নলছিটিতে বেপরোয়া কিশোর গ্যাং

Img

নানা ধরনের অপরাধে জড়িয়ে ঝালকাঠির নলছিটিতে বেপরোয়া হয়ে উঠছে কিশোর গ্যাং। একে অপরের ক্ষমতা দেখাতে কয়েকজন মিলে পাড়া-মহল্লায় বিভিন্ন নামে গ্যাং গ্রুপ গড়ে তুলছে। আধিপত্য বিস্তার, সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব, মাদক ও প্রেম নিয়ে বিরোধের জেরে তারা অহরহ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। অর্থের বিনিময়ে অর্থদাতার প্রতিপক্ষের ওপরও আক্রমণ চালাচ্ছে উঠতি বয়সী ছেলেরা। তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে নলছিটিবাসী।

সাম্প্রতিক সংঘর্ষের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চায়ের দোকান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনের সড়ক, বিভিন্ন অলি-গলি, হোটেল-রেস্তোরাগুলোতে কিশোর গ্যাংয়ের একাধিক দলের সদস্য অবস্থান গ্রহণ করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিয়ে থাকে এবং দল বেধে মোটরবাইক নিয়ে ঘোরাঘুরি করে। চায়ের দোকানগুলোয় সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি আড্ডায় মেতে থাকে। আর স্কুল-কলেজের ছুটির সময়ও এদের উৎপাতে অস্থির হয়ে ওঠেন সেখানে আগত অভিভাবকরা। ১১-১২ থেকে ১৬-১৭ বছরের দলবদ্ধ ওই কিশোরদের চাহনিতে আছে রুক্ষতা, নেই নম্রতা-ভদ্রতার ছাপ।রাস্তাঘাটের নিরিবিলি পরিবেশকে মুহূর্তেই অশান্ত করে তোলে তারা। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করে স্থানীয় ‘বড় ভাইরা'। ‘হিরোইজম’ প্রকাশ করতে পাড়া-মহল্লায় কিশোর গ্যাং গড়ে উঠছে। 

করোনার সংক্রমণ নিম্নমুখী হওয়ায় দেড় বছর পর ১২ সেপ্টেম্বর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া হয়। ফুটবল খেলা নিয়ে বিরোধের জের ধরে ওইদিন দুপুরে বাসস্ট্যান্ড এলাকায় দুই কিশোর গ্যাংয়ের সংঘর্ষে দুইজন কিশোর গুরুতর আহত হয়। এ ঘটনার পর ওইদিন সন্ধ্যায় চায়না মাঠ এলাকায় ফের ওই দুই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। তাদের সংঘর্ষ ঠেকাতে গিয়ে স্থানীয় বেশ কয়েকজন ব্যক্তি আহত হয়। সংঘর্ষের সময় কিশোরদের লাঠি, লোহার রড, স্টিলের পাইপ ও দা দেখা গেছে। পরবর্তীতে ওইদিন রাতে সংঘর্ষে জড়িত কিশোরদের অভিভাবক (মা-বাবা) ডেকে পুলিশের পক্ষ থেকে সতর্কতার বার্তা দেয়া হয়। এমন ঘটনার সঙ্গে ভবিষ্যতে তাদের সন্তানরা জড়িত হবে না বলে এলাকার জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের সামনে মুচলেকা দেয় অভিভাবকরা। নলছিটি থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. সাব্বির বিষয়টি সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেছেন। 

এর কিছুদিন আগে (৫ সেপ্টেম্বর) আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে উপজেলার মধ্যনাঙ্গুলী এলাকায় তিনজন স্কুলছাত্রের পথরোধ করে তাদের ওপর হামলার চেষ্টা চালায় কিশোর গ্যাং জেটি বাহিনী। ওই সময় স্থানীয়দের ধাওয়া খেয়ে পালিয়ে যায় তারা। 

সবশেষ সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে উপজেলার দপদপিয়া ইউনিয়নের ভরতকাঠি এলাকায় স্থানীয় একটি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের দ্বারা লাঞ্ছিত হয়েছেন মাসুদ আহম্মেদ নামে একজন এনজিওকর্মী। বরিশাল নগরীতে কর্মরত ওই এনজিওকর্মী আত্মীয় বাড়ি থেকে ফেরাত পথে লাঞ্ছিত হন। 

জানা গেছে, প্রেম নিয়ে বিরোধের জের ধরে গত ২০১৮ সালের ২১ নভেম্বর সরকারি নলছিটি ডিগ্রি কলেজের ছাত্র রাকিব হোসেনকে ক্রিকেট খেলার স্ট্যাম্প ও ব্যাট দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে প্রতিপক্ষ কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। নিহত রাকিব উপজেলার নান্দিকাঠি গ্রামের মাসুম হোসেনের ছেলে। ওই সময় সে কলেজের একাদশ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত ছিলেন। হত্যাকাণ্ডের একদিন পর নিহতের বাবা রিকশা চালক মাসুম হোসেন বাদী হয়ে নলছিটি থানায় হত্যা একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় নিহতের সহপাঠীসহ ৮ জনের নামোল্লেখ করে ১৩ জনকে আসামি করা হয়।  প্রশাসনের তৎপরতায় ঘটনার পরপরই কয়েকজন আসামিকে গ্রেপ্তার  হলে কিশোর গ্যাংদের মাঝে আতংক সৃষ্টি হয়। এ ঘটনার পর উপজেলা জুড়ে সক্রিয়তা অনেকটা কমলেও সাম্প্রতিক সময়ে আবারও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা।

বর্তমানে উপজেলার নান্দিকাঠি, মালিপুর, মল্লিকপুর, পুরান বাজার, বাসস্ট্যান্ড, দপদপিয়া, মোল্লারহাট, রানাপাশা, ভারানি, নাঙ্গুলি, বৈচুন্ডি, তৌকাঠিসহ কয়েকটি এলাকায় এসব কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা দাপট দেখাচ্ছে। পাওয়ার বয়েজ, ডিসকো বয়েস, বিগ বস, জেটি, ক্যাকরা, ফিফটিন গ্যাং, ক্যাসল বয়েজ ইত্যাদি নামে কয়েকটি গ্যাংয়ের নাম উপজেলা জুরে জোরেশোরেই শোনা যাচ্ছে। এসব কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা ছিনতাই, চাঁদাবাজি, শ্লীলতাহানি, ইভটিজিং ও মাদক ব্যবসার মতো অপরাধে বেশি জড়িয়ে পড়ছে। সেবন করছে দামি সিগারেট, গাঁজা, ইয়াবার মতো মাদক। যখন-তখন যার-তার সঙ্গে মারামারিতে লিপ্ত হচ্ছে তারা। এছাড়াও মোবাইলফোন তথা প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে তাদের অনেকে নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে।

নলছিটি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আতাউর রহমান বলেন, কিশোর গ্যাং নয়, সম্প্রতি স্কুল পড়ুয়া দুই ছাত্রদের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়। এতে স্থানীয় দুইটি স্কুলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। পরে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট ছাত্রদের অভিভাবক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ বিরোধ মীমাংসা করেন। 

তিনি আরও বলেন, অপরাধের সঙ্গে  কিশোরদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে।

প্রতিক্রিয়া মন্তব্য শেয়ার