কুমিল্লার ঐতিহ্য ভিক্টোরিয়া কলেজের ১২২ বছর পদার্পণ

Img

দেশের প্রাচীনতম কলেজগুলোর মধ্যে অন্যতম কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ বছরে এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুরু থেকেই এই অঞ্চলের শিক্ষা,সংস্কৃতি ও ইতিহাস-ঐতিহ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।এই অঞ্চলের বহু ইতিহাস আর ঐতিহ্যের স্বাক্ষী এই কলেজ। তাই করোনাকালীন পদার্পণ উপলক্ষে দিনব্যাপী অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহন করেন কলেজ কতৃপক্ষ।

কলেজ সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার দুপুর ১২ টায় কুমিল্লাা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের পদাপর্ণ ও প্রতিবার্ষিকী উপলক্ষে কলেজের ফেজবুক পেজ থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা হয় আলোচনা সভা।

এতে উপস্থিত ছিলেন সাংসদ হাজী আ.ক.ম. বাহাউদ্দীন বাহার, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমরান কবির চৌধুরী ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচচ শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুল্লাহ আল হাসান চৌধুরী, মাধ্যমিক ও উচচ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক, মাধ্যমিক ও উচচ শিক্ষা অধিদপ্তর কুমিল্লা অঞ্চলের পরিচালক অধ্যাপক সোমেশ কর চৌধুরী, কলেজ প্রতিষ্ঠাতার প্রদৌহিত্র (৪র্থ পুরুষ) প্রকৌশলী অশোক সিংহ রায়,কুভিক অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. রুহুল আমিন ভূঁইয়া, কুভিক শিক্ষক পরিষদ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহজাহান সহপ্রমুখ ।

এছাড়া কলেজের সাংবাদিক সমিতিসহ একাধিক সংগঠন দিনব্যাপি নানা উদ্যোগ গ্রহন করে । প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই নানা বির্বতন ও বিকাশের মধ্য দিয়ে কলেজটি বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে মাধ্যমিক ও উচচ মাধ্যমিক, স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের একটি সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হয়ে আসছে। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ এর প্রথম অধ্যক্ষ পদে ছিলেন প্রফেসর সতেন্দ্রনাথ বসু এবং বর্তমানে অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. রুহুল আমিন ভূঁইয়া ।

শিক্ষা-সংস্কৃতির বিকাশে বৃটিশ ভারতে প্রথম পর্যায়ে যে কয়টি কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়,ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ তার মধ্যে অন্যতম। গবেষক তিতাশ চৌধুরী লিখেছেন, ‘প্রাচীনত্বের বিচারে এই কলেজটি বুড়োদের দলেই পড়ে’। মূলত এই কলেজটিই ছিল এই অঞ্চলের অন্ধকার যুগের শিক্ষা-সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। তবে পাকিস্তান সৃষ্টির পর এই কলেজের নাম পরিবর্তনের চেষ্টা চালানো হয়। ‘ভিক্টোরিয়া’ শব্দটি ছেঁটে ফেলে দেয়ার চিন্তা করা হয়। শেষ পর্যন্ত তা আর সম্ভব হয়ে উঠেনি। বর্তমানে কলেজটি দু’টি অংশে বিভক্ত। কুমিল্লা নগরীর কান্দিরপার রানীদীঘির পাড়ে কলেজের এইচএসসি (ইন্টারমিডিয়েট) শাখা। আর ধর্মপুরে ডিগ্রি-অনার্স শাখা অবস্থিত।এ কলেজে বর্তমানে ২২টি বিষয়ে অনার্স ও ১৯টি বিষয়ে মাস্টার্স কোর্স চালু রয়েছে। রয়েছে ১৩টি সক্রিয় সাংস্কৃতিক সংগঠন। কলেজে ওয়েবসাইটের মতে

জানা যায়, কলেজটি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২৯ হাজার ৯শ’, শিক্ষক পদ সংখ্যা ১৫০ জন, করর্মত ১৪৫ জন, জমির পরিমাণ ৩২ একর, কর্মচারী সংখ্যা ১৭১ জন, একাডেমিক ভবন ১১টি, প্রশাসনিক ভবন ২টি, হোস্টেল ভবন ১০টি(চলমান রয়েছে কয়েকটি), মসজিদ ভবন ৩টি, অডিটরিয়াম ১টি, শিক্ষক মিলনায়তন ২টি, খেলার মাঠ ২টি,হোস্টেলে সিটের সংখ্যাঃ ছাত্রবাস ৬৩৫টি, ছাত্রীনিবাস ৪০০টি, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি ২টি, মাইক্রোবাস ২টি ও প্রায় বড় বাস ১০টি। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ২৮ জন শিক্ষার্থী শহীদ হন। শতাব্দীর প্রাচীন দক্ষিণ বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জ্ঞান বিস্তারের পাশাপাশি ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান সহ এদেশের মানুষের প্রতিটি আন্দোলনে একাত্ম হয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের বাণিজ্য অনুষদের ৪র্থ বর্ষে ছাত্র শহীদ মো. জয়নাল আবেদীন বুকের তাজা রক্ত দিয়ে দেশ স্বাধীনতায় অবদান রেখেছে। বাঙালি জাতিকে পাকহানাদার বাহিনীর এ অমানবিক নির্যাতন, মানুষ হত্যা থেকে উদগীরণ করার জন্য কুমিল্লা শহরের ঢুলি পাড়া গ্রামের সন্তান এবং কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের প্রাক্তন ছাত্র শহীদ এ.কে.এম. মোজাম্মেল হক মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পরেন।

তিনি পাকহানাদার বাহিনীর হাতে কসবা থানার চারগাছ নামক স্থানে ১৯৭১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ভোর রাতে শহীদ হন। কুমিল্লা জেলার নৈয়রা গ্রামের সস্তান এবং কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের প্রাক্তন ছাত্র শহীদ আবু তাহের কুমিল্লা কোতয়ালি থানার ভারত পাকিস্তান সীমান্ত এলাকায় হানাদার বাহিনীর বুলেটের আঘাতে শহীদ হন।

মুক্তিযুদ্ধে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ২৮ জন ছাত্র পাকহানাদার বাহিনীর হাতে শহীদ হলেও বর্তমান প্রজন্মের ছাত্র-ছাত্রীরা এই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের কিছুই জানে না এবং কর্তৃপক্ষ এমন কোনো স্মৃতির অ্যালবামও রাখেনি যাতে এই বীর সেনানিদের জীবনী জানতে পারবে। এই ২৮ জন বীর শহীদ মুক্তিযোদ্ধার পুরো জীবনী সংরক্ষণ করার জন্য তাই কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে আকুল আবেদন। যাতে করে তারা চিরস্মরণী ও বরণী হয়ে থাকে ভিক্টোরিয়া কলেজের সব নবীন প্রবীণ প্রাক্তন ছাত্রসহ আগামী দিনের আলোকিত ছাত্র-ছাত্রীদের হৃদয়ে স্থান পায় এবং তারা যে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনকাহিনী থেকে দেশ প্রেমের অনুপ্রেরণা পায়।

প্রতিক্রিয়া মন্তব্য শেয়ার