চট্টগ্রামে পাসপোর্ট নিয়ে শনির দশা

Img

চট্টগ্রাম মহানগরীর বাসিন্দা শাহেদ (ছদ্মনাম) স্বপরিবারে থাকেন সুইডেনে। দুই সন্তান ও প্রসুতি স্ত্রীকে নিয়ে গত নভেম্বর মাসে দেশে আসেন অসুস্থ মাকে দেখতে। চলতি বছরের শুরুতে গর্ভকালীন মাঝামাঝি সময়ে স্ত্রীর বিমানে চড়া বিপদজনক ভেবে সুইডেনে ফেরা বিলম্বিত করেন তিনি। এরমধ্যে দেশে দেশে করোনা পরিস্থিতির অবনতি হলে মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ করে দেয় বাংলাদেশ। যে কারণে সুইডেনে ফেরা সম্ভব হয়নি তাদের। এরমধ্যে গত দুই সপ্তাহ আগে জন্ম নেয় তাদের তৃতীয় সন্তান। প্রথম দুই সন্তান জন্মগ্রহণ করে সুইডেনেই। বর্তমানে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হওয়ায় তাদের দ্রুত ফিরে যাওয়া জরুরি হয়ে পড়ে। নবজাতকসহ স্বপরিবারে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন তারা। কিন্তু বিপাকে পড়েছেন নবজাতকের পাসপোর্ট নিয়ে। কারণ সরকারি আদেশে গত ২ জুন থেকে বন্ধ রয়েছে সব ধরণের নতুন পাসপোর্টের আবেদন।

গত সোমবার দুপুরে নবজাতক শিশুর নতুন পাসপোর্টের জন্য মনসুরাবাদ বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসে যান শাহেদ। ওইসময় প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় তাঁর। নিজের নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘অসুস্থ মাকে দেখতে নভেম্বরে দেশে আসি। আমার স্ত্রী সন্তানসম্ভবা হওয়ায় যাওয়া হয়নি। জুনের তৃতীয় সপ্তাহে আমাদের তৃতীয় সন্তানের জন্ম হয়। এখন দ্রুত যাওয়া জরুরি। কিন্তু নবজাতকের পাসপোর্টের জন্য বিপাকে পড়তে হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘নতুন পাসপোর্টের জন্য আবেদনকারীর বায়োমেট্রিক তথ্য হিসেবে আঙুলের ছাপ এবং ছবি সংগ্রহের সময় অপারেটরের কাছাকাছি আসতে হয়। এতে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি থাকায় নতুন পাসপোর্টের আবেদন এখন গ্রহণ করা হচ্ছে না। তবে, নবজাতক শিশুর নতুন পাসপোর্টের জন্য পাসপোর্ট অফিসে আঙুলের ছাপ নেওয়া হয় না এবং ছবিও তোলা হয় না। তাই আমি নতুন পাসপোর্টের জন্য আবেদন করবো। আশা করি, যথাযথ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বিবেচনায় নেবেন।’

শুধু নতুন পাসপোর্ট আবেদন বন্ধ রয়েছে তা নয়। নতুন আবেদন কিংবা রিইস্যু পাসপোর্ট পাওয়া নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে প্রায় এক বছর ধরেই। মনসুরাবাদ বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিস ও পাঁচলাইশ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে তিন থেকে আট মাস আগে আবেদন করা প্রায় ২২ হাজার পাসপোর্ট মিলছে না। যেগুলো এখনো মুদ্রণ প্রক্রিয়াতে রয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছেন দেশে বেড়াতে আসা প্রবাসীরা। কারণ অনেকের পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়েছে করোনাকালেই। নির্ধারিত সময়ে পাসপোর্ট না পাওয়ায় ইমিগ্রান্টধারীও বিপাকে পড়ছেন। অন্যদিকে নতুন পাসপোর্ট না থাকায় চিকিৎসার জন্য বিদেশ যেতে পারছেন না দুরারোগাক্রান্তরাও। নতুন স্কলারশিপ পাওয়া, বিদেশে নতুন চাকুরি পাওয়া কিংবা বিদেশে অবস্থান করা পরিবার-পরিজনের কাছে যেতে পারছেন না অনেকেই। সবমিলিয়ে চট্টগ্রামে পাসপোর্ট নিয়ে শনির দশা কাটছেই না। করোনাকাল আরো দুর্ভোগ বাড়িয়েছে পাসপোর্ট সেবাপ্রার্থীদের।

সরকারি কর্মকর্তা আবু ছালেক। ছয় মাস আগে মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন। বেয়াইন অসুস্থতায় ভুগছেন। চিকিৎসক পরামর্শ দিয়েছেন তাকে ভারতের চেন্নাইয়ে নিয়ে যেতে। কিন্তু করোনাকালে সাধারণ ছুটির মধ্যে সময় পার করেছেন শারিরীক অনেক জটিলতার মধ্যেই। সাধারণ ছুটি উঠে যাওয়ার পর গত জুন মাসের শুরু থেকে মায়ের পাসপোর্টের জন্য ধরণা দিচ্ছেন রোগাক্রান্ত মহিলার ছেলে। কিন্তু নতুন আবেদন বন্ধ থাকায় কোন ফল না হওয়ায় দ্বারস্থ হন সরকারি কর্মকর্তা শ্বশুরের। আবু ছালেক নতুন জামাইয়ের মুখে হাসি ফুটাতে গিয়েছেন মনসুরাবাদ পাসপোর্ট অফিসে। তিনি আশা করেছিলেন, সরকারি চাকরিজীবী হওয়ার আবদারে হয়তো মিলবে নতুন পাসপোর্ট। সোমবার মলিন মুখে ফিরতে হয়েছে তাঁকেও। পটিয়ার ব্যাংক কর্মকর্তা রাশেদুল আলম। নতুন পাসপোর্টের জন্য জরুরি ফি ৬ হাজার ৯শ টাকা দিয়ে চান্দগাঁও পাসপোর্ট অফিসে আবেদন করেন ১৭ ফেব্রুয়ারি। ২৮ ফেব্রুয়ারি পাওয়া কথা থাকলেও সর্বশেষ ৫ জুলাই সকালে তিনি প্রতিবেদককের বলেন পাসপোর্ট না পাওয়ার কথা।

নগরীর সদরঘাটের বাসিন্দা নিয়াজ আহমেদের মেয়ে পরিবার নিয়ে থাকতেন উগান্ডায়। একমাত্র নাতির জন্ম উগান্ডার রাজধানী ক্যাম্পলায়। গত বছরের আগস্টে দেশে আসার পর রাষ্ট্রীয় সব নিয়ম মেনে ১৭ ডিসেম্বর নাতির বাংলাদেশি পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন। নিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি পাসপোর্টটি সরবরাহের কথা। কিন্তু ৭ মাসেও পাসপোর্টটি আসেনি। বেশ কয়েকবার পাসপোর্ট অফিসে যোগাযোগও করেছি। পরে ম্যাসেজ দিয়েছি। মুঠোফোনে ফিরতি এসএমএসে প্রিন্টিং প্রসেস-এ আছে জানানো হচ্ছে।’

এ বিষয়ে পাসপোর্ট অফিসের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, ‘যাবতীয় ফরমালিটিস শেষে পাসপোর্টটি কয়েকদিন আগে প্রিন্ট হয়েছে। ঢাকা থেকে আসলেই পাসপোর্টটি প্রদান করা হবে।’

সূত্রে জানা গেছে, করোনা প্রাদুর্ভাব এড়াতে ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটিতেও বন্ধ ছিল সব ধরণের পাসপোর্টের আবেদন গ্রহণ। সাধারণ ছুটি চলাকালীন ঢাকায় বন্ধ ছিল পাসপোর্ট মুদ্রণও। তবে সাধারণ ছুটি চলাকালীন সময়ে বিশেষ ক্ষেত্রে জরুরি প্রয়োজনীয় কিছু পাসপোর্ট প্রিন্ট দেওয়া হয় বলে জানায় পাসপোর্ট অফিস। অন্যদিকে ৩১ মে সরকারি অফিস আদালত খুললেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের নির্দেশনা মোতাবেক গত ২ জুন থেকে নতুন পাসপোর্ট আবেদন বন্ধ রয়েছে। রি-ইস্যু (নবায়ন) আবেদনের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় যাচাইয়ের নির্দেশনা দেওয়া হয় অধিদপ্তরের ওই আদেশে।

পাসপোর্ট অফিস সূত্রে জানা গেছে, নতুন আবেদন বন্ধ থাকলেও চট্টগ্রামের মনসুরাবাদ ও পাঁচলাইশ পাসপোর্ট অফিসে রি-ইস্যু আবেদন গ্রহণ করা হচ্ছে। জুন মাসে দুই অফিসে প্রায় দেড় হাজারের মতো আবেদন জমা পড়েছে। তবে করোনা প্রাদুর্ভাবের আগে গত বছরের অক্টোবর থেকে চলতি বছরের ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দুই অফিস মিলে প্রায় ২২ হাজারের মতো পাসপোর্ট মুদ্রণ প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এসব পাসপোর্ট এখনো আবেদনকারীদের সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি বলে জানান পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তারা।

পাঁচলাইশের চান্দগাঁও আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপ-পরিচালক মাসুম হাসান বলেন, চান্দগাঁও আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত ১২ হাজারের কাছাকাছি পাসপোর্ট এখনো প্রিন্ট হয়ে আসেনি। তবে জুন মাসে অনেক পাসপোর্ট এসেছে বলে জানান তিনি।

মনসুরাবাদ চট্টগ্রাম বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসের পরিচালক মো. আবু সাইদ বলেন, ‘স্বাভাবিক সময়ে সাধারণত মনসুরাবাদ পাসপোর্ট অফিসে নতুন ও রি-ইস্যু মিলে ৪-৫শ আবেদন জমা পড়ে। চট্টগ্রাম আঞ্চলিক অফিসেও একই পরিমাণ পাসপোর্ট আবেদন জমা পড়ে। এখন নতুন আবেদন বন্ধ থাকলেও প্রতিদিন ৩০টির মতো রি-ইস্যুর আবেদন জমা পড়ছে।’

তিনি বলেন, ‘বিদেশে বাংলাদেশ দুতাবাসে জমা পড়া দেড় লাখ প্রবাসীর পাসপোর্ট প্রিন্ট দেওয়া হয়েছে। দেশেও নিয়মিত পাসপোর্ট প্রদান করা হচ্ছে। মুদ্রণ জটিলতার কারণে কিছু পাসপোর্ট সরবরাহে বিলম্ব ঘটে থাকতে পারে। বিলম্বিত হওয়া পাসপোর্টের সংখ্যা তেমন বেশি নয়। জুন মাসেও প্রায় ৬ হাজার পাসপোর্ট প্রিন্ট হয়ে এসেছে বলে জানান এই কর্মকর্তা।

তিনি জানান, অনেকে পূর্ববর্তী তথ্য গোপন করে পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন, আবার পুলিশী প্রতিবেদন সঠিক সময়ে পাওয়া যায় না। এসব ক্ষেত্রেও পাসপোর্ট প্রদান বিলম্বিত হয়। কারণ “নো রিপোর্ট, নো পাসপোর্ট” বিধান রয়েছে আমাদের। নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত আবেদন করা দশ হাজারের কাছাকাছি পাসপোর্ট মুদ্রণ প্রক্রিয়ায় রয়েছে বলে জানান তিনি।

প্রতিক্রিয়া মন্তব্য শেয়ার