জেনে রাখুন ডায়াবেটিস কি এবং এর লক্ষণ সমূহ

প্রবাসীর দিগন্ত | ডেস্ক রিপোর্ট : জুলাই ২৯, ২০১৮

ডায়াবেটিস এমন একটি রোগ, যাকে বলা হয় নীরব ঘাতক। বর্তমানে ডায়াবেটিস একটি সর্বজনীন সমস্যা, প্রায় প্রতি ঘরে ঘরেই অন্তত একজন ব্যক্তির ডায়াবেটিস লক্ষ্য করা যায়। অথচ এর লক্ষণ সম্বন্ধে অনেকেই জানেন না।

নীরব ঘাতক এই রোগটি কখন আপনার শরীরে বাসা বাঁধবে আপনি বুঝতেই পারবেন না। তাছাড়া এটি আপনার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নষ্ট করে আরও অনেক রোগের সম্ভাবনা তৈরি করে। তাই এই রোগটির পূর্বলক্ষণগুলো জেনে রাখা প্রয়োজন।

ডায়াবেটিস কি?

আমাদের শরীরে বিলিয়ন বিলিয়ন কোষে প্রতি মুহূর্তে লক্ষ-কোটি কাজ হয়ে চলেছে। এই কাজ সুষ্ঠুভাবে সমাধা হওয়ার জন্য চাই শক্তি। শক্তির সবচেয়ে বড় যোগানদাতা কার্বোহাইড্রেট। এর মধ্যে রয়েছে ভাত, ডাল, আলু, শাকসবজি, গম ভুট্টা প্রভৃতি। জটিল বিক্রিয়া শেষে এগুলো আমাদের শরীরের কোষে গ্রহণ উপযোগী সরল অণুতে পরিণত হয়। এই সরল অণু হচ্ছে গ্লুকোজ। গ্লুকোজ অণুকে শরীরের কোষ গ্রহণ করে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে শক্তি উৎপাদন করে। এই শক্তি দেহকে সচল রাখে।

কিন্তু কোষে গ্লুকোজ প্রবেশ করতে হলে একটি হরমোন লাগে। এর নাম ইনসুলিন। আমাদের দেহের কোষে একধরনের চ্যানেল থাকে যেটা দিয়ে গ্লুকোজ শরীরে প্রবেশ করে। স্বাভাবিক অবস্থায় চ্যানেলটি বন্ধ থাকে। ইনসুলিন না থাকলে গ্লুকোজ কোষে প্রবেশ করতে পারবে না। ফলে কোষে শক্তি উৎপাদন হবে না। আর কোষ শক্তি না পেলে তার কাজ ঠিকমতো করতে পারবে না। অথচ রক্তে অফুরন্ত গ্লুকোজের যোগান রয়েছে। কিন্তু কোষগুলোকে অভুক্ত অবস্থায় থাকতে হচ্ছে। রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে গেলে প্রস্রাবের সময় এবং ঘনত্ব বেড়ে যায়। এই সামগ্রিক অবস্থাটি ডায়াবেটিস মেলাইটাস বা সংক্ষেপে ডায়াবেটিস নামে পরিচিত। বারে বারে প্রস্রাব করার জন্য এই রোগের আরেক নাম বহুমূত্র রোগ।

লক্ষণ সমূহ: ডায়াবেটিসের জটিলতা নির্ণয় করা সবসময় সহজ নয়। ফাস্টিং ব্লাড সুগারের মাত্রা প্রতি ডেসিলিটারে ১২৬ মিলিগ্রাম বা এর বেশি হলে অথবা এ১সি ৬.৫ শতাংশ বা এর বেশি হলে ডায়াবেটিস হয়েছে বলে ধরা হয়। আসুন ডায়াবেটিসের প্রাথমিক লক্ষণগুলো এক নজরে দেখে নেওয়া যাক -

-: দৃষ্টি সমস্যা :-

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আপনার চোখের পেছনে ছোট রক্তনালীতে শর্করা জমা হতে থাকে। উচ্চ রক্ত শর্করার কারণে এমনটা হয়ে থাকে এবং এর ফলে কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মায়ো ক্লিনিকের এন্ডোক্রিনোলজিস্ট অ্যাড্রিয়ান ভেলা বলেন, ‘আপনার চোখে পুষ্টি সরবরাহ ও রক্তপ্রবাহ ঠিক রাখতে আপনার শরীর ক্ষতিগ্রস্ত রক্তনালীর পাশে নতুন রক্তনালী সৃষ্টি করে।’ শুনতে ভালো মনে হতে পারে, কিন্তু সমস্যা আছে: ডা. ভেলা বলেন, ‘এসব নতুন রক্তনালী দুর্বল এবং তারা ব্রেকেজ, লিকিং ও ব্লিডিং প্রবণ।’ এর ফলে দৃষ্টি তির্যক হতে পারে এবং এমনকি দৃষ্টিশক্তি হারিয়েও যেতে পারে।

নতুন রক্তনালী আপনার চোখের পেছনে অবস্থিত দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণকারী টিস্যুর পাতলা স্তর রেটিনায়ও ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে, যার ফলে রেটিনা সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। ডা. ম্যাথিউডাকিস বলেন, ‘যদি অবিলম্বে এর চিকিৎসা করা না হয়, তাহলে তা অন্ধত্বের কারণ হতে পারে।’

যদি আপনার দৃষ্টি ঝাপসা হয় অথবা চোখের সামনে ছোট রেখা বা বিন্দু বা ব্লব দেখেন, তাহলে তা আপনার চোখে রক্তপাতের সম্ভাব্য লক্ষণ হতে পারে। এক্ষেত্রে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। চোখের দৃষ্টির সামনে অথবা ফ্লাশিং লাইটের উপস্থিতিতে পর্দা দেখলে তা রেটিনা বিচ্ছিন্ন হওয়ার লক্ষণ হতে পারে এবং এক্ষেত্রেও আপনাকে অবিলম্বে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।

নিয়মিত রক্ত পরীক্ষায় এসব সমস্যা ধরা পড়তে পারে। বোস্টনে অবস্থিত উইমেন’স হসপিটালের এন্ডোক্রিনোলজিস্ট আলেকজান্ডার তুরচিন বলেন, ‘যদি এসব সমস্যা তাড়াতাড়ি নির্ণীত হয়, তাহলে লেজার ট্রিটমেন্ট ও ইনজেকশন উভয়ের মাধ্যমে চোখের আরো ড্যামেজ প্রতিরোধ করা যেতে পারে।’

-: বাহু বা পায়ে অসাড়তা :-

যখন আপনার স্নায়ুতে রক্ত সরবরাহকারী ছোট রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত হবে, আপনি আপনার পা, বাহু ও হাতে অসাড়তা অনুভন করতে পারেন। ডা. ভেলা বলেন, ‘শরীরের দীর্ঘতম স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা সর্বাধিক।’ এ কারণে পা ও বাহুর স্নায়ু ড্যামেজ হওয়ার সম্ভাবনা অন্যান্য স্নায়ুর থেকে বেশি। যদি আপনি পা অথবা বাহুতে দীর্ঘস্থায়ী অসাড়তা, রণন বা ব্যথা অনুভব করেন তাহলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। ডা. ম্যাথিউডাকিস বলেন, ‘সেরে ওঠে না এমন ক্ষতের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন, কারণ এর চিকিৎসা করা না হলে অঙ্গচ্ছেদনের প্রয়োজন হতে পারে।’ এ কারণে ডায়াবেটিকদের তাদের পায়ের ব্যাপারে অতিরিক্ত সচেতন থাকা গুরুত্বপূর্ণ।

-: যৌন অক্ষমতা :-

ডা. ম্যাথিউডাকিস বলেন, ‘লিঙ্গ উত্থানের জন্য দুটি ঘটনা ঘটা প্রয়োজন: আপনার পুরুষাঙ্গে ভালো রক্তপ্রবাহ প্রয়োজন হবে এবং আপনার মস্তিষ্ক থেকে শক্তিশালী স্নায়ু সংকেত প্রয়োজন হবে। ডায়াবেটিস উভয় মেকানিজমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।’ ডা. ম্যাথিউডাকিস বলেন, ‘সংবহন ও স্নায়ু সমস্যা ছাড়াও ডায়াবেটিস পুরুষদের যৌন কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য ফ্যাক্টরকেও বিরূপভাবে প্রভাবিত করে, যেমন- টেস্টোস্টেরনের মাত্রা হ্রাস পাওয়া।’ তিনি বলেন, ‘যদি আপনার ডায়াবেটিস থাকে, তাহলে রক্ত সংবহন সমস্যার ক্ষেত্রে সেবনকৃত ভায়াগ্রার মতো ওষুধ সবসময় ভালোভাবে কাজ করবে না।’ এমন ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা আপনাকে ইনজেক্টেবল মেডিকেশন দিতে পারে, যা অধিক কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে।

-: ক্লান্তি :-

যখন আপনার রক্ত শর্করা অত্যধিক বেড়ে যাবে, আপনার কিডনি আপনার রক্ত থেকে আবর্জনা ফিল্টার করার জন্য অতিরিক্ত কাজ করবে। আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশন অনুসারে, ‘কিডনি অধিক পরিশ্রম করলে তাদের রক্তনালী ড্যামেজ হতে পারে।’

-: বুকে ব্যথা বা টাইটনেস :-

ডা. ম্যাথিউডাকিস বলেন, ‘ডায়াবেটিসে আক্রান্ত লোকদের কার্ডিওভাস্কুলার রোগের চারগুণ বর্ধিত ঝুঁকি রয়েছে।’ এর কারণ হচ্ছে, আপনার হৃদপিণ্ডের পার্শ্ববর্তী রক্তনালীর অত্যধিক রক্ত শর্করা প্লেক সৃষ্টিতে অবদান রাখে, যার ফলে ধমনী সংকুচিত হয়- এটি এমন অবস্থা যা হার্ট অ্যাটাকের দিকে নিয়ে যায়।

ডা. ম্যাথিউডাকিস বলেন, ‘হৃদপিণ্ডের ধমনীসংক্রান্ত রোগের উপসর্গসমূহের মধ্যে বুকের মধ্যখানে বা বামপাশে প্রেশার বা টাইটনেস অন্তর্ভুক্ত এবং এটি এক্সারসাইজ অথবা ইমোশনাল স্ট্রেস ও শ্বাসকষ্ট দ্বারা উদ্দীপিত হয়।’ যখন ধমনী সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায় তখন হার্ট অ্যাটাক হয়। ডা. ভেলা বলেন, ‘ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রেও হৃদরোগের অন্যান্য রিস্ক ফ্যাক্টর রয়েছে, যেমন- উচ্চ কোলেস্টেরল, স্থূলতা ও অলস জীবযাপন।

-: খিদে (ক্ষুধা) বেড়ে যাওয়া :-

ডায়াবেটিসের তিনটি প্রধান লক্ষণের মধ্যে অন্যতম হল খিদে (ক্ষুধা) বেড়ে যাওয়া। বারবার খাবার খাওয়ার পরেও একটা খিদে খিদে ভাব থেকেই যায়। এমন হলে অবশ্যই চিকিত্সকের পরামর্শ নেওয়া উচিত্।

-: ক্ষতস্থান নিরাময় হতে সময় লাগা :-

শরীরের যে কোনও কাটা-ছেড়া ও ক্ষতস্থান শুকতে বা সেরে উঠতে যদি অনেক বেশি সময় লাগে তবে তা ডায়াবেটিসের প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়। এমন হলে দ্রুত চিকিত্সকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

প্রতিরোধ

ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে ওজন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ওজন বেশি থাকলে তা খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়ামের মাধ্যমে কমানো আবশ্যক। চিনি এবং মিষ্টি জাতীয় খাবার বাদ দিতে হবে। আঁশ যুক্ত খাবার খাদ্যতালিকায় যুক্ত করতে হবে। একটি খাদ্যতালিকা মেনে চললে সব থেকে ভালো হয়। কোনো ব্যক্তি যদি ইনসুলিন কিংবা অন্যান্য ঔষধ নিয়মিত গ্রহণ করতে থাকে, তাহলে খাবার নিয়মিত খেতে হবে। কেননা কোনো বেলার খাবার বাদ দিলে তার প্রতিক্রিয়া মারাত্মক হতে পারে।

সুষ্ঠু এবং নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন করলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। বর্তমানে ডায়াবেটিস ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এজন্য সবার মাঝে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়া একান্ত প্রয়োজন। কারণ সচেতনতাই পারে আমাদের এই বিভীষিকা থেকে দূরে রাখতে।

তথ্য:

বিভাগ:

প্রকাশ: জুলাই ২৯, ২০১৮

প্রতিবেদক: প্রবাসীর দিগন্ত

পড়েছেন: 1041 জন

মন্তব্য: 0 টি