১৮/১৯ বছর আগে যখন সাংবাদিকতা শুরু করেছি। তখন প্রচুর বই সংগ্রহ করে পড়তাম সাংবাদিকতার উপর। একটা স্পেশাল রিপোর্ট তৈরি করতে মাঠ থেকে তথ্য নেয়ার পাশাপাশি পাবলিক লাইব্রেরিতে গিয়ে অন্তত ৪০ থেকে ৫০টা বই ঘেটে তথ্য নিতাম, এরপর সারারাত জেগে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা হাতে লিখে এরপর তা অফিসে এসে জমা দিতাম। আর সেইসাথে ভোর বেলা বেরিয়ে মাঝ রাত অবধি দৈনন্দিন স্পট নিউজতো করতেই হতো। তখন সাধারন সংবাদের পেছনের সংবাদগুলো খুঁজে বের করার একটা আগ্রহ ছিল বেশ। অর্থাৎ সংবাদ এবং সাংবাদিকতা ছাড়া আমার ভুবনে আর কোনো কিছুরই প্রাধান্য ছিলনা।

পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন কার কোথায় কি তা নিয়ে বিন্দু পরিমান আগ্রহ ছিলনা। এভাবেই ধীরে ধীরে অবশ্য আমি বেশ একলা হয়ে পরি। কেননা নিজের একটা আলাদা জগৎ তৈরি করেছিলাম শুধু সংবাদ ও সংবাদ সংশ্লিষ্ট্য মানুষগুলোকে নিয়ে। এরাই আমার সকাল থেকে রাত। হাজারো অভিজ্ঞতা থেকে মাত্র ১টা অভিজ্ঞতা শেয়ার করছি- পতিতা পল্লী উঠে যাবার পরেও সেখানে অবৈধভাবে মেয়েদের আটকে রেখে দেহ ব্যবসা চলছিল।

গোপন সূত্রে খবর পেয়ে দেখেশুনেই রিপোর্ট তৈরি করে ডেস্কে জমা দেবার পরেও সেই ২/৩ পাতার সংবাদটি বার্তা সম্পাদক মুড়ে ডাস্ট ঝুড়িতে ফেলে দিয়ে বলতেন- তথ্য আছে প্রমান নেই নিউজে। সাথে সাথে সম্পাদকের সাথে কথা বলে ১দিনের সময় নেই তথ্য-প্রমান সহ সংবাদটি পূনরায় তৈরি করার জন্য। পরাজয় মেনে নেয়ার পাত্র ছিলাম না কখনো। পরদিন কৌশলে নিজে সম্ভাব্য যৌনকর্মী সেজে গিয়ে সর্দারনি খালার সাথে কথা বলে দরদাম ঠিক করি এ পেশায় জয়েন করার আগ্রহ দেখিয়ে, যে আলাপচারিতাগুলো হাতে থাকা নোকিয়া মোবাইলে অডিও রেকর্ড করতে থাকি। শেষে অফিসে গিয়ে পূনরায় সেই সংবাদ লিখে সরাসরি সম্পাদককে জমা দেই এবং তাকে মোবাইলের রেকর্ডিং শুনাই। এরপর নিশ্চিত হয়ে তিনি সংবাদটি ছাপেন।

পরদিন সর্দারনির পেশায় জয়েন করার কথা বলে প্রমান নিয়েছিলাম, অথচ পরদিন তার অপকর্মের বিরুদ্ধে সংবাদে শহরজুড়ে তোলপাড় শুরু হওয়াতে বিভিন্নজন ফোন করে জানাতে থাকেন- অপরাধীরা আমায় হারিকেন দিয়ে খুঁজছে। কিন্তু থেমে থাকিনি। দুর্বার গতিতে এগিয়ে গেছি কাজ করতে করতে। ঢাকা জাতীয় পর্যায়ে সাংবাদিকতা শুরু করার পূর্বে জেলা পর্যায়ে টিভি রিপোর্টিং এবং সর্বশেষ ১টি স্থানীয় পত্রিকার বার্তা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছি। তখনো পর্যন্ত অর্থাৎ দীর্ঘ ১০ বছর টানা সাংবাদিকতা করেও নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দেইনি। হয় রিপোর্টার বলেছি, নাহয় অমুক পত্রিকার চিফ রিপোর্টার, তমুক পত্রিকার বার্তা সম্পাদক, কিন্তু সাংবাদিক পরিচয় দেইনি। কেননা শুধু কাজই করিনি আমি, সাংবাদিকতার পাশাপাশি যেমন ম্যাস-লাইন মিডিয়া সেন্টার থেকে অসংখ্য ট্রেনিং-কোর্স করেছি, তেমনি অসংখ্য বই পড়েছি এই বিষয়ে।

জেনেছি ঠিক কতটুকু অভিজ্ঞতা হলে এবং কি কি যোগ্যতা অর্জন করা হয়ে গেলে তবেই ‘সাংবাদিক’ পদবিটা নিজের নামের সাথে ব্যবহার করা যায়। তাছাড়া সম্পাদকদের সাথে থাকত আমার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্ক। সেই ১০ বছরে বেতনতো কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে এক পয়সাও পাইনি।

বেতন বলতে যা বোঝায় তা কেবলই ঢাকা এসে জয়েন করার পর তা পেয়েছি। তবুও কি আদব-কায়দা, ভাষা-ব্যবহারে যথেষ্ট শালীনতা নিয়ে সম্পাদক থেকে শুরু করে সিনিয়রদের সাথে আমার আচরন ছিল যা এখনো রয়েছে। এ পেশায় প্রায় ৬/৭ বছর পার করার পর একটা সামান্য পরিচিতি যখন এসেছিল তখন পত্রিকাগুলো থেকে অফার এলো- সংবাদের পাশাপাশি নিজ উদ্যোগে বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করে আনতে পারলে ৬০% অফিসকে দিয়ে বাকি ৪০% নিজে রাখতে পারব।

অফিসকে না জানিয়ে কোনো লেনদেন ছিল সেসময় আকাশ কুসুম কল্পনা! চিটিং কখনোই আমার দ্বারা সম্ভব হয়নি। কেননা সবকিছুর ঊর্ধ্বে ছিল পারিবারিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতি-নৈতিকতার শিক্ষা। যদি হতো, তাহলে অনেক আগেই ঝড়ে পড়তাম, অথবা আজ এই পর্যন্ত এসে পৌছাতে পারতাম না। শুরু থেকেই ফোকাসটা সব সময় রেখেছি নিজের কাজের প্রতি, ভাবের প্রতি নয়। শুরুর দিকে অন্তত ৩/৪ বছর এলাকার অনেকেই বলতেও পারেনি কলেজ, নাঁচ-গানের ক্লাস এবং নিয়মিত লেখালেখির বাইরে আমি সংবাদ মাধ্যমেও রিপোর্টার হিসেবে কাজ করছি।

কেননা আমি গর্জে উঠিনি, শুধু বর্ষে উঠেছি। চেয়েছি- মানুষ আমায় চিনে নিক্, আমি নিজেকে চেনাতে যাবনা এবং এই এক জীবনে পেরেছিও তাই। আর আজকাল কি হচ্ছে? বাড়ি বাড়ি ডিশের তার টেনে বেরানো, গার্মেন্টস-হোসিয়ারিতে কাজ করা, বাসের হেল্পার সহ মুরগি বিক্রি করে খাওয়া লোকেরা হঠাৎ করেই কেমনে জানি নিজেকে সাংবাদিক বলে দাবি করে বসে।

তাদের আচার আচরন দেখলে মনে হয় কম পানির মাছ হঠাৎ করে বেশি পানিতে এসে পড়লে যেমন ছটফট করে নিজের অস্তীত্ব জাহির করতে চায়, ঠিক তেমন ভাবে নিজেদের অনেক বড় দেখিয়ে ভাব নিয়ে কথা বলে। না আছে আদব কায়দা, না আছে শালীনতা। থাকবে কোত্থেকে? এখনকার সাংবাদিকতা তো হয়ে গেছে ‘মোবাইল সাংবাদিকতা’।

কোনো ধরনের তথ্যের বালাই নেই। গজা মিল দিয়ে যা ঘটল তাই অন্যজনের টাইমলাইন কিংবা অনলাইন থেকে চুরি করে নিয়ে তাতে নিজের নাম বসিয়ে হাতে থাকা এন্ড্রয়েট মোবাইলে টুকটুক করে পাঠিয়ে দিয়ে হয়ে গেলো সাংবাদিক। সেই সংবাদের ভেতরে কি কি তথ্য রয়েছে তা নিজেরাও বলতে পারবেনা। আমি শিক্ষিত, রুচিশীল, ফটোগ্রাফিতে দক্ষ ও যোগ্য ‘ফটোসাংবাদিক’দের বলছিনা, প্রাইমারী স্কুলের গন্ডি না পেরোনো কিছু কিছু শিক্ষানবিশ ফটোগ্রাফারকেও তো দেখা যায় কি ভাব তাদের! যেনো স্বয়ং এদেশের প্রধানমন্ত্রী। অথচ বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর নাম জিজ্ঞেস করলে কিন্তু তারা বলতে পারবে না।

একটি ছবি কিভাবে তুলতে হয়, সেই ছবির মাধ্যমে পাঠকের চোখে কিভাবে তথ্য পৌছে দিতে হয় তা জানা দুরের কথা, নিজেদের ছবির সাথে সঠিক শব্দ ও বানানে ১ লাইন ক্যাপশনও লিখতে জানেনা। কেউ কেউ তো জানেই না যে- ক্যাপশন কি জিনিষ! শিখবে কোত্থেকে? ফটো সাংবাদিক হতে হলেও যে এ বিষয়ে কিছু বিশেষ ট্রেনিং এবং কোর্স করতে হয় তা ওরা জানবে কোত্থেকে? ওরাতো ভাবের জগতে টাকা ইনকাম করতে এসেছে। আর না হয়- কোনো সিস্টেম জানেনা, লেখাপড়া জানেনা, তাহলে পৃথিবীর তাবাৎ পেশা রেখে এখানেই কেনো আসবে? আসলে অন্য পেশায় এদের ভাত নেই। একমাত্র সাংবাদিকতায়ই যে কেউ যখন তখন ঢুকে যেতে পারে।

এই বাজে সুযোগটা সৃষ্টি হয়েছে কিছু অযোগ্য লোক টাকার জোড়ে পত্রিকার মালিক বনে যাওয়াতে। শুধু কি তাই? একটি পত্রিকা অফিসের সামান্য পিয়ন, অফিস সহকারী পর্যন্ত নিজেকে বড় সাংবাদিক বলে বিভিন্ন জায়গায় পরিচয় দেয়। চলতে ফিরতে এদের ভুয়া দাম্ভিকতার ভাব আর নিজেকে সাংবাদিক বলে পরিচয় দেয়ার ফলে সত্যিকার অর্থেই যারা সাংবাদিক এবং এই পেশার যোগ্য ব্যক্তি, তারা লজ্জায় পরে নিজেদের আজকাল সাংবাদিক বলে পরিচয়ই দিতে চাননা। অথচ তারাই কিন্তু এই পেশাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তাদের কাজ দিয়ে। তারা আর কি করবে? নিজের সম্মান নিজে বজায় রাখতে নিরবতাকেই বেছে নিয়ে নিরবে নিভৃতে সংবাদের আসল রানার হিসেবে কাজ করে চলেন তারা।

কারণ, ১০জন মূর্খের মাঝে ১জন শিক্ষিত ব্যক্তি হাজারটা যুক্তি দেখালেও সেখানে টিকে থাকা অসম্ভব। তাই নিজের সম্মান বাঁচাতে তারা ঘুণাক্ষরেও ওদেরকে ভাল-মন্দ পরামর্শ দিতে পর্যন্ত যায়না। যেহেতু যাচাই নেই-বাছাই নেই, ওদের রুখবার কেউ নেই, ওরাতো উড়বেই। কেউ কেউ স্ব-উদ্যোগে প্রোপার ওয়েতে এদেরকে শেখাতে চাইলে অন্যজন এসে পাম পট্টি মেরে ফুলিয়ে বারোটা বাজিয়ে দিয়ে যাবে। ফলে না এরা ঘাটের থাকে, না ঘটির। ‘সাংবাদিকদের সবাই সম্মান করে, ভয় পায়’ এই মিথ্যেকে কিছু গাধা সত্যি ভেবে অন্য পেশা ছেড়ে এখানে চলে আসে শুধু ভাবের দুনিয়ায় বসবাসের জন্য। ওইযে- ওরা মনে করে- ‘সাংবাদিকদের সবাই সম্মান করে, ভয় পায়’।

অথচ একজন সাংবাদিক বা সংবাদকর্মী সম্মানিত হোন তার কাজ দিয়ে, মেধা দিয়ে, ভাব বা চাপাবাজি দিয়ে নয়। আর তাদেরকে ভয় পাবারতো প্রশ্নই আসেনা। তারাও সমাজের আর দশজনের মতো সাধারন মানুষ। দেখবেন- পৃথিবীতে যত বড় যোগ্য ব্যক্তি তার আচরনে ততই শান্তশিষ্ট, বিচক্ষণ, ভাব নেই বললেই চলে, আচার আচরনে নমনীয়তা, শালীনতা ও অন্যকে বড় করে দেখার মনোভাব থাকে।

পক্ষান্তরে যত অযোগ্য ব্যক্তি ততই তাদের আচরনে নিজেকে বড় হিসেবে জাহির করার হাব-ভাব, অশালীন আচরন, অভদ্রতা, বেয়াদবি, অন্যকে ছোট করে দেখার মনোভাব বিদ্যমান। সাংবাদিকদের মানুষ এক সময় সম্মান করত, এখন কতটুকু করে জানিনা। লজ্জিত চোখে তাকিয়ে জানতে চাইও না। কেননা ওদের কারণেই সাংবাদিকতার মতো মহান পেশা এখন কলঙ্কিত। তবুও বেঁচে থাকুক সংবাদ মাধ্যমের সৎ ও যোগ্য রানার’রা।

সেই সাথে বিপথে যাওয়াদেরও সঠিক গাইডলাইনের মাধ্যমে এগিয়ে নিয়ে যাক তারা। বরাবরই চেষ্টা করেছি নিজের দায়াবদ্ধতা থেকে এই কাজটি করার। যদিও নিজের ঝুলিতে এক্ষেত্রে সফলতার চেয়ে ব্যর্থতাই বেশি। তবে এই সামান্য ক’বছরের অভিজ্ঞতায় যা বুঝেছি- সৎ ও পরিশ্রমীদের পাশাপাশি শিক্ষিত ও উচ্চশিক্ষিত জেনারেশনের এই পেশায় আসা উচিত। তাহলেই যদি কলঙ্কমুক্ত হয় এদেশের সংবাদ ও সাংবাদিকতা।

লেখক : সোনিয়া দেওয়ান প্রীতি সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী