) শেয়ার (৮)