দু’পাশে অসংখ্য দোকানপাট। তার উপর বিশাল বিশাল দালান। নদীর পাড়ে গিয়ে রাস্তাটি শেষ হয়েছে। সাভার বাসস্ট্যান্ড থেকে তিন কিলোমিটার দূরে। ঘনবসতি ও দোকানপাটের পর দেখা মেলে সবুজেঘেরা সেই গ্রামবাংলার অপরূপ দৃশ্য। এই এলাকায় এখনো কৃষকের পায়ের ছাপ দেখা যায়। যদিও বেশ উন্নত এলাকা। তবুও আদিপুরুষের পেশা ধরে রেখেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। 

মনরোম এই পথ দিয়ে দীর্ঘক্ষণ হাঁটলাম। রাত বারোটা থেকে একটু বেশি। রাতদুপুরে হাঁটাহাঁটি আমার পুরনো অভ্যাস। মাদরাসায় থাকাকালীনও এই রুটিন চলতে থাকতো। সেই সুবাদে টং দোকানের চা-ওয়ালাদের সাথে আমার গভীর সম্পর্ক। সাধারণত তারা রাত্রি করে বাড়ি ফেরে। 

সে-রকম একজন আমাদের ফজলু ভাই। চা দোকানে অতিবাহিত হয়েছে তার জীবনের পনের বছর। লোকমুখে ফজলু ভাইয়ের চায়ের ব্যাপক সুনাম। গৃহত্যাগীরা রাত বারোটা-একটা পর্যন্ত এখানে আসর জমায়। মাঝে মাঝে আমিও তাদের গল্প-আলাপে শরিক হই। ফজলু ভাই সাটার নামানোর পর বাড়ি ফিরি।

আজ রাস্তা দিয়ে আসার সময় ফজলু ভাইয়ের সাথে ইশারায় কথা হয়েছে। দোকানে যেতে বললেন। কী মনে করে যেন যাওয়া হলো না। ইশারায় বুঝালাম পরে আসবো। ঘন্টাখানেক হাঁটার পর মনে হলো এবার বাড়ি ফেরা দরকার। অনেক রাত হয়েছে। এতক্ষণে বোধহয় মেইন ফটকে তালা ঝুলছে। এতো রাতে চাবির জন্য বাবাকে কষ্ট দেওয়ার কোন মানে হয় না।

তাই হাঁটা ধরলাম বাড়ির দিকে। কিছুক্ষণ আগে ঝড় হওয়ায় ইলেক্ট্রিসিটি চলে গেছে। একটি বাড়িতেও বাল্ব জলছে না। তবে গাছের পাতায় পাতায় জোনাকিপোকার আলো আছে। জলছে, নিবছে। সে কি মুগ্ধকর পরিবেশ! বলে বুঝাতে পারবো না। মাঝে মাঝে বাতাস বইছে। ধানক্ষেতের উপর থেকে বয়ে আসা বাতাস সোজা কলিজায় এসে আঘাত করছে। আহ শান্তি! শান্তি! 

এভাবে কিছুদূর আসার পর একটা চার রাস্তার মোড়ে চোখ আটকে গেল। বোরকা পড়া একটা মেয়ে। হাত-পা মোজায় ঢাকা। হাতে শপিং ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হয়তো পরিবারের কারো জন্য অপেক্ষা করছে। পুরো শরির ঢাকা। তবুও চেনা চেনা লাগলো মেয়েটিকে। মনে হলো এই তরুণী আমার অতিপরিচিত, মেয়েটির নাম তানজি। তবে নিশ্চিত হতে পারছিলাম না তথনো। কিন্তু যখন পায়ের দিকে তাকালাম, তখন পুরেপিুরি নিশ্চিত হলাম মেয়েটি তানজি। আমার গৃহত্যাগী মনোভাব যার দুয়ারে অচল হয়ে পড়েছে। যার বিরহে নিজেকে অসহায় মনে হয়েছে প্রতিটা সময়।

তানজি অন্ধকারে আমাকে দেখতে পায় নি। যখন আলোতে আসলাম আমাকে দেখতে পেল। সঙ্গে সঙ্গেই হাঁটা ধরলো বাসার দিকে। আমিও পেছন পেছন যেতে লাগলাম। যদিও তার পিছু নেওয়ার অধিকার সে আমার থেকে ফিরিয়ে নিয়েছে। আমি তার কাছে এখন নিতান্তই অপরিচিতদের মতো। 

সে হাঁটছে আর পেছনে তাকিয়ে দেখছে আমি পিছু ছেড়েছি কিনা। আমিও না চেনার ভান করে পেছনে পেছনে হাঁটছি। 

ও আমাকে একদিন চ্যালেঞ্চ করেছিল, বোরকা পড়ার পর আমাকে চিনতে পারবে না। সেদিন আমি চ্যালেঞ্চ গ্রহণ করে বলেছিলান, যদি তোমাকে সত্যিই ভালোবেসে থাকি তাহলে হাজারটা বোরকাওয়ালির মাঝে তোমাকে বেঁছে নিতে পারবো। আমার একটুও সমস্যা হবে না।

প্রায় আধা কিলোমিটার হাঁটার পর ওদের বাসার কাছে চলে আসলাম। ও বাসার গেইটে কিছুক্ষণ দাঁড়ালো। ওর চোখে হাজারটা প্রশ্ন, এবং বিরক্তির প্রকাশ। 

আমি খানিকটা দূরে খুঁটির নিচে দাঁড়ালাম। আমার মনেও হাজারটা প্রশ্ন। যেই প্রশ্নগুলো আমাকে প্রতিনিয়ত পীড়া দিচ্ছে। বের হওয়ার জন্য ছটফট করছে। শুধু সাহসের অভাবে কখনো ওর দরজায় কড়া নেড়ে জিজ্ঞেস করা হয় নি। কারণ ওর ধারণা ওর দরজায় কড়া নাড়ার কোন অধিকার আমার নেই। কিন্তু আমার বিশ্বাস , যেহেতু আমি ওকে ভালোবাসি, তাই ওর উপর আমার অধিকার আছে। মজবুত অধিকার। 

আজ সময় এসেছে। ওকে কিছু জিজ্ঞেস করতে চাই। পরিবারের মতামতের কাছে আমাদের ভালোবাসা হেরে গেল! এরকম ঠুনকো ভালোবাসা আমাদের! "ইচ্ছে শত" স্বপ্নগুলোর ভবিষ্যত এখানেই শেষ! 

আমি দু'একপা করে অগ্রসর হলাম। ওর সামনে এসে দাঁড়ালাম। জিজ্ঞেস করলাম কেমন আছো তানজি?

ও উত্তর দিলো না। হঠাৎ কান্নায় ভেঙে পড়লো। চোখ দিয়ে টপটপ অশ্রু পড়ছে মেয়েটির। চাঁদের আলোয় আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম প্রতিটি অশ্রুকণা। সবসময় হাসিমুখে থাকা তরুণীর চোখে অশ্রু একদমই মানাচ্ছিল না। 

আমি হাত বাড়িয়ে মুছে দিলাম ওর চোখের নোনাজল। আবারো কান্নায় ভেঙে পড়লো তানজি। আমি আবারও মুছে দিলাম ওর দুঃখগুলো।

কিছুক্ষণ পর ও বললো, দেখো আমাদের সম্পর্ক এখানেই শেষ। বাবা আমাদের সম্পর্ককে মেনে নিচ্ছেন না। তাঁর কথার বাইরে যাওয়ার সাহস আমার নেই। তুমি পড়াশোনার জন্য চলে যাও। ফিরে এসে বিয়ে করে নিয়ো। পছন্দ মতো কাউকে। সে তোমাকে আমার চেয়েও বেশি সুখে রাখবে। 

আমি বললাম, এটাই তোমার শেষ কথা? 
-হ্যাঁ। এটাই আমার শেষ কথা। এছাড়া আমাদের আর কিছুই করার নেই। 
-তোমার কি মনে হয়, তোমাকে ছাড়া আর কাউকে আমি ভালোবাসতে পারবো?
-নতুন বউ পেলে আমার কথা মনে থাকবে না। 
-তাহলে আমাদের স্বপ্নগুলো এখানেই শেষ করে দিতে বলছো?
-হ্যাঁ। যেই স্বপ্ন কখনো পূরণ হবে না, সে-স্বপ্ন দেখে কি লাভ? আমি এখন বাসায় চলে যাবো। আর হ্যাঁ আমাকে কখনো মেসেজ করবে না, ফোন দিবে না। আমি মায়ার বন্ধনটা আর বাড়াতে চাই না। প্লিজ।

কথাগুলো বলে নিষ্ঠুরের মতো উপরে চলে গেল তানজি । একটি বারও পেছনে তাকালো না। আমি ভিক্ষুকের মতো তাকিয়ে রইলাম ওর দিকে। অপলকে দেখছিলাম পাষাণহৃদয়ের একজন নারী ভালোবাসাকে দাফন করে চলে যাচ্ছে। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে সে। মায়াবতীর পায়ের শব্দ আমার কানে ঢুকছে। সেই শব্দ শুনে আমার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে। আর চোখ দিয়ে ঝরছে নিদারুণ কান্নার ফোটা। গাল গড়িয়ে ঠোঁটের আগায় জমছে সেই ফোঁটাগুলো। 
আমি ভগ্নহৃদয়ে কিছুক্ষণ পর চোখ মুছে বাসায় ফিরলাম। বারান্দায় এসে চেয়ারে বসলাম। কানে হেডফোন লাগিয়ে রবীন্দ্রনাথের গান শুনতে লাগলাম। 

"যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে
আমি বাইবো না, বাইবো না মোর খেয়াতরী এই ঘাটে"

চেয়ারে বসে সিদ্ধান্ত নিলান, তুমি হয়তো আমাকে ভুলে যাবে কোন একদিন,মনে রাখবে না এই পাগলের কথা। কিন্তু আমি সারাজীবন তোমারই থাকবো। আর কাউকে ভালোবাসতে পারবো না। মনের ভেতর তোমার জন্য যেই সিংহাসন তৈরি করেছি, সেখানে কাউকে বসাতে পারবো না তানজি।

তোমার হাতে লেখা সেই চিরকুটের শব্দ শুনে এই জনম পার করে দেবো। আমার কাছে এটাই তুমি। এটাই আমার মিষ্টি তানজি।  

"তবে তুমি যাহা চাও, তাই যেন হয়, আমি যতো দুঃখ পাই গো"

লেখক: সাংবাদিক।