চট্টগ্রাম নগরীর এম এ আজিজ স্টেডিয়াম সংলগ্ন জিমনেশিয়াম মাঠে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম অমর একুশে বইমেলার পর্দা উঠবে আজ সোমবার। গতবারের ধারাবাহিকতায় এবারও সম্মিলিত উদ্যোগে বাস্তবায়িত হবে এ মেলা। প্রথমবার পাঠক ও লেখকের প্রত্যাশা পূরণ হয়েছিল। তাই এবারও আশাবাদী তারা। তবে এই মেলা চট্টগ্রামের সৃজনশীল প্রকাশনা শিল্পের বিস্তারে কতটা ভূমিকা রাখবে সেটা নিয়ে আছে নানা প্রশ্ন।


বিভিন্ন নথিপত্র পর্যালোচনায় জানা গেছে, ষাটের দশকে দেশের প্রকাশনা শিল্পে বড় ভূমিকা রাখত চট্টগ্রাম। ওই সময়টা ছিল চট্টগ্রামের প্রকাশনা শিল্পের স্বর্ণযুগ। তখন শুধু বাংলাদেশ নয়, পশ্চিমবঙ্গের খ্যাতিমান অনেক লেখকের বইও প্রকাশ করেছে চট্টগ্রামের প্রকাশনা সংস্থাগুলো। কালের আবর্তে চট্টগ্রামের প্রকাশনা শিল্পের ঐতিহ্য সমৃদ্ধ হয়নি। বরং ধস নেমেছে। এর পেছনে আছে নানা কারণ। তবে ২০১৯ সালে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে সম্মিলিত ব্যবস্থাপনায় অনুষ্ঠিত বইমেলা সফল হওয়ায় স্থানীয় প্রকাশকরা আশার আলো দেখতে পান। তবে বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা।


প্রকাশকদের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, গতবার মেলায় ২১ দিনে (প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দুদিন সময় বেড়েছিল) আনুমানিক সাড়ে ১৩ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছিল। এর মধ্যে শুধু চট্টগ্রামের প্রকাশনা সংস্থাগুলোর ব্যবসা হয়েছে মাত্র ১০ শতাংশ বা এক কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এবার বিকিকিনি গতবারের দ্বিগুণ হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন প্রকাশকরা। ওই হিসেবে এবার ২৭ কোটি টাকার বিকিকিনি হতে পারে। গতবারের হিসেবে এবার চট্টগ্রামের প্রকাশকরা দুই কোটি ৭০ লাখ টাকার ব্যবসা করতে পারেন। অথচ এবারের মেলায় চট্টগ্রামের ৪০টি সৃজনশীল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে, যা মেলায় অংশ নেয়া মোট প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২৬ শতাংশ। এবার ঢাকার ১১০টি প্রকাশনা সংস্থা অংশ নিচ্ছে। ফলে সম্ভাব্য আর্থিক হিসেবে বলা যায়, শুধু চট্টগ্রামের প্রকাশনা শিল্পের বিস্তারে খুব বেশি ভূমিকা রাখতে পারছে না বইমেলা।


এদিকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রকাশকের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, এবার চট্টগ্রামের প্রকাশনা সংস্থাগুলো থেকে সাড়ে চারশ থেকে পাঁচশ বই প্রকাশিত হবে। এর মধ্যে বাতিঘর, শৈলী, খড়িমাটি, বলাকা, কালধারা, শব্দশিল্প, চন্দ্রবিন্দু, আবীর ও অক্ষরবৃত্তসহ হাতেগোনা কয়েকটি প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হবে তিনশর বেশি বই।


বইমেলা চট্টগ্রামের প্রকাশনা শিল্পের বিস্তারে আদৌ কোনো ভূমিকা রাখছে কিনা জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে চট্টগ্রামের এক প্রকাশক বলেন, চট্টগ্রামে প্রকাশনা শিল্পকে কোনো ধরনের লাভের মুখে আনবে না বইমেলা। চট্টগ্রামের প্রকাশনা শিল্পের উপকারে আসবে না এ মেলা। তবে এই মেলা চট্টগ্রামের সাধারণ পাঠক ও লেখকগণের উপকারে আসবে। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, বাংলা একাডেমির বইমেলায় বাংলাদেশের প্রকাশনাগুলো অংশ নেয় এবং তা দেশের প্রকাশনা শিল্পের ভিত্তিকে আরো শক্তিশালী করছে। আবার চট্টগ্রামের বইমেলাতেও একই প্রকাশনাগুলো অংশ নিচ্ছে এবং একইভাবে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে। এখানে লক্ষ্যণীয়, চট্টগ্রামের ৪০টি প্রকাশনার মধ্যে চার-পাঁচটি ছাড়া বাকিগুলো ঢাকার প্রকাশনাগুলোর বিপরীতে কিছুই না। চট্টগ্রামের কয়েকটি ছাড়া বাকি প্রকাশনাগুলো থেকে প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যাও কম। মানের দিক থেকেও আছে নানা প্রশ্ন। ফলে মেলার মাধ্যমে চট্টগ্রামের বাজারে আরো নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে ঢাকার প্রকাশনাগুলো। তবে চট্টগ্রামের যে কয়েকটি প্রকাশনা সংস্থা ২০-৫০টি বই ও ভালো মানের বই বের করে, তারা হয়ত লাভবান হবে। সামগ্রিক প্রতিযোগিতায় চট্টগ্রামের প্রকাশনা পিছিয়ে থাকবে।


বইমেলা পরিচালনা কমিটির যুগ্ম সচিব জামাল উদ্দিন বলেন, গতবার অনেকগুলো স্টলে নিজেদের প্রকাশনার বাইরের বই বিক্রি হয়েছিল। এবার নীতিমালার কারণে তেমনটি হবে না। কেবল নিজেদের প্রকাশিত বইগুলো বিক্রি করতে হবে। ফলে যেসব প্রকাশকের বইয়ের সংখ্যা কম থাকবে বা ভালো মানের বই প্রকাশ করবে না বাণিজ্যিকভাবে তাদের লাভবান হওয়ার সুযোগও কম।


চট্টগ্রামের প্রকাশনা শিল্পের নানা সমস্যা তুলে ধরে বলাকা প্রকাশনার এ স্বত্বাধিকারী বলেন, দিন দিন কাগজের দাম বাড়ছে। এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছিলাম এবং প্রধানমন্ত্রীর নলেজেও এনেছিলাম। কিন্তু কাজ হয়নি। কাগজসহ নানা খাতে ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় বইয়ের খরচও বেড়ে যাচ্ছে। যেমন গতবার ১০ ফর্মার একটি বইয়ের এক হাজার কপি বের করতে খরচ হয়েছিল এক লাখ ১০ হাজার টাকা। এবার আরো ১৫ হাজার টাকা যোগ করতে হয়েছে। ভালো মানের পেস্টিং বোর্ড ব্যবহার, ভালোভাবে বাইন্ডিং করাসহ নানা খাতে ব্যয় বাড়ার কারণেই বাড়তি খরচ হচ্ছে। চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত বইয়ের গুণগত মান পিছিয়ে থাকার কারণগুলোর মধ্যে ভালো মানের কাগজ ব্যবহার না করা, দুর্বল বাইন্ডিং এবং প্রকাশনাগুলোর এডিটিং প্যানেল না থাকাকেও দায়ী করেন তিনি। তিনি বলেন, এখানকার বেশিরভাগ প্রকাশক লেখক যে পাণ্ডুলিপি দেন তা-ই ছাপান। সেক্ষেত্রে বানান ভুলসহ নানা ভ্রাান্তি থেকে যায়।


খড়িমাটি প্রকাশনার স্বত্বাধিকারী মনিরুল মনির বলেন, চট্টগ্রামে ভালো ছাপার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু ভালো মানের বাইন্ডিং পাওয়া যায় না। বাইন্ডিং কস্টও বেশি। কাগজ অপ্রতুল। ভালো মানের কাগজ এখানে পাওয়া যায় না, ঢাকায় পাওয়া যায়। তবে চট্টগ্রাম থেকে ভালো প্রকাশনা হওয়ার মতো পরিস্থিতি আছে। চট্টগ্রামের প্রকাশকরা যদি ভালো বইটি নির্বাচন করে ঠিকমত প্রকাশ করেন তাহলে ভালো প্রকাশনা হতে পারে।


তিনি বলেন, ঢাকার প্রকাশকরা যখন আসছেন তখন চট্টগ্রামের প্রকাশকদেরও ভাবতে হবে। প্রতিযোগিতায় থাকার জন্য মানের দিক থেকে ঢাকার প্রকাশকদের জায়গায় পৌঁছতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামের প্রকাশনার একটি ঐতিহ্য ছিল। কিন্তু সেই ঐতিহ্য ধরে রেখে মাঝখানে ভালো প্রকাশনা এখানে হয়নি। একটা গ্যাপ তৈরি হয়েছে। এখন নতুন করে প্রকাশনা হচ্ছে এবং এর মধ্য দিয়ে আমরা আশার আলো দেখতে পাচ্ছি। তিনি বলেন, ভালো করছে চট্টগ্রামের এমন অনেকগুলো প্রকাশনা কিন্তু ঢাকা থেকেই বই ছাপছে। এখন তারা যদি স্থায়ীভাবে ঢাকাকেন্দ্রিক হয় তাহলে তা হতাশাজনক।


কালধারা প্রকাশনার স্বত্বাধিকারী ও বইমেলা পরিচালনা কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক মহিউদ্দিন শাহ আলম নিপু বলেন, গতবারের তুলনায় এবার খরচ ১০ থেকে ২০ শতাংশ বেড়েছে। কিছু বই আছে যেখানে বাইন্ডিং খরচই বেশি। ১০০ টাকার মধ্যে ২০ টাকাই বাইন্ডিং খরচ। শুধু লেখার মান নয়, দৃষ্টিনন্দন বই বা ভালো বাইন্ডিং না হলেও পাঠককে অনেক সময় টানে না। পাশাপাশি কাগজের দাম তো দিন দিন বাড়ছেই। বিপরীতে মান কমছে। ভালো মানের কাগজ না হলে বই নষ্ট হয়ে যায়। তবে একটি বইয়ের বেশি সংখ্যক কপি বেরুলে সেই খরচ কিছুটা কমে। কিন্তু বিক্রি হবে কিনা এমন শঙ্কা থেকে অনেক কম কপি বের করেন।


এদিকে চট্টগ্রামের প্রকাশনা শিল্পকে এগিয়ে নেয়ার জন্য পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন বলে মনে করেন শৈলী প্রকাশনার স্বত্বাধিকারী রাশেদ রউফ। তিনি বলেন, চট্টগ্রামের প্রকাশনা শিল্পের পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে আসতে পারে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনসহ চট্টগ্রামের বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত স্কুল ও কলেজগুলোর জন্য প্রতি বছর হাজার হাজার বই ক্রয় করা হয়। যদি অন্তত তার অর্ধেক চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত বই থেকে ক্রয় করা হয়, তাহলে চট্টগ্রামের প্রকাশনা শিল্পের সংকট অনেকটা লাঘব হতো। জেলা প্রশাসনও নিতে পারে অনুরূপ ব্যবস্থা।


উল্লেখ্য, আজ সোমবার বিকাল ৪টায় মেলার উদ্বোধন করবেন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। সভাপতিত্ব করবেন সিটি মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দীন। মেলা চলবে ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। প্রতিদিন বিকাল ৩টা থেকে রাত ৯টা ও ছুটির দিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সর্বসাধারণের জন্য মেলা উন্মুক্ত থাকবে। মুজিববর্ষ উপলক্ষে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিবেদন করা হয়েছে এবারের মেলা। এর আয়োজক চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। তবে চট্টগ্রামের সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদ, সাহিত্যিক, লেখক, বুদ্ধিজীবী এবং অন্যান্য শিল্প-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতরা সম্মিলিতভাবে এ মেলা বাস্তবায়ন করবেন। সম্মিলিত উদ্যোগে এবারের মেলাটি দ্বিতীয় আয়োজন।