তরুণ ধর্মযাজক ফুলার যখন ফেসবুকে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিলেন, বন্ধুমহল ও আপনজনদের জন্য তা ছিল বিস্ফোরক ব্যাপার। তিনি লেখেন, ‘আপনাদের ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী আমি অবিশ্বাসী। সুতরাং আপনাদের শত্রু। তবে মমতাময় প্রভু থেকে বিমুখ হয়ে থাকা এবং মিথ্যা মতবাদের সেবক হয়ে থাকা নিশ্চয়ই লজ্জাজনক, যারা ভিন্ন মতাবলম্বীদের শত্রু মনে করে এবং তাদের ঘৃণা করতে শেখায়। আমি কেন স্রষ্টার কাছে কম প্রত্যাশা করব।’

তবে ফুলারের বাল্যবন্ধুদের অনেকেই তাঁকে অভিনন্দন জানান। তাঁদের একজন লেখেন, ‘আমি, অনেক মানুষ, এমনকি বন্ধুরাও তোমাকে এ ব্যাপারে গালমন্দ করবে। এটা তোমার সিদ্ধান্ত। আমি আশা করি, এর মাধ্যমে তোমার জীবনের সৌন্দর্য বিকশিত হবে।’

ফুলার একটি ধার্মিক খ্রিস্টান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর চাচা ছিলেন আমেরিকার সর্ববৃহৎ খ্রিস্টধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সাউদার্ন ব্যাপ্টিস্ট চার্চের যাজক। তাঁর মা-বাবাও ছিলেন ধর্মের প্রতি গভীর অনুরাগী। তার পরও ফুলার ইসলাম গ্রহণ করেন। কারণ ইসলাম তাঁর মন ও হৃদয় স্পর্শ করেছিল। ফুলার বলেন, ‘আমি একটি ধর্মবিশ্বাস নিয়ে বড় হয়েছি। আমি বিশ্বাস করি, পৃথিবীর একজন স্রষ্টা রয়েছেন। আমি সব সময় ভাবতাম আমার কী হওয়া উচিত। কারণ ব্যাপ্টিস্ট ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে নিজেকে মেলাতে পারছিলাম না।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় সেমিস্টারের সময় ফুলারের সঙ্গে একজন ধার্মিক মুসলিমের পরিচয় হয়। তাঁদের মধ্যে বন্ধুত্বও হয়। তাঁর কাছ থেকে ফুলার ইসলাম সম্পর্কে জানতে শুরু করেন। ফুলার বলেন, ‘আমি আমার বন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে শুরু করি। আমাদের মধ্যে ইসলাম সম্পর্কেই বেশি কথা হতো, যা আমার মধ্যে একটি অনুভূতির সৃষ্টি করে। আমার মনে হয়েছে, ইসলাম অনেক বেশি যৌক্তিক খ্রিস্টধর্মের তুলনায়। বহুবার এমন হয়েছে, খ্রিস্টধর্ম সম্পর্কে আমি প্রশ্ন করতে চেয়েছি, কিন্তু আমাকে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিপরীতে ইসলাম প্রশ্ন, তর্ক ও আঘাতের জন্য প্রস্তুত। তারা আমার প্রশ্নকে সাদরে গ্রহণ করেছে।’

‘পরিণাম ও পরিণতি চিন্তা করার পরও আমি ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিই। কারণ আমি ইসলাম ধর্মে আত্মিক যে প্রশান্তি খুঁজে পেয়েছি, তা আর কোথাও পাইনি। আমি জানি, আমি কে। আমার বিশ্বাস কী। এবং কিভাবে আমার জীবনে বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটবে। তবে এটা বোঝানো কঠিন যে আমি এমন একটি ধর্মে শান্তির সন্ধান পেয়েছি, যাকে অনেকেই ঘৃণার চোখে দেখে।’

ফুলার জানতেন তাঁর ধর্মান্তরের ঘটনা মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করবে। তবে ফেসবুকে তিনি যে পরিমাণ বিরূপ মন্তব্যের শিকার হয়েছেন, তার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলেন না। তাঁর কলেজজীবনের বেশির ভাগ বন্ধুর আচরণেই সেই পরিবর্তন দেখতে পান। আর প্রবীণরা বিষয়টিকে একটি সংকট হিসেবেই দেখতে শুরু করেন। তিনি বলেন, “এটা ভেবে আমার মন খারাপ হয় যে আমি ছিলাম চার্চের প্রশংসিত একটি কিশোরী। যেমন—একজন লেখেন, ‘তুমি ছিলে সব কিশোর-কিশোরীর জন্য অনুপ্রেরণা। তারা ছিল তোমার বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। এমনকি তারা খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করতে লজ্জা বোধ করত না। তোমার জন্য যেন এসব তরুণের প্রাণ আহত না হয়।’”

ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর পরিবারের আচরণেও ব্যাপক পরিবর্তন আসে। তবে তাঁর মা তাঁকে সহযোগিতা করেন। ফুলারের ভাষায়, ‘আমার মা সব সময় আমাকে বলতেন—তোমার মনের কথা শোনো। এ ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ছিল না। তিনি আমাকে সর্বোত্তম সহযোগিতা করলেন।’

অবশ্য ফুলার যেমন অনেক বন্ধু হারিয়েছেন, তেমনি অনেক বন্ধু খুঁজেও পেয়েছেন। তিনি দ্য মুসলিম স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনে যোগ দেন। মুসলিম শিক্ষার্থীরা তাঁকে আপন করে নেয়। তারা তাঁকে তাদের সঙ্গে অবস্থানের প্রস্তাবও দেয়। ফুলার বলেন, ‘আমি মুসলিম শিক্ষার্থীদের দলে যোগ দিয়েছি। তাদের সঙ্গে ইসলাম সম্পর্কে আলোচনা হয়। তারা আমাকে সহযোগিতা করছে, যেন কোনো পক্ষ আমাকে ইসলামবিরোধী কিছু করতে বাধ্য না করে।’ ফুলার তাঁর বন্ধুদের এখনো স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ‘আমি আমার বন্ধুদের ভালোবাসি। তারা যেন আমাকে ভুল না বোঝে।’

ইসলাম গ্রহণের পর ফুলারের জীবনচিত্র পাল্টে যায়। তিনি আর মদ পান করেন না, আগের মতো আড্ডা ও পার্টিতে যোগ দেন না, প্রিয় ফুটবল খেলাও ছেড়ে দিয়েছেন, হিজাব ও ইসলামী পোশাক পরিধান করেন, নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন।

দ্য ডিএম অনলাইন ডটকম থেকে আবরার আবদুল্লাহর অনুবাদ