কোটা সংস্কার আন্দোলনে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা

তানজির হাসান | বিশেষ প্রতিবেদক : এপ্রিল ১৯, ২০১৮

এএফপি, ফক্স নিউজ, ডেইলি মেইল, এনডিটিভি, ডন, ইয়াহু নিউজসহ

এএফপি, ফক্স নিউজ, ডেইলি মেইল, এনডিটিভি, ডন, ইয়াহু নিউজসহ বিশ্বের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমগুলো কোটা সংস্কার আন্দোলনকে যথেষ্ট গুরুত্বের সাথে কভারেজ দিয়েছে।


সাম্প্রতিক কোটা সংস্কার আন্দোলনে মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়ে গেছে। আন্দোলন চলাকালীন আন্দোলনকারীদের অনেকেই মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার বিরুদ্ধে আন্দোলনকে যথেষ্ট কভারেজ না দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন, যা অনেকাংশেই সত্যি।

এ দেশের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কতটুকু তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে এই আন্দোলন। কোটা সংস্কার আন্দোলন এ বছরের শুরু থেকেই মোটামুটি জোরেশোরে চলে আসছিল। আন্দোলনকারীরা পর পর বেশ কয়েকটি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করেন যার মধ্যে ছিল মানববন্ধন, ঝাড়ু দিয়ে রাস্তা পরিষ্কার ইত্যাদি। কিন্তু প্রচলিত সংবাদমাধ্যমে এ ব্যাপারে সামান্যই প্রকাশ পায়।

৮ এপ্রিল শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলন যখন চূড়ান্ত মাত্রা লাভ করে তখন আর মিডিয়ার পক্ষে এটাকে অগ্রাহ্য করার উপায় ছিল না। কিন্তু তারপরও যতটুকু কভারেজ পাওয়ার কথা ছিল আন্দোলনটি ততটা কভারেজ পায়নি, কোনো কোনো টিভি চ্যানেল এবং পত্রিকা কর্তৃক আন্দোলনকে ভুলভাবে উপস্থাপনের চেষ্টাও দেখা গেছে।

ফলে একদিকে যখন আন্দোলনকারী ছাত্র-ছাত্রীরা দেশের অধিকাংশ স্থানে অবরোধ করে রেখেছিল, অন্যদিকে মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার ওপর নির্ভরশীল অনেক সাধারণ মানুষ জানতেই পারেনি কেন এই আন্দোলন কিংবা কোটা সংস্কার কেন জরুরি। এই দায় মেইনস্ট্রিম মিডিয়া এড়াতে পারে না।

একদল চক্রান্তকারী ওঁত পেতে বসে ছিল আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে। সেজন্য অনেক গুজব রটানো হয়েছে, আন্দোলনকারীদের উস্কে দিয়ে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে। আন্দোলনকারী সাধারণ শিক্ষার্থীরা চক্রান্তে পা দেয়নি, যা প্রশংসার দাবি রাখে। অথচ যদি মেইনস্ট্রিম মিডিয়া বলিষ্ঠভাবে দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হতো তাহলে গুজব রটানো এতো সহজ হতো না।

সঠিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ধোঁয়াশার সুযোগ নিয়েই গুজব রটানো হয়, আর ধোঁয়াশা তখনই তৈরি হয় যখন সাধারণ মানুষের নিকট পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিক তথ্য না থাকে। এখানেই মিডিয়ার অনেক বড় দায়িত্ব। সঠিক তথ্য দেওয়াটা তাদের দায়িত্ব ছিল, যেটা তারা অনেকক্ষেত্রেই পালন করেনি।

৮ এপ্রিল সন্ধ্যা থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থী এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মুখোমুখি অবস্থানে ছিল। ভোর ৪টার দিকে লক্ষ্য করলাম ব্রডব্যান্ড কানেকশন কিংবা মোবাইল ডাটা কোনটাই কাজ করছে না। সেই মুহূর্তে খুবই আতঙ্কিত লাগছিল। ওদিকে টিভি চ্যানেলগুলোতেও তেমন কোনো আপডেট নেই।

৯ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে মোবাইল ডাটা পুনরায় কাজ করতে শুরু করায় জানতে পারলাম আরো অনেকেই এই সমস্যা ফেস করেছেন। আমরা যখন কি হচ্ছে এ ব্যাপারে অন্ধকারে ছিলাম তখন শিক্ষার্থীদের ওপর টিয়ারশেল নিক্ষেপ করা হচ্ছিল, লাঠিচার্জ করা হচ্ছিল।

এই ৩-৪ ঘণ্টার কমিউনিকেশন গ্যাপের ফলে প্যানিক থেকে অনেক বড় অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারতো। সৌভাগ্য বলতে হবে যে এমন কিছু হয়নি। কিন্তু যদি সংবাদমাধ্যমের প্রতি আমাদের আস্থা থাকতো এবং সংবাদমাধ্যম তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতো তাহলে জনমনে প্যানিক তৈরি হতো না।

এটা খুবই পরিষ্কার যে আমাদের সংবাদমাধ্যম স্বাধীন নয়, এটি অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত। সংবাদমাধ্যম এবং সংবাদমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণকারীরা এই আন্দোলন থেকে একটি বার্তা নিতে পারে। সেটি হচ্ছে, সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে আপনি যত চেষ্টাই করেন তথ্য প্রবাহ আটকাতে পারবেন না। সংবাদমাধ্যমের নিষ্ক্রিয়তার বিপরীতে সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্মগুলো এই আন্দোলনকে চাঙা রাখতে সহায়তা করেছে।

সারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তের আন্দোলনকারীদের মধ্যে যোগাযোগ, তথ্য বিনিময়, এবং নির্দেশনা সম্ভব হয়েছে ফেসবুকের কল্যাণে। ফেসবুক লাইভের সাহায্যে অনেকেই আন্দোলনের লাইভ আপডেট দিয়েছেন, যা সংবাদমাধ্যমের বিকল্প হিসেবে কাজ করেছে।

সুফিয়া কামাল হলে ছাত্রীদের নির্যাতনের খবর সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন হল থেকে মিছিল নিয়ে সুফিয়া কামাল হলের সামনে জড়ো হয়। এরকম তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধের জন্য ৫ বছর আগেও হয়তো মেইনস্ট্রিম সংবাদমাধ্যমের জোরালো ভূমিকার প্রয়োজন পড়তো, এখন আর সেই নির্ভরশীলতা নেই।

আবার দেশীয় সংবাদমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে আপনি কিভাবে আটকাবেন? এএফপি, ফক্স নিউজ, ডেইলি মেইল, এনডিটিভি, ডন, ইয়াহু নিউজসহ বিশ্বের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমগুলো কোটা সংস্কার আন্দোলনকে যথেষ্ট গুরুত্বের সাথে কভারেজ দিয়েছে।

তবে আন্দোলন চলাকালীন সংবাদকর্মীদের কয়েকটি পজিটিভ ভূমিকার কথা উল্লেখ করতেই হবে। একটা ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়াতে  ভাইরাল হয়েছে যেখানে দেখা যাচ্ছে যে পুলিশ একেকজন আন্দোলনকারীদের ধরে নিয়ে যাওয়ার পথে সংবাদকর্মীরা প্রত্যেক আন্দোলনকারীর নিকট থেকে নাম পরিচয় জেনে নিচ্ছেন। এর একটা উদ্দেশ্য অবশ্যই সংবাদ সংগ্রহ, কিন্তু আরেকটা উদ্দেশ্য হতে পারে ট্র্যাক রাখা।

আবার মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড কেন্দ্রিয় কমিটির সভাপতি মেহেদি হাসান যখন আন্দোলনকারীদের গায়ে হাত দেন তখন উপস্থিত সংবাদকর্মীরা তাকে প্রশ্নবানে জর্জরিত করেন। পরে পুলিশ তাকে সরিয়ে নিয়ে তোপের মুখ থেকে রক্ষা করে। যা থেকে প্রমাণ হয় কিছু ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক চাপে সমঝোতা করলেও সংবাদকর্মীরা কোনটা উচিত আর কোনটা অন্যায় এ ব্যাপারে পূর্ণমাত্রায় সচেতন। 

আগামী দিনগুলো এ দেশের সংবাদমাধ্যমের জন্য নিরপেক্ষতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসছে। কোটা সংস্কার আন্দোলন দেখিয়ে দিয়েছে যে, যৌক্তিক দাবি আদায়ের আন্দোলন কখনো সংবাদমাধ্যমের আশায় বসে থাকে না, বিকল্প তৈরি হয়ে যাবেই।

এই আন্দোলনে প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকার কারণে একটি নির্দিষ্ট টিভি চ্যানেলকে (সঙ্গত কারণেই নাম উল্লেখ করছি না) বর্জনের আহ্বান জানিয়ে আন্দোলনকারীদের অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। আর একবার যদি কেউ বিশ্বাসযোগ্যতা হারায় তবে তা পুনরুদ্ধার কতটা কঠিন সে কথা কি টিভি চ্যানেল এবং পত্রিকাগুলো ভাবছে?

মিডিয়াকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে কোনটা তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, লেজুড়বৃত্তি করে নিজেদের সেফজোনে রাখা নাকি মেজরিটি পাবলিক সেন্টিমেন্ট মাথায় রেখে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করা। তবে এটুকু নিশ্চিত যে, মিডিয়া যদি তার মেরুদণ্ড সোজা রাখতে পারে তবে প্রয়োজনে হিতাকাঙ্ক্ষীর অভাব হবে না।

 

[প্রকাশিত লেখা ও মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। "প্রবাসীরদিগন্ত ডট কম" লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রবাসীরদিগন্ত ডট কমের সম্পাদকীয় নীতির মিল নাও থাকতে পারে।]

তথ্য:

বিভাগ:

প্রকাশ: এপ্রিল ১৯, ২০১৮

প্রতিবেদক: তানজির হাসান

পড়েছেন: 647 জন

মন্তব্য: 0 টি