কিভাবে জন্ম নিবন্ধন যাচাই করবেন?

জন্ম নিবন্ধন শিশুর অধিকার। শৈশব থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে জন্ম নিবন্ধন সনদ অত্যন্ত জরুরি। জেনে নিন জন্ম নিবন্ধন এবং জন্ম সনদ সংক্রান্ত সকল তথ্য।

Img

জন্ম নিবন্ধন সম্পর্কে জানতে হলে প্রথমে আপনাকে জানতে হবে জন্ম নিবন্ধন কী। যদি এক কথায় উত্তর দেওয়া হয় জন্ম নিবন্ধন কী তাহলে বলতে হবে একটি শিশুর জন্মের পর সরকারি খাতায় প্রথম নাম লেখানোকে জন্ম নিবন্ধন বলে। শিশুর জন্ম নিজ দেশকে, বিশ্বকে আইনগতভাবে জানান দেয়ার একমাত্র পথ জন্মের পর জন্মনিবন্ধন করা। নবজাতকের একটি নাম ও একটি জাতীয়তা নিশ্চিত করতে এটি হচ্ছে প্রথম আইনগত ধাপ। জন্ম নিবন্ধন প্রতিটি শিশুসহ বয়স্কদেরও একটি অধিকার। এটি নাগরিক অধিকারের পর্যায়ে পড়ে।

১৮৭৩ সালে তদানিন্তন বৃটিশ ভারতে প্রথম জন্ম ও মৃত্যু বিষয়ক একটি আইন পাশ হয়। আর বাংলাদেশে ২০০৪ সালে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন করা হয়। ২০০৪ সালে আইন করা হলেও ২০০৬ সালের জুলাই থেকে তা কার্যকর হয়। জনসচেতনতার অভাবে অনেকেই নিয়মানুসারে জন্ম নিবন্ধন করেন না। আইন অনুযায়ী ৪৫ দিনের মধ্যে জন্ম নিবন্ধন করাতে হবে। ১৮ বছরের নিচে বয়সীদের ক্ষেত্রে বিনা ফিতে জন্ম নিবন্ধন করা যাবে। আর ১৮ বছরের ঊর্দ্ধে জন্ম নিবন্ধন করতে হলে ৫০ টাকা ফি দিতে হবে। তবে গত বছরের জুলাই থেকে নতুন নিয়ম করা হয়েছে। এই তারিখের পর থেকে দুই বছরের মধ্যে কোনো মানুষের জন্ম অথবা মৃত্যু হলে তাদের নিবন্ধন করতে ফি লাগবে না।

জন্ম নিবন্ধন শিশুর অধিকার। এ অধিকার নিশ্চিত করতে শিশুর অভিভাবককে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে, শৈশব থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে জন্ম নিবন্ধন সনদ অত্যন্ত জরুরি। তাই প্রতিটি শিশুর জন্মের পর জন্ম নিবন্ধন এবং মৃত্যুর পর মৃত্যু নিবন্ধন করা প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব।

জন্ম নিবন্ধন কেন প্রয়োজন?

একটি শিশু জন্মগ্রহণ করে কিছু অধিকার নিয়ে। খাদ্য, নিরাপত্তা, আদর-ভালোবাসা, পরিচিতি, জাতীয়তা, স্বাস্থ্যসেবা, লেখাপড়ার সুযোগ সবই তার অধিকার। শিশু জন্মের পর পরিবারে মা-বাবা বা অন্য সদস্যরা শিশুর নামকরণ করে থাকেন। প্রতিটি শিশুর অধিকার নিশ্চিতকরণে নামকরণের পাশাপাশি তার জন্ম নিবন্ধন করা অত্যন্ত জরুরি। আজ থেকে কয়েক বছর আগেও জন্ম নিবন্ধন হয়েছে মূলত বহির্বিশ্বে গমন বা বিশেষ প্রয়োজনে। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন রয়েছে ব্রিটিশ আমল থেকেই কিন্তু তার কার্যকারিতা ছিল খুবই নগণ্য। এখন সময় পাল্টেছে। জন্ম নিবন্ধনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে সরকার জন্ম নিবন্ধনকে বাধ্যতামূলক করেছে।

আপনার জন্ম নিবন্ধনের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু?

জন্ম নিবন্ধনের গুরুত্ব অপরিসীম। জন্ম নিবন্ধন শিশুর জাতীয়তা, বয়স, নামকরণ, স্থায়ী ঠিকানা ইত্যাদি মৌলিক বিষয়ের নিশ্চয়তা দেয়। এছাড়া পাসপোর্ট ইস্যু, বিবাহ রেজিস্ট্রেশন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি, সরকারি, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে নিয়োগদান, ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু, ভোটার তালিকা প্রণয়ন, জমি রেজিস্ট্রেশন, ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন সার্টিফিকেট পেতে, ট্যাঙ্ প্রদানে, ব্যাংক হিসাব খুলতে, গ্যাস-পানি-বিদ্যুৎ- টেলিফোন সংযোগ নিতে ইত্যাদি ক্ষেত্রে জন্ম নিবন্ধন সনদ প্রদর্শন সরকার আইনের দ্বারা বাধ্যতামূলক করেছে।

জন্ম নিবন্ধন আবেদন করার নিয়ম:

প্রবাসীর দিগন্ত এর পাঠকদের জন্য জানিয়ে দেওয়া হল জন্ম নিবন্ধন আবেদন করার নিয়ম (Procedure of Birth Registration): শিশু জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে জন্ম নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক। শিশু জন্মের ২ বছরের মধ্যে জন্ম নিবন্ধন না করালে বাবা-মায়ের জন্য জরিমানা আছে। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কোনোরকম ফি ছাড়া জন্ম নিবন্ধন করার সুযোগ দেয়া হয়। এ সময় বাড়ানো হয়েছিল ২০১০ সালের জুন পর্যন্ত। এ সময়ের মধ্যে দেশের অধিকাংশ শিশু জন্ম নিবন্ধনের আওতায় এসেছে। জুনের পর জন্মনিবন্ধনের জন্য সরকার একটি ফি ধার্য করেছে। তবে ২ বছর পর্যন্ত শিশুদের জন্মনিবন্ধন যেকোনো সময় বিনা ফিতে করানো যাবে। শুধু ২ বছরের বেশি সময় পার হলে এই ধার্যকৃত ফি দিতে হবে।

কোথায় আবেদন করবেন? (Where to Apply for Birth Registration?)

  • ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়
  • পৌরসভা
  • সিটি করপোরেশন অফিস
  • সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ওয়ার্ড কমিশনারের অফিস

জন্ম নিবন্ধন সনদের জন্য যে সকল কাগজপত্র প্রদান করতে হয় (Necessary Papers for Birth Registration Certificate):

যদি কোনো হাসপাতাল বা ক্লিনিকে জন্মগ্রহণ করে থাকে তবে সেখানকার সার্টিফিকেট/ছাড়পত্র। এসএসসি সনদ এর ফটোকপি/পাসপোর্টের ফটোকপি/আইডি কার্ডের ফটোকপি এবং এলাকার জনপ্রতিনিধি যেমন-ওয়ার্ড কমিশনার/ ইউনিয়ন পরিষদ/পৌরসভার চেয়ারম্যান কর্তৃক নাগরিকত্ব সনদ এর ফটোকপি।

জন্ম নিবন্ধন সনদ সংগ্রহ (How to get Birth Certificate):

জন্ম নিবন্ধন আবেদনপত্র জমা দেওয়ার সময় সনদ প্রদানের সম্ভাব্য একটি তারিখ একটি কুপনে লিখে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে কুপন প্রদান করে জন্ম নিবন্ধন সনদ সংগ্রহ করতে হয়। জন্ম নিবন্ধন সনদ একটি শক্ত কাগজ (আর্ট পেপার) যেটার উপরে আপনার নাম, ঠিকানা, জন্ম তারিখ, জন্মস্থান, পিতা-মাতার নাম সহ যাবতীয় তথ্য ছাপানো আছে।  নিচে  সংশ্লিষ্ট অফিসারদের স্বাক্ষর থাকে।

অনলাইনে জন্ম নিবন্ধন প্রক্রিয়া (Online Registration for Birth Certificate):

অনলাইনে জন্ম নিবন্ধনের জন্য এই লিংকে ক্লিক করুন: (http://bris.lgd.gov.bd/pub/?pg=application_form)।

বিভিন্ন ধাপে এই নিবন্ধন প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়। প্রথমে নিবন্ধনকারীর জন্ম স্থান বা স্থায়ী ঠিকানার বিভাগ, জেলা, প্রভৃতি ধাপ পার হয়ে ওয়ার্ড পর্যন্ত নির্বাচন করতে হয়। অনলাইন জন্ম নিবন্ধনের আবেদন ফরম প্রথমে বাংলায় ও পরবর্তীতে ইংরেজিতে পূরণের পর প্রয়োজনীয় সম্পাদনা করে সংরক্ষণ বাটনে ক্লিক করুন। সংরক্ষণ বাটনে ক্লিক করলেই আবেদন পত্রটি সংশ্লিষ্ট নিবন্ধক কার্যালয়ে স্থানান্তিরত হয়ে যায়, আবেদনকারীর আর কোনো সংশোধনের সুযোগ থাকে না। অতঃপর পরবর্তী ধাপে প্রিন্ট বাটনে ক্লিক করলে আবেদন পত্রের মুদ্রিত কপি পাবেন। সনদের জন্য ১৫ দিনের মধ্যে উক্ত আবেদনপত্রে নির্দেশিত প্রত্যয়ন সংগ্রহ করে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্রের সত্যায়িত কপিসহ নিবন্ধক অফিসে যোগাযোগ করুন।

(তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, সরকারি ওয়েবসাইট ও বিভিন্ন গণমাধ্যম)

প্রতিক্রিয়া মন্তব্য শেয়ার