কুমিল্লায় আনোয়ারের হলুদ তরমুজ চাষ করে কৃষিতে বিপ্লব

Img

ছোটকালে ইচ্ছে ছিল পড়াশুনা করে এমন অফিসার হবো যাতে সারা দেশের মানুষ আমাকে এক নামে চিনে। কিন্তু দারিদ্রের কষাঘাতে নিমজ্জিত বাবা পারেননি সন্তানকে প্রাইমারী গন্ডি পাড় করতে। পড়াশুনা করতে পারেননি ফলে হননি অফিসার। কিন্তু তাই বলে আনোয়ার কি তার স্বপ্ন ভুলে গেছেন। না ,আনোয়ার তার স্বপ্ন তো ভুলেননি বরং কি করে কল্পিত স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবেন সে চিন্তায় ছিলেন নিমগ্ন। ধার দেনা করে কেনেন একটি স্মার্ট ফোন। যেহেতু সে কৃষি কাজ ছাড়া আর কিছু শিখেননি তাই স্মার্ট ফোনে ইউটিভে গিয়ে বার বার দেখেন বিভিন্ন কৃষি বিষয়ক বিষয়াবলী। হঠাৎ করে তার নজরে এলো মালচিং পদ্ধতিতে তরমুজ। বার বার দেখে নজরে এলো হলুদ তরমুজের। এই হলুদ তরমুজ চাষ করেই আজ সারা দেশের মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে উঠতে যাচ্ছেন কুমিল্লার কৃষক আনোয়ার হোসেন। 

আজীবন লালিত স্বপ্ন সত্যি হতে দেখে অর্থের অভাবে অফিসার না হওয়ার ব্যাথা ভুলে গিয়ে গর্ব নিয়ে আনোয়ার বলেন, স্যার আমার ক্ষেতে এখন অনেক অফিসার আসে। এটা দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় এবং চট্রগ্রাম বিভাগের ইতিহাসে প্রথম হলুদ তরমুজ উৎপাদনকারী সফল চাষী আনোয়ার হোসেনের গল্প। বয়স এখনো ৪৫ এর কোটা পেরোয়নি। কুমিল্লা চট্রগ্রামের আঞ্চলিক সড়কের পাদদেশ পেরিয়ে কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার গলিয়ার দক্ষিণ ইউনিয়নের বলরামপুর গ্রামেই চাষি আনোয়ারের বসবাস।

সাংবাদিকরা যখন আনোয়ারে তরমুজ ক্ষেতে উপস্থিত তখন বাড়ি ছিল না সে। শহর থেকে সাংবাদিক এসেছে শুনেই দৌঁড়ে চলে এল পাশের বাজার থেকে। স্মিত হাসি দিয়ে প্রতিবেদকসহ অন্যান্য সাংবাদিকদের অর্ভ্যথনা জানিয়ে মনের আনন্দে দেখাতে লাগল তার স্বপ্নের হলদে তরমুজের সমাহার সম্বলিত জমিগুলো।

কিভাবে আবিস্কার করলেন এই হলুদ তরমুজ জানতে চাইলে আনোয়ার জানান, স্যার, স্বপ্ন ছিল বড় অফিসার হবো। সারা দেশের মানুষ আমারে চিনব। কিন্তু ৫ ছেলে ও ২ মেয়ের বড় সংসারে গরীব বাবা আমাদের পড়াতে পারেননি। ছোট কাল থেকেই বাবার সাথে ক্ষেতে খামারে কাজ করা শুরু করি। বড় হয়েছি,বিয়ে করছি সন্তানও আছে। কিন্তু সংসার উন্নত হচ্ছে না। আগের মত ধান চাষে তেমন লাভ হয় না। কষ্ট করে একটা স্মার্ট ফোন কিনে ইউটিউবে বিভিন্ন চাষাবাদ দেখতে লাগলাম। ধান চাষ বাদ দিয়ে চাষ করতে শুরু করি বিভিন্ন সবজি। বেশী লাভ না হলেও ধান থেকে ভাল হচ্ছে। গতবার ইউটিউব টিপতে টিপতে দেখলাম , মালচিং পদ্ধতিতে থাইল্যান্ডে তরমুজ চাষ হচ্ছে। 

সময় কম লাভ বেশী উৎপাদনও ভাল হয়।তখন এটা নিয়ে চিন্তা শুরু করি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে কুমিল্লা ফেনীসহ কয়েকটি শহর ঘুরলাম কিন্তু কেউই মালচিং পেপার চিনে না। এক পর্যায়ে ইউটিউভ থেকেই সিরাজগঞ্জের শাহিন ভাইয়ের ঠিকানা পেলাম। তাকে ফোন করলাম। আমার উৎসাহ দেখে আমাকে সিরাজগঞ্জ আমন্ত্রন জানাল। সেখানে তিনি, মালচিং পদ্ধতিতে এ তরমুজ চাষ করছেন,সফল হয়েছেন তবে সেগুলো হলুদ না কালো তরুমুজ। কালার দুই হলেও পদ্ধতিও ফসল একই। শাহিন ভাই বীজ থেকে শুরু করে সার্বিক সব বিষয়ে সহযোগিতা করলেন। ২০২০ সালে ২০ শতক জমিতে এই মালচিং পদ্ধতিতে এ তরমুজ চাষ শুরু করলাম। মাত্র ৫২ দিনে ফলন এলো। জমি থেকেই খুচরা ক্রেতারা সব তরমুজ কিনে নিল। বাজারে কিংবা পাইকারদের দেওয়ার সুযোগও হয়নি। এবার শুরু করলাম কালো তরমুজের সাথে হলুদ তরমুজ চাষ। এই হলুদ তরমুজ একমাত্র চুয়াডাঙ্গা ছাড়া বাংলাদেশে আর কোথায়ও হয়নি। আমি হলাম দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয়।

চাষাবাদ পদ্ধতি :
এই হলুদ তরমুজের বীজ দেশের বাহির থেকে আসে। বীজ গুলো থেকে বিশেষ পদ্ধতিতে চাড়া উৎপাদন করা হয়। এর আগে নির্দিষ্ট জমিকে তরমুজ চাষের জন্য উপযোগী করা হয়। এক হাত দূরুত্ব রেখে পুরো জমিতে হাফ হাত উঁচু বেড করা হয়। এই মাটির বেড গুলো মালচিং পলিথিন শিট দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। যখন চারা লাগানো হয় তখন মালচিং পলিথিন শিট দিয়ে মোরানো মাটি গোল করে কেটে কাটা স্থানে ঐ তরমুজের চাড়াটি লাগানো হয়। এর পর গাছ যখন বড় হতে থাকে তখন বিভিন্ন সবজি জমির মত মাচা তৈরী করে দেওয়া হয়। তরমুজ গাছ মাচার বিভিন্ন পর্যায়ে ছড়িয়ে যায়। তরমুজ বড় হলে যাতে মাটিতে পড়ে না যায় সেই জন্য পলিথিন দিয়ে মুড়িয়ে দেওয়া হয়। বিভিন্ন ছত্রাকের আক্রমন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বিভিন্ন কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। ক্যালান্ডার ধরে ৫২ দিনের মাথায় তরমুজ খাওয়ার উপযোগী হয়। একেকটি তরমুজ দুই থেকে চার কেজির মত বড় হয়। এই তরমুজ কেজির ধরে বিক্রি করা হয়।

দেশীয় তরমুজ থেকে হলুদ তরমুজের প্রার্থক্য : 
দেশীয় তরমুজ মাটিতে শুয়ে বড় হয়। ফলে আকাড়ে এটি ১০/১২ কেজি কখনো এর থেকেও বড় হয়। আর এই মালচিং পদ্ধতির তরমুজ যেহেতু মাচায় বড় হয় তাই এটি সর্বোচ্চ ৪ কেজির মত ওজন হয়। এর চেয়ে বড় হলে মাচাসহ ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হবে। হলুদ তরমুজ দেখতে ভাঙ্গির মত হলুদ হলেও ভিতরে অনেক লাল এবং রসালো হয়। বলা যায় রসে ভরা তরমুজ। খেতে যেমন মিষ্টি তেমনি সুস্বাধুও অন্য যে কোন তরমুজ থেকে বেশী। এক কথায় স্বাধে মানে এটি অনন্য।

চাষী আনোয়ার যা বললেন : 
হলুদ তরমুজ চাষী আনোয়ার হোসেন বলেন, গতবার ২০ শতক জমিতে কালো তরমুজ চাষ করেছি। খুব ভাল লাভ হয়েছে। বাজারে গিয়ে বিক্রি করার সুযোগও পাইনি। সব তরমুজ জমি থেকেই নানা এলাকার নানা মানুষ এসে নিয়ে গিয়েছে। এবার ৬৫ শতক জমিতে তরমুজ উৎপাদন করেছি। এর মধ্যে বেশীর ভাগই হলুদ তরমুজ। এবার মানুষের আগ্রহও বেশী। এ পর্যন্ত জমি প্রস্তুত, সার, বীজ, মাচা, সুতা ও জাল বাবদ তাঁর খরচ হয়েছে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। ১৫ দিন পরই তরমুজ খাওয়ার উপযোগী হবে। এবার সব খরচ বাদ দিয়ে কমপক্ষে ১২ লক্ষ টাকা লাভ হবে বলে আনোয়ার জানান। তিনি বলেন, এই পর্যন্ত চার হাজার পাঁচশ তরমুজে পলিথিন দিয়েছি। আরো তরমুজ পলিথিন দেওয়ার অপেক্ষায় আছি। এই তরমুজ বিক্রি করেই স্বাবলম্বি হওয়ার স্বপ্ন দেখেন কৃষক আনোয়ার। তিনি জানান, পড়া লেখা না করতে পারার আর কোন দু:খ নেই আমার। এই হলুদ তরমুজের কারণে আজ সারা দেশের মানুষ আমাকে চিনতে পারছে। এটাই আমার শান্তি। কৃষি বিভাগ আমাকে সহযোগিতা করছেন। এ তরমুজের গায়ের রং হলুদ। ভেতরে লাল টকটকে। শিলাবৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়া না থাকলে অন্তত ১২ লাখ টাকা বিক্রি করতে পারব ইনশাআল্লাহ্।’

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সবুজের পাতার ভিতর মাচায় ঝুলছে হলুদ তরমুজ। তা দেখতে প্রতিদিন মানুষ ভিড় করছেন কৃষক আনোয়ার হোসেনের খেতে। আনোয়ারও মনের আনন্দে সবাইকে ঘুরে ঘুরে তরমুজ দেখাচ্ছেন।

সদর দক্ষিণ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মহিউদ্দিন মজুমদার বলেন, হলুদ তরমুজের পুষ্টিগুণ বেশি, মিষ্টিও বেশি। কুমিল্লার মাটি তরমুজ চাষের জন্য উপযোগী। আনোয়ার উদ্যোমী কৃষক। তাঁর আগ্রহ থেকেই কুমিলায় প্রথমবারের মতো চাষ হচ্ছে হলুদ তরমুজের।আমরা তাকে সার্বিক সহযোগিতা করে যাচ্ছি।

আনোয়ারের স্বপ্ন : 
কৃষক আনোয়ার বলেন, আমার স্বপ্ন আছে এই হলুদ তরমুজ প্রথমে কুমিল্লার চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় নিয়ে যাব। পরবর্তী পর্যায়ে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানী করব। এজন্য প্রয়োজন অর্থ। আনোয়ার বলেন, সরকার যদি আমাকে বিনা সুদে কিংবা সহজ সুদে ঋণ প্রদান করে তাহলে এই হলুদ তরমুজকে আমি দ্রুত রপ্তানী পর্যায়ে নিয়ে যেত পারব। 
তিনি বলেন, আমাদের দেশে এই সিজনে তরমুজ চাষ প্রায় শেষ পর্যায়ে থাকে। আর আমি এই সিজনে শুরু করছি দেখে গতবার অনেকেই হাসাহাসি করছে। কিন্তু যখন দেখল আমি সফল হয়েছি তখন অনেকেই এই চাষাবাদ সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে উঠছে। আশা করি আগামীতে আরো অনেকেই এই হলুদ তরমুজ চাষে উদ্যোগী হবেন ইনশাল্লাহ।

প্রতিক্রিয়া মন্তব্য শেয়ার