যত বড় পদক্ষেপ, ঠিক ততটাই চড়া স্বরে শুরু হয়ে গেল বিরোধিতা। এখন থেকেই শুরু হয়ে গেল ভারতের ভাঙন—রাজ্যসভা থেকে বেরিয়ে এমনই চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করলেন দেশটির প্রবীণ কংগ্রেস নেতা তথা সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পি চিদাম্বরম। আর রাজ্যসভার মধ্যে বিরোধী দলনেতা গুলাম নবি আজাদের মন্তব্য হচ্ছে—হত্যা করা হলো সংবিধানকে। জম্মু-কাশ্মীরের দুই সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি এবং ওমর আবদুল্লাহ গৃহবন্দি থাকায় গতকাল আসতে পারেননি মিডিয়ার সামনে। কিন্তু টুইটারে তাঁরা দুজনেই তীব্র আক্রমণে বিঁধলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারকে।

জম্মু-কাশ্মীর থেকে ৩৭০ ধারা প্রত্যাহারের কথা গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ রাজ্যসভায় ঘোষণা করা মাত্রই তুমুল হট্টগোল শুরু করে দেন বিরোধী দলগুলোর সাংসদরা। কংগ্রেসের গুলাম নবি আজাদ, তৃণমূলের ডেরেক ও’ব্রায়েন, ডিএমকের তিরুচি শিবা, এমডিএমকের ভাইকোদের নেতৃত্বে তুমুল বিক্ষোভ শুরু হয়। বিরোধী সাংসদরা ওয়েলে নেমে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। জম্মু-কাশ্মীরের দল পিডিপির দুই সাংসদ সংবিধানের প্রতিলিপি সংসদের মধ্যেই ছিঁড়ে ফেলার চেষ্টা করেন।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আগেই রুলিং দিয়েছিলেন রাজ্যসভার চেয়ারম্যান তথা উপরাষ্ট্রপতি বেংকাইয়া নাইডু। কিন্তু তাতেও হট্টগোল আটকানো যায়নি। পিডিপি সাংসদদের আচরণে প্রবল অসন্তুষ্ট হন বেংকাইয়া, মার্শাল ডেকে বের করে দেওয়ার নির্দেশ দেন তাঁদের। হট্টগোলের মধ্যেই অমিত শাহ কাশ্মীরসংক্রান্ত ঘোষণাপত্র এবং বিল পড়ে শোনাতে থাকেন।

চেয়ারম্যানের বিশেষাধিকার প্রয়োগের সুবাদে অমিত শাহ তাঁর কাজ সেরে ফেলেন ঠিকই। কিন্তু তাতে রাজ্যসভার উত্তাপ কমানো যায়নি। কেন্দ্রীয় সরকারকে তথা বিজেপিকে তীব্র আক্রমণ শুরু করে বিভিন্ন বিরোধী দল। সংসদের ভেতরে শুধু নয়, বাইরেও শুরু হয় ক্ষোভ উগরে দেওয়া।

নরেন্দ্র মোদির সরকারকে এবং তাঁর নীতিকে এদিন সবচেয়ে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেছেন পি চিদাম্বরম। গুলাম নবি আজাদ, ডেরেক ও’ব্রায়েনদের পাশে নিয়ে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হন দেশের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘সাংবিধানিক ইতিহাসে আজ কালো দিন। সরকার যা করেছে, তা অভূতপূর্ব।’ চিদাম্বরম গোটা দেশকে সতর্ক করে দেওয়ার ঢংয়ে বলেন, ‘এটা যদি জম্মু-কাশ্মীরের সঙ্গে করা যায়, তাহলে দেশের অন্য রাজ্যগুলোর প্রতিটার সঙ্গেই করা যেতে পারে।’ প্রবীণ কংগ্রেস নেতার ব্যাখ্যা, ‘প্রথমে রাজ্যের নির্বাচিত সরকারকে ফেলে দেওয়া হবে, রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হবে, বিধানসভা ভেঙে দেওয়া হবে, বিধানসভার ক্ষমতা সংসদের হাতে যাবে, সরকার সংসদে একটা প্রস্তাব আনবে, সেটাতে সংসদ অনুমোদন দেবে এবং রাজ্যটা আর থাকবে না।’ চিদাম্বরম আশঙ্কা প্রকাশের ভঙ্গিতে বলেন, ‘প্রতিটি রাজ্যকে এইভাবে ভেঙে দেওয়া যাবে, দুটি অথবা তিনটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করা যাবে।’

এর পরেই আসে চিদাম্বরমের সবচেয়ে কঠোর মন্তব্যটি। তিনি বলেন, ‘এই সরকার যদি এই পথেই এগোতে থাকে, তাহলে এখন থেকেই ভারতের ভাঙন শুরু হয়ে গেল।’

জম্মু-কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী তথা রাজ্যসভায় বর্তমানে কংগ্রেসের দলনেতা গুলাম নবি আজাদ বলেন, ‘সংবিধানকে হত্যা করা হল। ভারতের মানচিত্র থেকে একটা রাজ্য আজ মুছে গেল।’ যে প্রক্রিয়ায় এদিন কাশ্মীরসংক্রান্ত বিল সংসদে পেশ করা হয়েছে, তার তীব্র বিরোধিতায় সরব হন রাজ্যসভায় তৃণমূলের দলনেতা ডেরেক ও’ব্রায়েনও। কয়টার সময় অমিত শাহ বিলটি পেশ করলেন, কখন সেই বিলের প্রতিলিপি সাংসদরা পেলেন, তার ওপরে আলোচনার জন্য বা সংশোধনী আনার জন্য কতটুকু সময় দেওয়া হলো—সেসব নিয়ে প্রশ্ন তুলে সরকারকে তীব্র আক্রমণ করেন ডেরেক। আর বিজেপির অস্বস্তি বাড়িয়ে শরিক দল জেডিইউ বিরোধিতা শুরু করে সরকারের এই সিদ্ধান্তের এবং রাজ্যসভা থেকে জেডিইউ ওয়াক আউট করে।

জম্মু-কাশ্মীরের এক সাবেক মুখ্যমন্ত্রী যখন রাজ্যসভায় তীব্র আক্রমণে বিঁধছেন সরকারকে, তখন বাকি দুই সাবেক মুখ্যমন্ত্রী উপত্যকায় গৃহবন্দি। রাজ্যকে যে দুই ভাগে ভেঙে দেওয়া হয়েছে এবং দুটি ভাগকেই যে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করা হয়েছে, সে খবর বাড়িতে বসেই পেতে হয়েছে মেহবুবা মুফতি এবং ওমর আবদুল্লাহকে। দুজনেই সোশ্যাল মিডিয়ার আশ্রয় নিয়ে তীব্র আক্রমণ করেছেন সরকারকে।

‘আজ ভারতীয় গণতন্ত্রের কালোতম দিন। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্ব প্রত্যাখ্যানের এবং ভারতের সঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত উল্টো ফল দিল। ৩৭০ ধারা বাতিলের যে সিদ্ধান্ত একতরফাভাবে ভারত সরকার নিয়েছে, তা বেআইনি ও অসাংবিধানিক এবং এই সিদ্ধান্ত ভারতকে জম্মু-কাশ্মীরে একটি দখলদার শক্তিতে পরিণত করবে।’ এই ভাষাতেই এদিন টুইট করেছেন মেহবুবা।

ওমর আবদুল্লাহ টুইটারে যা লিখেছেন, তাঁর বক্তব্যও অনেকটা একই রকম। তাঁর আক্রমণ, ‘১৯৪৭ সালে যখন জম্মু-কাশ্মীর ভারতের সঙ্গে জুড়েছিল, তখন রাজ্যের মানুষ ভারতের ওপরে যে বিশ্বাস রেখেছেন, সে বিশ্বাস আজ সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দেওয়া হলো।’