কালিমা সমূহের আরবি, বাংলা উচ্চারণ ও অনুবাদ

এই লেখার মাধ্যমে আমরা জানানোর চেষ্টা করব, কালিমা কি কি? কালিমা কত প্রকার? কালিমা সমূহের আরবি, বাংলা উচ্চারণ ও অনুবাদ।

Img

কালিমা বা কালেমা ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস সংবলিত কয়েকটি আরবি বাক্যের নাম। এর মাধ্যমেই ইসলামের প্রথম স্তম্ভ শাহাদাহ্‌ (শাহাদাহ্ একটি মুসলিম বিশ্বাস, আরবিতে এর অর্থ "সাক্ষ্য দেয়া") পূর্ণতা পায়। আমাদের দেশে ইসলামী ঈমান-আকীদার বিবরণের ক্ষেত্রে ‘পাঁচটি কালিমা’ এবং ঈমানে মুজমাল ও ঈমানে মুফাসসাল নামে দুটি ঈমানের কথা প্রচলিত আছে।

কালিমা সমূহ:

প্রথম কালিমা: কালিমা-ই তায়্যিবা

কালিমা-ই তায়্যিবা এর অর্থ হল পবিত্র বাক্য। আমাদের দেশে কালিমা তাইয়িবা বা ‘পবিত্র বাক্য’ বলতে বুঝানো হয় তাওহীদ ও রিসালাতের একত্রিত ঘোষণা। কুরআন কারীমে আল্লাহ জাল্লা শানুহু বলেন:

‘‘তুমি কি দেখ নি, কিভাবে আল্লাহ একটি উদাহরণ পেশ করেছেন: একটি ‘কালিমায়ে তায়্যিবা’ বা পবিত্র বাক্য একটি পবিত্র বৃক্ষের মত, তার মূল প্রতিষ্ঠিত এবং তার শাখা-প্রশাখা আকাশে প্রসারিত।’’ - [সূরা (১৪) ইবরাহীম: আয়াত ২৪]

  • কালিমা-ই তায়্যিবা আরবিতে

لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ مُحَمَّدٌ رَسُوْلُ اللهِ

  • কালিমা-ই তায়্যিবা বাংলা উচ্চারণ

লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।

  • কালিমা-ই তায়্যিবা বাংলা অনুবাদ

‘‘আল্লাহ ছাড়া কোন মাবূদ নেই, মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর রাসূল।’’

*** উল্লেখ্য যে, কালিমা তায়্যিবার দুটি অংশ পৃথকভাবে কুরআন কারীমে ও হাদীস শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে। উভয় বাক্যই কুরআনের অংশ এবং ঈমানের মূল সাক্ষ্যের প্রকাশ। উভয় বাক্যকে একত্রে বলার মধ্যে কোনো প্রকারের অসুবিধা নেই। এজন্য আমরা ইসলামের প্রাচীন গ্রন্থগুলো দেখি যে, তাবিয়ীগণের যুগ থেকে ইমাম, ফকীহ, মুহাদ্দীসগণ কালিমা শাহাদতের মূল ঘোষণা হিসাবে এ বাক্যটির ব্যবহার করেছেন। এ বাক্যটি ব্যবহারের বিষয়ে কেউ কোনো আপত্তি করেন নি।

দ্বিতীয় কালিমা: কালিমা-ই শাহাদাত

কালিমা-ই শাহাদাত, যার অর্থ হল সাক্ষ্য বাক্য। কুরআন ও হাদীসে ইসলামী ঈমান বা বিশ্বাসের মূল হিসাবে দু’টি সাক্ষ্য প্রদানের নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যা আমাদের দেশে ‘কালিমা শাহাদত’ হিসাবে পরিচিত। এ কালিমায় আল্লাহর তাওহীদ এবং মুহাম্মাদ (ﷺ) এর রিসালাতের সাক্ষ্য প্রদান করা হয়। প্রকৃতপক্ষে একমাত্র কালিমা শাহাদতই হাদীস শরীফে ঈমানের মূল বাক্য হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

  • কালিমা-ই শাহাদাত আরবিতে

أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ وأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ

  • কালিমা-ই শাহাদাত বাংলা উচ্চারণ

আশহাদু আল লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারীকালাহু ওয়াশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আ'বদুহু ওয়া রাসূলুহু।

  • কালিমা-ই শাহাদাত বাংলা অনুবাদ

‘‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবূদ (উপাস্য) নেই। তিনি এক, অদ্বিতীয় এবং আমি আরও সাক্ষ্য প্রদান করছি যে, মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর বান্দা ও প্রেরিত রাসূল।’’

তৃতীয় কালিমা: কালিমা-ই তাওহীদ

কালিমা-ই তাওহীদ, যার অর্থ হল "একত্ববাদী বাক্য"।

  • কালিমা-ই তাওহীদ আরবিতে

لاَ اِلَهَ اِلاَّ اَنْتَ وَاحِدَ لاَّثَانِىَ لَكَ مُحَمَّدُرَّ سُوْلُ اللهِ اِمَامُ الْمُتَّقِيْنَ رَسُوْ لُرَبِّ الْعَلَمِيْنَ

  • কালিমা-ই তাওহীদ বাংলা উচ্চারণ

লা-ইলাহা ইল্লা আনতা ওয়াহেদাল্লা ছানীয়ালাকা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লা ইমামুল মোত্তাকীনা রাছুলুরাবি্বল আলামীন।

  • কালিমা-ই তাওহীদ বাংলা অনুবাদ

‘‘তুমি (আল্লাহ) ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই। তুমি এক, তোমার দ্বিতীয় কেউ নেই। আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) আল্লাহভীরুদের নেতা ও বিশ্বপ্রতিপালকের রাসুল।’’

*** এ বাক্যটির অর্থ সুন্দর। তবে এ বাক্যটির কোনোরূপ গুরুত্ব এমনকি এর কোনো প্রকারের উল্লেখ বা অস্তিত্ব কুরআন বা হাদীসে পাওয়া যায় না।

চতুর্থ কালিমা: কালিমা-ই তামজীদ

কালিমা-ই তামজীদ, যার অর্থ হল "শ্রেষ্ঠত্ববাদী বাক্য"।

  • কালিমা-ই তামজীদ আরবিতে

لَا اِلَهَ اِلَّا  اَنْتَ نُوْرَ يَّهْدِىَ اللهُ لِنُوْرِهِ مَنْ يَّشَاءُ مُحَمَّدُ رَّسَوْ لُ اللهِ اِمَامُ الْمُرْسَلِيْنَ خَا تَمُ النَّبِيِّنَ

  • কালিমা-ই তামজীদ বাংলা উচ্চারণ

লা-ইলাহা ইল্লা আনতা নূ-রাই ইয়াহদিয়াল্লাহু লিনূরিহী মাইয়্যাশাউ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহি ইমামূল মুরছালীনা খাতামুন-নাবিয়্যীন।

  • কালিমা-ই তামজীদ বাংলা অনুবাদ

‘‘তুমি (আল্লাহ) ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। তুমি জ্যোতিময়, যাকে ইচ্ছা হয় তাকেই তোমার নূর দ্বারা পথ প্রদর্শন করো। মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর রাসূল রাসূলগণের নেতা এবং সর্বশেষ নবী।’’

*** এ বাক্যটির অর্থও সুন্দর। কিন্তু এভাবে এ বাক্যটি বলার কোনো নির্দেশনা, এর কোনো গুরুত্ব বা অস্তিত্ব কুরআন বা হাদীসে পাওয়া যায় না।

পঞ্চম কালিমা: কালিমা-ই রদ্দে কুফর

কালিমা-ই রদ্দে কুফর ইসলামে অবিশ্বাসীদের প্রত্যাখ্যানমূলক বাক্য হিসেবেও পরিচিত। 

  • কালিমা-ই রদ্দে কুফর আরবিতে

اَللَّهُمَّ إِنِّىْ أَعُوْذُ بِكَ مِنْ أَنْ أُشْرِكَ بِكَ شَيْئاً وَنُؤْمِنَ بِهِ وَأَسْتَغْفِرُكَ مِمَّا أَعْلَمُ بِهِ وَمَا لاَ أَعْلَمُ بِهِ وَأَتُوْبُ وَآمَنْتُ وَأَقُوْلُ أَنْ لاَ إِلهَ اِلاَّ اللهُ مُحَمَّدٌ رَسُوْلُ اللهِ

  • কালিমা-ই রদ্দে কুফর বাংলা উচ্চারণ

আল্লাহুম্মা ইন্নী আউযুবিকা মিন আন উশরিকা বিকা শাইআও ওয়া আনা আলামু বিহি ওয়া আসতাগ ফিরুকা লিমা আলামু বিহি ওয়ামা লা আলামু বিহি তুবতু আনহু ওয়া তাবাররাতু মিনাল কুফরি ওয়াশ্শির্কি ওয়াল মা আছি কুল্লিহা ওয়া আসলামতু ওয়া আমানতু ওয়া আক্বলু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদু রাসূলুল্লাহ।

  • কালিমা-ই রদ্দে কুফর বাংলা অনুবাদ

‘‘হে আল্লাহ! আমি আপনার সাথে কোন কিছুর শরীক (অংশীদার) করা থেকে আশ্রয় চাচ্ছি। আমি আপনার কাছে জানা ও অজানা সমস্ত শিরকী গুনাহ থেকে ক্ষমা চাচ্ছি এবং তা থেকে তওবা করছি। আমি কুফরী, শিরেকী ও সকল প্রকার গুণাহকে পরিত্যাগ করছি। আমি ইসলাম গ্রহন করছি। ঈমান গ্রহণ করছি এবং সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ পাক ছাড়া কোন ইলাহ (মা'বূদ) নেই, আর সাইয়্যিদুনা মুহাম্মদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ পাক - এর রাসূল।’’

*** শিরক থেকে আত্মরক্ষার একটি দুআ হাদীসে বর্ণিত। [রাহে বেলায়াত, পৃষ্ঠা ৫৪২] এ কালিমার মধ্যে উক্ত মাসনূন দুআর সাথে কিছু কথা সংযুক্ত করা হয়েছে। বাক্যগুলোর অর্থ ভাল। কিন্তু বাক্যগুলো এভাবে কোনো হাদীসে পাওয়া যায় না।

ইমান-ই মুজমাল

  • ইমান-ই মুজমাল আরবিতে

امَنْتُ بِاللهِ كَمَا هُوَ بِاَسْمَائِه وَصِفَاتِه وَقَبِلْتُ جَمِيْعَ اَحْكَامِه وَاَرْكَانِه

  • ইমান-ই মুজমাল বাংলা উচ্চারণ

আ-মানতু বিল্লা-হি কামা-হুয়া বিআসমা-ইহী ওয়া সিফা-তিহী ওয়া ক্বাবিলতু জামী-আ আহকা-মিহী ওয়া আরকা-নিহী।

  • ইমান-ই মুজমাল বাংলা অনুবাদ

‘‘আমি আল্লাহ তা’আলার উপর ঈমান আনলাম। তিনি যেমন, তার নামসমূহ ও তাঁর গুণাবলী সহকারে এবং আমি গ্রহণ করেছি তার সমস্ত বিধি-বিধান।’’

*** ইমানে মুজমাল নামে প্রচলিত বাক্যটির অর্থ সুন্দর ও সঠিক। তবে এরূপ কোনো বাক্য কোনোভাবে কোনো হাদীসে উল্লেখ করা হয় নি।

ইমান-ই মুফাসসাল

ঈমানের এ ছয়টি রুকন বা স্তম্ভের কথা কুরআন ও হাদীসে বারংবার উল্লেখ করা হয়েছে। লক্ষ্যণীয় যে, ‘ঈমানে মুফাস্সালের মধ্যে আখিরাতের বিশ্বাসকে পৃথক দুটি বাক্যাংশে প্রকাশ করা হয়েছে (ইয়াওমিল আ-খিরী) ও (বা’সি বা’দাল মাউত): শেষ দিবস ও মৃত্যুর পরে উত্থান। 

  • ইমান-ই মুফাসসাল আরবিতে

امَنْتُ بِاللهِ وَمَلئِكَتِه وَكُتُبِه وَرَسُوْلِه وَالْيَوْمِ الْاخِرِ وَالْقَدْرِ خَيْرِه وَشَرِّه مِنَ اللهِ تَعَالى وَالْبَعْثِ بَعْدَالْمَوْتِ

  • ইমান-ই মুফাসসাল বাংলা উচ্চারণ

আ-মানতু বিল্লা-হি ওয়া মালা-ইকাতিহী ওয়া কুতুবিহী ওয়া রুসূলিহী ওয়াল ইয়াওমিল আ-খিরী, ওয়াল ক্বাদরি খায়রিহী-ওয়া শাররিহী মিনাল্লা-হি তাআলা ওয়াল বা’সি বা’দাল মাউত।

  • ইমান-ই মুফাসসাল বাংলা অনুবাদ

‘‘আমি ঈমান আনলাম আল্লাহর উপর তার ফিরিশতাদের উপর, তার আসমানী কিতাবসমূহ, তার রাসূলগণ এবং শেষ দিবসের উপর আর এর উপর যে, অদৃষ্টের ভাল-মন্দ আল্লাহ তা’আলার তরফ হতে এবং মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের উপর।’’

-

মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে জেনে বুঝে সহি শুদ্ধ আমল করার তউফিক দাণ করুক, আমিন

প্রতিক্রিয়া মন্তব্য শেয়ার