কর্ণফুলীতে দিনে ২২ হাজার টন বর্জ্য

Img

নগরী ও আশেপাশের উপজেলা থেকে ২৩টি খাল দিয়ে দৈনিক প্রায় ২২ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য পড়ছে কর্ণফুলী নদীতে। এর মধ্যে চিহ্নিত সাতটি খাল দিয়ে সবচেয়ে বেশি বর্জ্য পড়ে। এসব বর্জ্য দূষিত করছে নদীটিকে। কর্ণফুলী রক্ষায় প্রণীত দশ বছর মেয়াদি মাস্টার প্ল্যান পর্যালোচনায় এ তথ্য জানা গেছে।

এদিকে দূষণের জন্য দায়ী খালগুলোর একটির অবস্থান চট্টগ্রাম বন্দর জেটি (এনসিটি-৫) সংলগ্ন নেভাল বার্থ-৬ এর পশ্চিমাংশে।

খালটি দিয়ে ‘প্রতিনিয়ত’ এসিড বা ক্ষার সমৃদ্ধ ময়লা ও দূষিত পানি কর্ণফুলীতে প্রবেশ করছে। এতে নেভাল বার্থ-৬-এ অবস্থিত বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজসমূহের বিভিন্ন মেশিনারি সিস্টেম ও সংবেদনশীল যন্ত্রপাতির ওপর প্রভাব পড়ছে। তাই সেখানে জাহাজের অপারেশনাল সক্ষমতা বজায় রাখার স্বার্থে একটি ‘ওয়েস্ট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট’ বসানোর জন্য চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে প্রস্তাব দিয়েছে নৌবাহিনী।

গত ১৫ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম নৌ অঞ্চলের কমান্ডারের পক্ষে ক্যাপ্টেন সৈয়দ হেলাল হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে এই প্রস্তাব দেয়া হয়। এতে বলা হয়, ওয়েস্ট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন করা হলে পরিবেশ দূষণ রোধসহ নৌবাহিনীর জাহাজসমূহের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব হ্রাস পাবে।

এ বিষয়ে চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সামসুদ্দোহা বলেন, ওয়েস্ট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বসানো দীর্ঘ প্রক্রিয়ার বিষয়। অনেকগুলো খাল দিয়েই নানা ধরনের বর্জ্য কর্ণফুলী নদীতে পতিত হয়। সবগুলো খালে ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বসানোর প্রক্রিয়াটা অনেক দীর্ঘ। তবে আমরা আপাতত ক্ষতিকর এসিড বা রাসায়নিক পদার্থ কোথা থেকে আসছে তা খতিয়ে দেখব। কারণ, নেভাল বার্থ-৬ এলাকায় যেগুলো পড়ছে সেগুলো ইন্ডাস্ট্রিয়াল বর্জ্য বলেই মনে হচ্ছে। আশেপাশের কোনো শিল্প-কারখানায় ইটিপি চালু না রাখায় এমনটি হয়েছে। চিহ্নিত করার পর কারখানাটির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

দূষণ বেশি সাত খালের মুখে : যেসব খাল দিয়ে বিভিন্ন বর্জ্য কর্ণফুলীতে পড়ে নদীটিকে দূষিত করছে, তার মধ্যে সাতটি খালের মুখকে ‘দূষণের হটস্পট’ বলা হয়। কর্ণফুলী রক্ষায় প্রণীত দশ বছর মেয়াদি মাস্টার প্ল্যান বা মহাপরিকল্পনায় হটস্পটগুলো চিহ্নিত আছে।

খালগুলো দিয়ে নদীতে পতিত বর্জ্যগুলোর মধ্যে আছে গৃহস্থালি, রাসায়নিক সার ও শিল্পকারখানার বর্জ্য, মানব বর্জ্য, গরু-ছাগল ও হাঁস-মুরগির খামারের বর্জ্য। এর মধ্যে পচনশীল বর্জগুলো পানিতে দ্রবীভূত হয়ে সমুদ্রে চলে যায়। কিন্তু অপচনশীল বর্জ্যগুলো নদীর তলদেশে আটকে থাকে। জোয়ার-ভাটার প্রভাবে চিহ্নিত খালগুলোর মুখে কর্ণফুলী নদীর উপর-নিচ প্রায় এক কিলোমিটার পর্যন্ত বর্জ্যগুলো বিস্তৃত হয়।

সাত খালের মধ্যে নগরীর রুবি সিমেন্ট কারখানার পশ্চিম পাশ দিয়ে প্রবাহিত খালটি দিয়ে শিল্প বর্র্জ্য নদীতে মিশছে। মাইজপাড়া খাল দিয়ে বেশি যায় গৃহস্থালি বর্জ্য। মহেশখাল দিয়ে সব ধরনের বর্জ্যই নদীতে পড়ে। নগরীর চাক্তাই খাল দিয়ে পয়ঃবর্জ্য ও গৃহস্থালি বর্জ্য কর্ণফুলীতে পড়ে।

কৃষিতে ব্যবহৃত সার ও কীটনাশাক, পয়ঃবর্জ্য, পোলট্রি ফার্ম, খামারের বর্জ্য এবং গৃহস্থালি বর্জ্য কর্ণফুলীতে মিশে আনোয়ারা উপজেলার মুরারী খাল দিয়ে। পটিয়া ও বোয়ালখালী এলাকার শিল্প কারখানা ও কৃষিতে ব্যবহৃত সার ও কীটনাশক যায় বোয়ালখালী খাল দিয়ে।

দূষণের হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত আরেকটি হচ্ছে নগরীর খন্দকিয়া খাল। মূলত বায়েজিদ এলাকার শিল্প, আবাসিক ও পয়ঃবর্জ্য খন্দকিয়া খাল হয়ে হালদা নদীতে পড়ে। পরে ভাটার সময় তা কর্ণফুলী নদীতে চলে আসে।

এর বাইরে রাজাখালী খাল, ডোমখালী খাল, রাজাখালী ব্রাঞ্চ খাল-২, নোয়া খাল, গুপ্তা খাল, চাক্তাই ডাইভারশন খাল, ১৫ নং ঘাট এয়ারপোর্ট খাল, কলাবাগিচা খাল, টেকপাড়া খাল, ফিরিঙ্গি বাজার খাল, মোগলটুলী খাল, সদরঘাট খাল-১ ও ২, নিজাম মার্কেট খাল, বাইজ্জা খাল ও মরিয়ম বিবি খাল দিয়ে বিভিন্ন বর্জ্য কর্ণফুলীতে পড়ে।

প্রসঙ্গত, কর্ণফুলী নদীর দৈর্ঘ্য ২৭৫ কিলোমিটার। গড় প্রস্থ ৬৬৭ মিটার। চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো তৈরি হয়েছে আজ থেকে প্রায় ২৫-৩০ লক্ষ বছর আগে। সে অনুসারে কাছাকাছি সময়ে জন্ম কর্ণফুলীর।

প্রতিক্রিয়া মন্তব্য শেয়ার