কোরবানি ইসলামের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও ত্যাগের স্মারক। কোরবানি আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ হলো ত্যাগ, উৎসর্গ, নিকটবর্তী হওয়া ইত্যাদি। পরিভাষায় আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের আশায় নির্দিষ্ট সময়ে বিশেষ পশুকে জবাই করাকে কোরবানি বলা হয়। মহান আল্লাহ তার নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাগণকে বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করে থাকেন। এ ধরনের বান্দারা যে কোন কঠিনতর পরীক্ষায় অনায়াসে সফলতা লাভ করেন। যা পরবর্তীতে কালের পর কালের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকে।

আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর পূর্বে এ ধরনের এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলেন জলিলুল কদর পয়গম্বর হযরত ইবরাহিম (আ.)। এর পূর্বে তার থেকে যতগুলো পরীক্ষা নেয়া হয়েছিল সকল পরীক্ষায় তিনি সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। আর এবারের পরীক্ষাটা হলো অগ্নি পরীক্ষা। দীর্ঘ ৮৬ বছর বয়স পর্যন্ত নিঃসন্তান ছিলেন হযরত ইবরাহিম (আ.)। সন্তানের জন্য আল্লাহার কাছে তিনি দোয়াও করেন।

আল্লাহতায়ালা তার ভাষাটা কোরআন শরিফে বলেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে এক সৎ পুত্র দান কর। এরপর আমি তাকে এক সহনশীল পুত্রের সুসংবাদ দান করলাম’। (সূরা সাফফাত, ১০০-১০১)

ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য যে কোন ত্যাগ স্বীকার করতে সব সময়ই প্রস্তুত ছিলেন। তাই আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে স্বপ্নযোগে নির্দেশ আসলো নিজের ভালোবাসার সন্তানকে কোরবানি দিতে, যে সন্তান বৃদ্ধ বয়সের একমাত্র সম্বল। এই সেই সন্তান যাকে আল্লাহর নির্দেশে শিশু অবস্থায় আল্লাহর ঘরের (কাবার) নিকটবর্তী জনমানবহীন এলাকায় নির্বাসন দিয়েছিলেন। সেই সন্তান যখন বড় হয়ে চলাফেরা করতে শিখেছে তখন আল্লাহতায়ালা বললেন তাকে কোরবানি দিতে হবে।

আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘এরপর যখন সে তার পিতার সাথে চলাফেরার বয়সে পৌঁছে, তখন ইবরাহিম (আ.) বললেন, হে বৎস! আমি স্বপ্ন দেখেছি যে তোমাকে আমি জবাই করছি। এখন তোমার অভিমত কী? তিনি (ইসমাইল) বললেন, হে আমার পিতা আপনি যা আদিষ্ট হয়েছেন তাই করুন। আল্লাহ ইচ্ছা করলে আপনি আমাকে ধৈর্য্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন। যখন পিতা-পুত্র উভয়েই আনুগত্য প্রকাশ করল এবং ইবরাহিম (আ.) তাকে জবাই করার জন্য কাত করে শুইয়ে দিলেন। (সূরা সাফফাত: ১০২-১০৩)

ইবরাহিম (আ.) আপন ছেলেকে কোরবানি দিতে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেলেন। কিন্তু আল্লাহতায়ালার পক্ষ হতে ফয়সালা হলো ভিন্ন ধরনের। কেননা আল্লাহতায়ালা তো সকলের মনের খবর জানেন। তিনি চেয়েছিলেন পরীক্ষা নিতে। আর সন্তান হলো আল্লাহ প্রেমের পরীক্ষার একটি মাধ্যম। আর তাই আল্লাহতায়ালা ছেলের পরিবর্তে বেহেশত থেকে একটি দুম্বা পাঠিয়ে দেন। ছেলে অক্ষত রয়ে গেল আর দুম্বাটি কোরবানি হয়ে গেল। আল্লাহ বলেন, ‘তখন আমি তাকে আহ্বান করে বললাম, হে ইবরাহিম তুমি তো স্বপ্নাদেশ সত্যিই পালন করলে। (সূরা সাফফাত: ১০৪-১০৫)

হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, এই দুম্বা ছিল হযরত আদম (আ.) ছেলে হাবিলের দেয়া কোরবানি। যা আল্লাহতায়ালা কবুল করেছিলেন। এই দুম্বাটি বেহেশতের বাগানে চল্লিশ বছর লালিত পালিত হয়েছিল। এজন্য আল্লাহতায়ালা এ কোরবানিকে ‘জিবহে আযিম’ বা মর্যাদাবান কোরবানি নামে অভিহিত করেছেন। হযরত জিবরাইল (আ.) এসে বললেন এটি আপনার ছেলের পরিবর্তে উৎসর্গকৃত।

বিশ্ব মুসলিমের বছরে ঈদগুলোর মধ্যে ঈদুল আযহা একটু ভিন্নতর ঈদ বা খুশির দিন। এ দিনটি হলো আত্ম উৎসর্গের খুশি উদযাপন করার দিন। কোরবানির পশু জবাই করা একটি প্রতীকি ব্যাপার।

কোরবানির প্রকৃত স্বার্থকতা হলো কোরবানি দাতার কুপ্রবৃত্তি বিসর্জন দেওয়ার মধ্যে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে যে কোন ধরনের ত্যাগ স্বীকার করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখার মধ্যে। মূলত আল্লাহতায়ালা যে বান্দাকে বেশি পছন্দ করেন তাকে বেশি বেশি করে পরীক্ষায় ফেলেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি অবশ্যই তোমাদের কয়েকটি বস্তু দ্বারা পরীক্ষা করব। ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি এবং ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও ধৈর্য্যশীলদের’। (সূরা বাকারা: ১৫৫)

তাই মুমিন বান্দাহ দুনিয়ার যাবতীয় ঘটনাবলীকে আল্লাহর ওপর সোপর্দ করবে। কোন কাজকর্মের মধ্যে রিয়া বা লোক দেখানো থাকতে পারবে না। যেমন কোরবানির মাসে আমাদের মাঝে অনেকেই বেশি বেশি দামে গরু ক্রয় করে এক প্রকার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। অহংবোধ নিয়ে তৃপ্তি পায়। ফলে মানুষ পশু কোরবানি দিচ্ছে ঠিকই কিন্তু তার ভেতরের হাইওয়ানি বা পশুত্বমূলক স্বভাব পরিবর্তন হচ্ছে না। আল্লাহতায়ালা দেখেন কোরবানিদাতার নিয়তের মধ্যে কতটুকু বিশুদ্ধতা রয়েছে। কোরবানিদাতা কোরবানির পশু জবাই করার সময় কোরআনের একটি আয়াত পাঠ করে থাকেন। আল্লাহ বলেন, ‘ইন্নাসালাতি ওয়ানুসুকিওয়া মাহয়ায়া ওয়া মামাতি লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন’। অর্থাৎ, ‘আমার সালাত, আমার কোরবানি, আমার জীবন, আমার মরণ বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহতায়ালার জন্য নিবেদিত’। (সূরা আনআম: ১৬৩)

মুমিন বান্দাহ যদি নিজেকে সর্বক্ষণ আল্লাহর সামনে উপস্থিত রাখতে পারে তাহলে তার পক্ষে কোন দিন সম্ভব হবে না আল্লাহর বিধানের বিপক্ষে যাওয়ার। সে কোন দিন শয়তানের অনুসরণ করতে পারবে না। কোরবানির পশু ক্রয় করার সময় হালাল টাকা দিয়ে কিনতে হবে। তখনই সেটি ইবাদত হবে। না হয় রীতি উদযাপন হবে কিন্তু সাওয়াব লাভের উপায় হবে না।

হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত প্রিয় নবী (সা.) এরশাদ করেছেন, আদম সন্তানের জন্য কোরবানির দিনগুলোয় কোরবানি তথা রক্ত প্রবাহ ব্যতীত আল্লাহর কাছে কোন কাজই প্রিয় নয় এবং নিশ্চয় কিয়ামতের দিন এ পশু আপন শিং, পশম ও খুরসহ আসবে। আর কোরবানির পশুর রক্ত জমিতে পতিত হওয়ার আগেই আল্লাহর কাছে কবুল হয়ে যায়। (তিরমিযি)

সুতরাং কোরবানির বিষয়টি আল্লাহর কাছে কত প্রিয় তা বর্ণনার অপেক্ষা রাখে না। পরবর্তী সকল নবী রাসূল কোরবানির মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করেছিলেন। হযরত আদ (আ.) পৃথিবীর প্রথম নবী ও প্রথম মানুষ। তার আমলেই কোরবানির গোড়াপত্তন হয়। আল্লাহ বলেন, ‘তুমি তাদেরকে শুনিয়ে দাও আদমের দুই পুত্রের বিবরণ। যখন তারা কোরবানি করেছিল তখন তাদের একজনের কোরবানি কবুল করা হয়েছিল এবং অপরজনের কোরবানি কবুল করা হয় নি। সে বলল, আমি অবশ্যই তোমাকে হত্যা করব, অন্য জন বলল, আল্লাহ একমাত্র পরহেযগারদের কোরবানি কবুল করেন’। (সূরা সায়েদাহ: ১৮৩)
মূলত আদম সন্তানদের মধ্যে হাবিল অত্যন্ত আগ্রহ সহকারে আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের আশায় একটি দুম্বা কোরবানি হিসেবে পেশ করেন এবং এটিই আল্লাহর দরবারে কবুল হয়। পক্ষান্তরে অন্য সন্তান কাবিল অমনোযোগী ও উদাসীনভাবে কিছু খাদ্য শস্য কোরবানি হিসেবে পেশ করেন। ফলে তা কবুল হয় নি।

হযরত মুসা (আ.) এর সম্প্রদায়ের মধ্যেও কোরবানির প্রচলন ছিল। মুসা (আ.) এর সম্প্রদায় বনী ইসরাইলদেরকে সম্বোধন করে আল্লাহ বলেন, ‘আর স্মরণ কর যখন মুসা নিজ সম্প্রদায়কে বলেছিল আল্লাহ তোমাদেরকে একটি গরু জবেহ করার আদেশ দিয়েছেন। তারা বলেন, তুমি কি আমাদের সাথে ঠাট্টা করছ? মুসা (আ.) বললেন, আল্লাহর আশ্রয় নিচ্ছি যাতে আমি অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত না হয়।
(সূরা বাকারা: ৬৭)

কোরবানির মাধ্যমে সকল যুগের উম্মতগণ আল্লাহতায়ালার একত্ববাদের স্বীকৃতি দিয়ে আসছিল। ফলে কোরবানি হলো আল্লাহকে স্মরণ করার এবং আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার একটি বাহন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘প্রত্যেক উম্মতের ওপর আমি কোরবানির বিধান রেখেছিলাম, যাতে তারা এ পশু জবাই করার সময় আল্লাহর নাম স্মরণ করে, এজন্য যে, তিনি চতুষ্পদ জন্তু থেকে তোমাদের জন্য রিযিক নির্ধারণ করেছেন। অতএব তোমাদের প্রভু তো কেবল একজনই, অতএব তারই জন্য আত্মসমর্পণ কর আর বিনয়ীদের সুসংবাদ দাও’। (সূরা হজ: ৩৪)

সুতরাং মুমিন বান্দা পশু কোরবানি দিয়ে আল্লাহতায়ালাকে বেশি বেশি স্মরণ করে এবং এর মাধ্যমে আল্লাহর সামনে আত্মসমর্পণের স্পৃহা জাগ্রহ হয়। মানুষ বিনয় প্রকাশ করে। যে মানুষ আল্লাহর সামনে যত বেশি বিনয়ী হবে সে তত বেশি মর্যাদা লাভ বুঝতে পারবে। সাথে সাথে ইমানদারগণ আত্ম উৎসর্গের চেতনায় নিজেকে উজ্জীবিত করতে পারবে। কোরবানির পশুর মাংসগুলো আল্লাহর কাছে কোন প্রয়োজন নেই বরং তাকে তিন ভাগ করে এক ভাগ নিজের এক ভাগ আত্মীয়-স্বজনের এবং অন্য ভাগ গরিবদের জন্য দান করতে হয়।

আল্লাহতায়ালা বলেন, কখনও কোরবানির পশুর গোশত ও রক্ত আল্লাহতায়ালা গ্রহণ করেন না নিঃসন্দেহে তিনি এর মাঝে বান্দার তাকওয়া দেখেন’। (সূরা হজ: ৩২)

আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন করতে হলে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের মানসিকতা কোরবানির মাধ্যমে আমরা পেতে পারি। যেমন আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত কোন কল্যাণ বা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের সর্বাধিক প্রিয় বস্তু তার কারণে ব্যয় করতে পারবে না’। (সূরা আল ইমরান: ৯২)

কোরবানির পশু জবাই দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ লাভের অন্যতম মাধ্যম। কোরবানির প্রাণিটি কোরবানিদাতার জন্য পুলসিরাত পার হওয়ার বাহন হবে। হযরত যায়েদ বিন আরকাম (রা.) থেকে বর্ণিত নবী করিম (সা.) বলেছেন, কোরবানিকৃত পশুর প্রত্যেক পশমের বিনিময়ে নেকী রয়েছে। সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করলেন, (উট, গরু, মহিষ, দুম্বা, ভেড়া) পশমেরও? তিনি বললেন, প্রতিটি পশমের বিনিময়ে নেকী রয়েছে। (মিশকাত, পৃ.: ১২৯)

কোরবানির মাধ্যমে মানুষ নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করে আল্লাহর কর্তৃত্বকে মেনে নেয়। যাবতীয় পাপ, হারাম, কুফর, অহংকার ও আমিত্বকে বিসর্জন দেয়ার মানসিকতা তৈরি করতে পারলেই কোরবানির প্রকৃত সফলতা।

লেখক: মাওলানা মুহাম্মদ মুনিরুল হাছান, সহকারী শিক্ষক, (ইসলাম শিক্ষা), চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল, চট্টগ্রাম।