করোনা: কতটুকু প্রস্তুত চট্টগ্রাম

Img

সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস এখন মহামারী। বিশ্বের আড়াই লাখেরও বেশি মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত। এরইমধ্যে ঝরে গেছে দশ হাজারেরও বেশি প্রাণ। পর্যায়ক্রমে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে বাংলাদেশেও। একজনের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। এ নিয়ে যেন চাপা আতঙ্ক ভর করেছে গোটা দেশে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আইইডিসিআর-এর তথ্য অনুযায়ী- গতকাল নতুন তিনজনসহ দেশে এ পর্যন্ত নিশ্চিত করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ২০ জন। এর মধ্যে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন একজনের অবস্থা সংকটাপন্ন। এখন পর্যন্ত এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন একজন।

তবে আক্রান্তদের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আইইডিসিআর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, করোনা আক্রান্তদের বেশিরভাগই ইতালি ফেরত। কেউ ইতালি ফেরতদের পরিবারের সদস্য। আর কেউ ইতালি ফেরত কারও সংস্পর্শে আসা। মোটকথা ইতালি ফেরত প্রবাসীদের মাধ্যমেই দেশে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ছে বলে মনে করেন স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা।

কিন্তু ভাইরাসটির সংক্রমণ ঠেকাতে প্রস্তুতি গ্রহণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদাসীন ছিলেন বলে মন্তব্য করেছেন জনস্বাস্থ্য অধিকার রক্ষা কমিটির আহবায়ক মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান ও বাংলাদেশ পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদ, চট্টগ্রামের সভাপতি ডা. একিউএম সিরাজুল ইসলাম। করোনা ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কার কথা জেনেও তা মোকাবেলায় সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেয়া হয়নি দাবি করে প্রবীণ এই দুই চিকিৎসক বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে প্রস্তুতি নেয়া হলে এই ভাইরাসের সংক্রমণ বা ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো যেতো।

প্রসঙ্গত, গত ডিসেম্বরে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে প্রথম এ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। ওই সময় সেখানে আটকে পড়া তিন শতাধিক বাংলাদেশিকে নিয়ে এসে বাধ্যতামূলকভাবে আশকোনা হজ ক্যাম্পে রাখা হয়। দুই সপ্তাহ (১৪দিন) পর্যবেক্ষণে রেখে তাদের বাড়িতে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়।

কিন্তু পরবর্তীতে ইতালিসহ অন্যান্য দেশ থেকে আসা প্রবাসীদের বিষয়ে এরূপ কোন ব্যবস্থা দেখা যায়নি জানিয়ে ডা. সিরাজুল ইসলাম বলেন, বিমানবন্দরে পর্যাপ্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা তো ছিলই না, বরং সবাইকে হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তটি-ই দেশের জন্য অনেকটা আত্মঘাতী হয়েছে বলে আমরা মনে করি। অথচ, সবাই জানে ইতালিসহ অধিকাংশ দেশে মহামারী হিসেবে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়েছে। এ নিয়ে প্রস্তুতির যথেষ্ট সময়ও কিন্তু (আড়াই মাসের কম নয়) পাওয়া গেছে। এরপরও প্রবাসীরা দেশে আসলে তাদের নিয়ে কি করা হবে, সেরকম কোন প্রস্তুতি কিন্তু আমরা দেখিনি। যার কারণে, ইতালি ফেরত শতাধিক বাংলাদেশিকে আশকোনা হজ ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে তাদের বিক্ষোভ করতে দেখা যায়। থাকা-খাওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা না হলে তাদের বিক্ষোভ করাটা কিন্তু অস্বাভাবিক নয়।

এদিকে, করোনা মোকাবেলায় প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে স্বাস্থ্য প্রশাসন দফায়-দফায় বৈঠক করলেও এখনো পর্যন্ত কার্যকর কোন ব্যবস্থা দৃশ্যমান নয় চট্টগ্রামে। যদিও করোনা মোকাবেলায় সিটি কর্পোরেশন, বিভাগীয় পর্যায় ও জেলা-উপজেলা পর্যায়ে কমিটি গঠন করে দেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এর প্রেক্ষিতে জেলাপ্রশাসক মো. ইলিয়াস হোসেনের সভাপতিত্বে ৪ মার্চ প্রথম দফায় বৈঠক করে চট্টগ্রাম জেলা পর্যায়ের কমিটি। বৈঠকে বিদেশ ফেরতদের কোয়ারেন্টাইনের জন্য শহরের দুই প্রান্তে দুটি স্কুল নির্ধারণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পরবর্তী বৈঠকে স্কুলের পরিবর্তে হোটেল ঠিক করার সিদ্ধান্ত হয়। পরে সেই সিদ্ধান্ত থেকেও সরে এসে কোয়ারেন্টাইনের জন্য হাসপাতাল নির্ধারণ করে জেলা পর্যায়ের কমিটি।

পরে ১৮ মার্চ মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের সভাপতিত্বে সিটি কর্পোরেশনের এবং বিভাগীয় কমিশনার এবিএম আজাদের সভাপতিত্বে ১৯ মার্চ বৈঠক করে বিভাগীয় কমিটি। করোনা মোকাবেলায় সামগ্রিক প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা হয় বৈঠকে। তবে জেলা পর্যায়ের বৈঠকে কোয়ারেন্টাইনের জন্য প্রতিষ্ঠান নির্ধারণ করা হলেও বিদেশ ফেরতদের বাসায় (হোম কোয়ারেন্টাইনে) পাঠানো থেমে থাকেনি। যার কারণে এ পর্যন্ত একজন বিদেশ ফেরত প্রবাসীকেও সরকারিভাবে কোয়ারেন্টাইনে রাখার তথ্য পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেন চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি। তিনি বলেন, আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী আমরা প্রযোজনীয় প্রস্তুতির ঘাটতি রাখিনি। কিন্তু বিদেশ ফেরতকে সবাইকে তো সরকারিভাবে রাখা কঠিন। যার কারণে সবার তথ্য-উপাত্ত আমরা নিয়েছি। আর তাদের বাসায় হোম কোয়ারেন্টাইন মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছি।

হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠানোর ফলে ইতালিসহ বিদেশ ফেরতরা যার যার বাসা-বাড়িতে চলে যাওয়াতে দেশ তো বটেই চট্টগ্রামও বিপর্যয়ের সম্মুখীন বলে মনে করেন প্রবীণ চিকিৎসক মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান। তাঁর অভিমত- হোম কোয়ারেন্টাইন মানে তো আমরা দেখেছি, এলাকায় গিয়ে কেউ বাজার করতে গেছেন, কেউ শপিংয়ে গেছেন। কেউ আত্মীয়-স্বজন নিয়ে বেড়াতে গেছেন। তাতে ওই ব্যক্তির পরিবারের সদস্যরা তো বটেই, যারাই তাদের সংস্পর্শে এসেছেন সবাই কিন্তু আক্রান্তের ঝুঁকিতে। কিন্তু চীন থেকে আনা বাংলাদেশিদের মতো করে অন্যান্য দেশ থেকে আসা প্রবাসীদের ক্ষেত্রেও এরকম সিদ্ধান্ত নেয়া হলে এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হতোনা।

অন্যান্য অঞ্চলের পাশাপাশি চট্টগ্রামেও ভয়াবহ পরিস্থিতি হতে পারে শঙ্কা প্রকাশ করে এই দুই চিকিৎসক বলছেন, সংক্রমণ ঠেকাতে গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ হলো আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত আলাদা করে ফেলা। সেটি করতে হলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হয়। কিন্তু ঢাকার বাইরে তো কোথাও এই পরীক্ষার সুবিধাও নেই। চট্টগ্রাম বিমানবন্দর দিয়েও কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রবাসী দেশে ফিরেছেন। তাদের মধ্যে ইতালি ফেরতও রয়েছেন। কিন্তু সবাই তো এলাকায় গিয়ে মানুষের সাথে মিশে গেছেন। কেউ কোয়ারেন্টাইনের নিয়ম মানেননি। এতে করে পরিবারের পাশাপাশি এলাকাবাসীও কিন্তু আক্রান্ত হতে পারেন। পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকলে হয়তো নিশ্চিত হয়ে আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা করা যেতো। কিন্তু এখন কেউ তো বলতে পারছেনা, কে আক্রান্ত। ফলে আক্রান্তের ঝুঁকি আরো বেশি। এটাই বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

বিভাগীয় পর্যায়ের বৈঠকে করোনা মোকাবেলায় প্রস্তুতিতে ঘাটতির বিষয়টি অস্বীকার করেননি বিভাগীয় কমিশনার এবিএম আজাদ। তবে এখন থেকে জোরালো প্রস্তুতি নিয়ে এই মহামারীর সংক্রমন ঠেকাতে সবাইকে আন্তরিক ভাবে কাজ করার আহবান জানান তিনি।

অবশ্য, হাসপাতালগুলোতে প্রস্তুতির বিষয়টি দেখতে গতকাল বিকেলে বিআইটিআইডি হাসপাতাল, রেলওয়ে হাসপাতাল ও জেনারেল হাসপাতাল সরেজমিন পরিদর্শন করেন জেলাপ্রশাসক মো. ইলিয়াস হোসেন, সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি।

চিকিৎসা সেবার প্রস্তুতি নিয়েও প্রশ্ন : করোনা আক্রান্তের চিকিৎসা সেবার প্রস্তুতির পাশাপাশি সেবাদানকারী চিকিৎসক ও নার্সের সুরক্ষা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। জেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য প্রশাসন যদিও বলছে, করোনা আক্রান্ত পাওয়া গেলে তাদের চিকিৎসা হবে ফৌজদারহাটের বিআইটিআইডি হাসপাতাল ও চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে। কিন্তু এ দুটি হাসপাতালে নেই আইসিইউ সুবিধা। অথচ করোনা আক্রান্ত রোগীর আইসিইউ সাপোর্ট খুব দরকার বলে জানান চট্টগ্রামের দুই প্রবীন চিকিৎসক।

অবশ্য, মন্ত্রণালয় থেকে দশটি আইসিইউ বেড চাওয়া হয়েছে জানিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম হুমায়ুন কবীর বলছেন, মন্ত্রণালয় থেকে চারটি বেড দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। আগামী সোমবার নাগাদ এই বেড পাওয়া যাবে। আর এসব বেড করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসায় জেনারেল হাসপাতাল অথবা বিআইটিআইডি হাসপাতালে স্থাপন করা হবে বলেও জানান চমেক হাসপাতালের পরিচালক হিসেবে নতুন দায়িত্ব নেওয়া ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম হুমায়ুন কবীর।

অন্যদিকে, চিকিৎসক-নার্সদের সুরক্ষায় পিপিইসহ প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জাম পর্যাপ্ত রয়েছে রয়েছে বলে জানিয়েছেন চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এসএম হুমায়ুন কবীর, বিআইটিআইডি’র পরিচালক প্রফেসর ডা. এমএ হাসান ও জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. অসীম কুমার নাথ। এছাড়া এসব সরঞ্জাম আরো সংগ্রহ করা হচ্ছে বলেও জানান তাঁরা।

পূর্ববর্তী সংবাদ

মসজিদে শুধু ফরজ নামাজ পড়ার অনুরোধ

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে মুসল্লিদের বাড়িতে অজু করে ও সুন্নাত নামাজ পড়ে জুমার নামাজে আসার অনুরোধ জানিয়েছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন (ইফা)।

এছাড়া বিদেশফেরত ব্যক্তি, জ্বর-হাঁচি-কাশিতে আক্রান্ত ও অসুস্থ ব্যক্তিদের মসজিদে বা জনসমাগমে যাওয়া থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

শুক্রবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ইফার পক্ষ থেকে এ অনুরোধ জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনাভাইরাস মহামারী আকার ধারণ করায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে সরকারের পক্ষ থেকেও সব ধরনের জনসমাগম পরিহার করাসহ বিভিন্ন নির্দেশনা মেনে চলার কথা বলা হয়।

উল্লেখ্য, শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের সম্মেলন কক্ষে করোনাভাইরাস সম্পর্কিত প্রেস ব্রিফিংয়ে অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা তথ্যমতে, নতুন করে ৩ জনের দেহে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এদের মধ্যে ২ জন পুরুষ ও ১ জন নারী এবং আক্রান্তরা সবাই আলাদা পরিবারের সদস্য।

আক্রান্ত নারী ও ১ জন পুরুষের বয়স ৩০ বছরের মধ্যে এবং অপর একজন পুরুষের বয়স ৭০ বছর। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক এবং তিনি আইসিইউতে আছেন।

আক্রান্তদের মধ্যে ১ জন ইতালি ফেরত ও ২ জন বিদেশ ফেরতদের সংস্পর্শে আক্রান্ত। বর্তমানে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে আছেন ৪৪ জন এবং আইসোলেশনে রয়েছেন ৩০ জন।

প্রতিক্রিয়া মন্তব্য শেয়ার