চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে ইটভাটায় পোড়ানো হচ্ছে বনের কাঠ

Img

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার ইট ভাটা গুলো অবৈধ ভাবে দিন দুপুরে পোড়াচ্ছে কাঠ। পরিবেশ ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া স্বত্বেও সরকারি নিয়ম নীতি না মেনে সম্প্রতি ইট ভাটা গুলোতে কয়লার পরিবর্তে কাঠ পোড়ানোর অভিযোগ করছে স্থানীয় জনগণ। কিন্তু প্রশাসনের কোন নজরদারি নেই। রয়েছে নিরব। যেন দেখে ও না দেখার ভাব।

নির্দিষ্ট ভাবে ১২০ ফুট চিমনির মাধ্যমে ইট পোড়ানোর নিয়ম থাকলেও দু’একটা ছাড়া কয়েকটি ইট ভাটা সেই নিয়মও মানছে না। ইতোপূর্বে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উপজেলায় ইট ভাটা গুলোতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে আর্থিক জরিমানা করা হয়। কিন্তু বাঁশখালীতে তেমন কোন অভিযান পরিচালনা দেখা যাইনি।

পরিবেশ নানা ভাবে হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়লেও এই ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ জোরালো কোন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়,বাঁশখালী ১ নং পুকুরিয়া ইউনিয়নের চা-বাগান সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকায় সরকারী নির্দেশনা অমান্য করে জিকজ্যাগের পরবর্তীতে গড়ে তোলা হয়েছে লম্বা চিমনির মেসার্স চৌধুরী ব্রীক নামের নবনির্মীত ইটভাটা। সে প্রশাসন কে বৃদ্ধা আঙ্গুল দেখিয়ে বাহারছড়ায় জন লোকালয়ে নব নির্মিত করে গড়ে তুলেছে নতুন আরো একটি ইটভাটা। যা সম্পূর্ন পরিবেশ সম্মত নয়। পাশাপাশি রয়েছে তার পুরাতন আরো একটি ইটভাটা।

তার পাশাপাশি ইলশা গ্রামে নুরুল আবচারের মালিকানাদ্বীন জনসম্মুখে রাস্তার পাশেই কৃষি জমিতে দিন দুপুরে বনের কাট ব্যবহার করে চালানো হচ্ছে এই ইটভাটা। এর আরো একটু পূর্বে পড়ে উঠেছে আরো একটি ইটভাটা। একে একে ২ কিলোমিটারের ব্যবধানে গড়ে উঠেছে ৪ টি ইটভাটা। তা ছাড়া সাধনপুর ইউনিয়নের লটমনি পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে তোলা হয়েছে ৩ টি ইটভাটা। চাম্বল-বড়ঘোনা সড়কের পাশেই মুন্সী খীল এলাকায় লোকালয়ে কৃষি জামিতে ১টি, শেখেরখীল- ছনুয়া সড়কে ১টি, বাঁশখালী পৌরসভার দক্ষিণ জলদী পাহাড়ের পাদদেশ রয়েছে একটি। তবে বর্তমানে সেটি মামলা সংক্রান্ত জটিলতায় বন্ধ রয়েছে।

অন্যদিকে বাঁশখালী সাতকানিয়া সীমান্তের চূড়ামণি এলাকায় ৪ টি ইটভাটা রয়েছে। বাঁশখালীর বাহারছড়ায় ৪ টি ইট ভাটার মধ্যে ১টিতে ১২০ফুট চিমনি থাকলেও অপর গুলোতে পুরাতন আমলের ড্রাম চিমনির মাধ্যমে ইট পোড়ানো হচ্ছে। ফলে আশেপাশের পরিবেশের চরম বিপর্যয় হচ্ছে বলে স্থানীয় ভাবে অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরিবেশ অধিদপ্তর বা জেলা প্রশাসনের কোনো অনুমোদন ছাড়াই এসব ইটভাটা গুলো গড়ে তুলেছেন। বাহারছড়া ইউনিয়নে ৩ কিলোমিটারের দূরত্বে কৃষি জমিতে রয়েছে ৩ টি ইটভাটা। আর এসব ইটভাটা গুলোর লাগোয়া রয়েছে কয়েক গ্রামের হাজার মানুষের বাস।

স্থানটি কোনোভাবেই ইটভাটা স্থাপনের জন্য উপযুক্ত নয়। ইট পোড়ানোর ফলে এই এলাকার জনস্বাস্থ্য যেমন হুমকির মুখে পড়ছে, তেমনি আশপাশের বনাঞ্চলও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একবার ইট পোড়াতে প্রায় চার হাজার মণ কাঠ পোড়াতে হয়। এসব কাঠ জোগাড় হচ্ছে আশপাশের সংরক্ষিত বন থেকেই। ফলে উজাড় হয়ে যাচ্ছে গাছপালা। কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ বাড়ছে। পরিবেশ হুমকির মুখে পড়ছে। প্রশাসনের নাকের ডগায় এমন ইটভাটা গুলো গড়ে উঠলেও তা নিয়ে কারও যেন কোনো মাথাব্যথা নেই।

শুধু বাহারছড়ায় নয়,এছাড়াও চাম্বল,জলদী, শেখেরখীল, পুকুরিয়াতে এভাবে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে অবৈধভাবে লোকালয় ও ফসলি জমিতে অনেক ইটভাটা গড়ে উঠেছে। এসব অবৈধ ইটভাটায় কয়লার পরিবর্তে ব্যবহার করা হচ্ছে কাঠ। একটা সময় এর পরিণাম হবে ভয়াবহ। পরিবেশদূষণ করে ও জনস্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলে যারা এভাবে ইটভাটা গড়ে তুলছে, তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে হবে। পরিবেশ আইন, ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন আরও কঠোর করা ও তার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

অবৈধ ইটভাটার মালিকরা দাবি করেছেন, তাঁদের পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উৎকোচ দিয়ে ইটভাটা চালু রাখতে হয়েছে। অবৈধ ইটভাটা চালু রাখার পক্ষে যুক্তি দিয়ে তাঁরা বলেন, শুরুতে তাঁরা ড্রাম চিমনি পদ্ধতির ভাটায় ইট পোড়াতেন। পরে সরকার ১২০ ফুট উঁচু চিমনি দিয়ে ইটভাটা তৈরির নির্দেশনা দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বেশির ভাগ ইটভাটা ১২০ ফুট উঁচু চিমনিতে রূপান্তরিত করা হয়।

সর্বশেষ সরকার নতুন এক নির্দেশনায় জিগজ্যাগ কিলন, হাইব্রিড কিলন, ভারটিক্যাল স্যাফট কিলন, টানেল কিলন পদ্ধতিতে ইটভাটা প্রস্তুতের নির্দেশনা জারি করে। তবে তারা সেই নীতিমালা মানছে না। কারণ, এরই মধ্যে সব ভাটায় ইট পোড়ানো শুরু হয়ে গেছে। আগামী মার্চ পর্যন্ত চলবে ইট পোড়ানো। এরপর মাত্র তিন মাসে কোনো অবস্থায়ই ইটভাটা রূপান্তরিত করা যাবে না। কয়লার পরিবর্তে কাঠ পোড়ানোর ফলে দিন দিন বৃক্ষ শূন্য হয়ে পড়ছে পরিবেশ ও বনাঞ্চল। একটি গ্রুপ পাহাড়ি মাটি কেটে ইট ভাটা গুলোতে সরবরাহ করছে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে। এদিকে পাহাড় থেকে মাটি কেটে ইট ভাটা গুলোতে নিয়ে আসার ফলে দিন দিন বিনষ্ট হচ্ছে পাহাড়ি ভূমি।

ইট ভাটা গুলোতে কয়লার পরিবর্তে কাঠ ব্যবহার সম্পর্কে জানতে চাইলে ইট ভাটার মালিকগণ কয়লার সংকটের কারণে কাঠ ব্যবহার করা হচ্ছে বলে দাবী করেন। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়লার চেয়ে কাঠের দাম কম হওয়ায় ইট ভাটা গুলোতে প্রতিনিয়ত বেপরোয়া ভাবে পোড়াচ্ছে অবৈধ কাঠ অন্য দিকে নবনির্মিত ভাবে বাহারছড়ার ইলশা গ্রামে ধানি জমিতে প্রশাসনকে বৃদ্ধা আঙ্গুলি দেখিয়ে তৈরি করেছে অবৈধ ইটভাটা।

এ নিয়ে এলাকার সাধারন জনগনের পাশাপাশি স্থানীয় বারক আলী তালুকদার মসজিদ কমিটি সহ জমির মালিকগনের পক্ষে আব্দুল করিম, নেছার আহমদ, সিরাজ আহমদ, মাওলানা আইয়ুব আলী, নজমুল হক, হাফেজ আহমদ রশিদ, সরোয়ার আলম ও হাফেজ এনামুল হক বাদী হয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইটভাটা তৈরির কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দিলেও পরবর্তীতে এই আদেশ অমান্য করে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

এ ব্যাপারে অভিযুক্ত ইটভাটার মালিক মর্তুজা আলীর সঙ্গে মুটোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। চাম্বল বনবিট কর্মকর্তা শেখ আনিসুজ্জামান বলেন,সরকারী নিয়ম অনুযায়ী ইটভাটাগুলোতে পাহাড় কাটা ও কাঠ পোড়ানো সম্পূর্ণ ভাবে নিষেধ রয়েছে। তবে পরিবেশ বান্ধব নিয়ম অনুসারে ইটভাটা হলে বন বিভাগের কোন আপত্তি নাই।যে সমস্ত ইটভাটা পরিবেশ বান্ধব নিয়ম না মেনে পাহাড়ি মাটি বা কাট ব্যবহার করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।ইতিমধ্যে কেউ যাতে পাহাড় থেকে মাটি ও কাঠ না কাটে সেই জন্য কঠোর ভাবে নজরদারীতে রাখা হয়েছে। তবে নিয়ম বহির্ভূত কোন অভিযোগ পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, বিগত কয়েকবছর আগে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি উপজেলায় অভিযান করতে গিয়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের অবরোধের মুখে পড়ে। পরে অনেক দেনদরবার করে সে যাত্রায় আর অভিযান পরিচালনা করা সম্বভ হয়না। অভিযান না চালানোর জন্য রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের চাপ ও রয়েছে অনেক ক্ষেত্রে।

বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোমেনা আক্তার বলেন, পরিবেশবান্ধব ইটভাটা তৈরিতে কোন বাধা নাই। তবে পাহাড়ি থেকে কাটা মাটি ও কাট পড়ানোর কোন নিয়ম নাই।যদি কেউ এই নিয়ম না মেনে চলে তদন্ত পূর্বক তাদেরকে ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ লক্ষ টাকার জরিমানা করা হবে।

তিনি আরো বলেন, ‘অবৈধ ইটভাটা এবং কাঠ পোড়ানোর বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর সতর্ক নজরদারি, নিয়মিত অভিযান চালানো এবং ইটভাটা মালিকদের সচেতন করা হয়েছে।যে সব ইটভাটায় অবৈধ ভাবে পাহাড়ী কাঠ পুড়িয়ে যাচ্ছে তাদের কে শিগ্ররই আইনের আওতায় আনা হবে। যে বা যারা আইন অমান্য করবে তাদের কে কোন ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।

পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর ইটভাটা গুলো শিগগিরই বন্ধ করে দেওয়া হবে। ২০১৩ সালের ৫৯ নম্বর আইনে ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন-সংক্রান্ত কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ-সংক্রান্ত্র আইনের ৪ নম্বর ধারায় লাইসেন্স ব্যতীত ইট ভাটা তৈরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, ‘আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, ইটভাটা যে জেলায় অবস্থিত সেই জেলার জেলা প্রশাসকের নিকট হইতে লাইসেন্স গ্রহণ ব্যাতিরেকে, কোনো ব্যক্তি ইটভাটায় ইট প্রস্তুত করিতে পারিবেন না।

প্রতিক্রিয়া মন্তব্য শেয়ার