দেশে বছরজুড়ে যে আত্মহত্যার ঘটনাগুলো ঘটে সেসবের মাত্র কয়েকটি গণমাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টি করে। আর অন্য ঘটনাগুলোর খবর আসলেও তা তেমন চোখে পড়ে না। গণমাধ্যমগুলোতে শহরের আত্মহত্যার ঘটনাগুলো একটু বেশি জায়গা পেলেও গ্রামেই আত্মহত্যার হার বেশি।

২০১৮ সালে সংঘটিত আত্মহত্যার সংখ্যা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শহরের তুলনায় গ্রামে আত্মহত্যা বেশি হয়। সমাজ গবেষকরা বলছেন, শহুরে ছেলে-মেয়েদের তুলনায় গ্রামের ছেলে-মেয়েদের চলাফেরা ও বিচরণের ক্ষেত্র সীমিত। এছাড়া গ্রামীণ পরিবারগুলোতে এখনও প্রবীণদের সঙ্গে নবীনদের আলোচনার সুযোগ না থাকার কারণে আত্মহত্যার হার বেশি। সামাজিক ও মানসিক চাপ এবং অপবাদের ঝুঁকিতেও এ ধরনের ঘটনা ঘটে।

এ বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের প্রথম সারির তিনটি দৈনিকে আত্মহত্যার খবর প্রকাশিত হয়েছে ৫০৮টি। এরমধ্যে ২৭৪ জন নারী ও ২৩২ জন পুরুষ। এরমধ্যে মহানগরী এলাকায় ৫৩ জন, শহুরে এলাকায় ১১৫জন এবং গ্রামে ২১৭জন আত্মহত্যা করেছেন। সংবাদগুলো বিশ্লেষণে দেখা যায়, আত্মহত্যা বেশি ঘটেছে গ্রাম এলাকায় এবং ধরন হিসেবে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার সংখ্যা বেশি।

আত্মহত্যার প্রবণতা নিয়ে শিশু অধিকার বিষয়ে কর্মরত সেভ দ্য চিলড্রেনের ডিরেক্টর (চাইল্ড প্রোটেকশন অ্যান্ড চাইল্ড রাইটস গভর্নেন্স) আবদুল্লাহ আল মামুন এর ভাষ্য মতে, এখনও আমাদের গ্রামগুলোতে পারস্পরিক যোগাযোগ ও বন্ধন প্রবল। ফলে অনাকাঙ্খিত কোনও কিছু ঘটলে তা নিয়ে "লোকলজ্জা" বা এ বিষয়ক মানসিক চাপটা শহরের তুলনায় গ্রামে অনেক বেশি। শহরে একে অন্যের সঙ্গে পরিচয় সীমিত বলে, যে কেউ অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতিতে পড়লেও নিজেকে আড়াল করা সুযোগ পায়, যা গ্রামে সম্ভব নয়। বরং পরিচিত গ্রামীণ বলয়ে প্রতিটি ঘটনা অনেক ডালপালা গজিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পরে। এর ফলে অনেক সময় কিশোর-কিশোরীরা এই পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে আত্মহননের মত অগ্রহণযোগ্য পথ বেছে নেয়।

এছাড়া শহুরে ছেলে-মেয়েদের তুলনায় গ্রামের ছেলে-মেয়েদের চলাফেরা ও বিচরণের ক্ষেত্র সীমিত হওয়ায়, অনেক বিষয়ে তারা অন্যদের সহযোগিতা নিতে পারে না। কারও সঙ্গে একান্ত বিষয় নিয়ে কথা বলতে পারে না। গ্রামীণ পরিবারগুলোতে এখনও প্রবীণদের সঙ্গে নবীনদের খোলামনে আলোচনার সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। এসব কিছু মিলিয়ে দেখা যায় গ্রামীণ কিশোর-কিশোরীরা শহরের তুলনায় অনেক বেশি সামাজিক ও মানসিক চাপ এবং অপবাদের ঝুঁকিতে থাকে।’

মনোরোগ বিশ্লেষক মেখলা সরকার এর মতে সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো থেকে এক ধরনের সিদ্ধান্তে আমরা আসতে পারি যে, গ্রামের মানুষ আবেগতাড়িত হয়ে আত্মহত্যা বেশি করে। হঠাৎ রাগ হলো কিংবা কষ্ট পেলো, এসময় হাতের কাছে বিষ থাকলে খেয়ে ফেলা বা গলায় ফাঁস লাগানো। এই প্রবণতা গ্রামে বেশি। নানাবিধ কারণেই গ্রামে কিটনাশক হাতের নাগালে থাকে বলে ঘটনা বেশি ঘটে থাকতে পারে।’

আরেকটি কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘কোনও কারণে চাপ হলে, কষ্ট আসলে সেটিকে শক্তভাবে মোকাবিলা করা গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামের মানুষের মধ্যে বঞ্চনা বেশি, মেয়েদের অবস্থানও তুলনামূলক নাজুক। এ কারণ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে না পেরেও তারা এমন পথ বেছে নেয়।’

অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতার কারণে গ্রামে আত্মহত্যার হার বেশি বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক জোবাইদা নাসরিন। তিনি মনে করেন কেবল হতাশা থেকে এ ধরনের ঘটনা ঘটে তা নয়, অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতা আত্মহত্যার পরিস্থিতিও তৈরি করে দেয়। আর এর জন্য সবচেয়ে ভয়াবহভাবে দায়ী যৌতুক প্রথা। যৌতুক নির্যাতনের শিকার হয়ে অনেক নারী আত্মহত্যা করে থাকে এবং সেটি গ্রামেই বেশি হয়।’

সূত্র: ১ জানুয়ারি থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনটি দৈনিকে প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা।