করোনাকালে এমন দুঃসংবাদ, প্রবাসীদের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো

Img

একটি উন্নত জীবন। পরিবারের এক চিলতে সুখ আর মুখ ভরা হাসি ফোটাতে নিজের সুখকে জলাঞ্জলি দিয়ে সুখ কিনতে বিদেশে পাড়ি জমান প্রবাসীরা। এবার তাদেরই শুনতে হচ্ছে দুঃসংবাদ, তাও আবার করোনাকালে।

আগে প্রবাসে বাংলাদেশি কেউ মারা গেলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স বিনা খরচে মরদেহ পরিবহন করে দেশে নিয়ে আসত। কিন্তু সম্প্রতি তা বন্ধ করে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ফলে বেশি টাকা দিয়ে পরিবারের খরচেই দেশে আনতে হচ্ছে রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের মরদেহ। বিষয়টি মানতে পারছেন না প্রবাসীরা। 

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান প্রবাসীদের মরদেহ বিনা খরচে দেশে আনলেও বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে আপত্তি জানায়। চলতি বছরের শুরুতে এ নিয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠিও দেয় বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয়। কিন্তু প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বিষয়টির কোনো সুরাহা করেনি, চিঠির জবাবও দেয়নি। এর মধ্যে করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে বিনামূল্যে মরদেহ বহন তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কোনো সাড়া না পেয়ে শেষ পর্যন্ত বিনা খরচে মরদেহ পরিবহন বন্ধ করে দেয় বিমান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মহিবুল হক বলেন, ‘বিমান একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। তবু মানবিক বিষয়গুলোতে সবসময়ই অগ্রাধিকার দিয়ে বিমান প্রতি বছর শত শত প্রবাসী বাংলাদেশির মরদেহ বিনা ভাড়ায় পরিবহন করে থাকে। কিন্তু আর কতদিন বিমান এভাবে করবে? তাদের তো একটা খরচ আছে। ন্যূনতম খরচটা তো তাদের পেতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘প্রবাসীরা যখন দেশের বাইরে যান, তখন তারা ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার ফান্ডে টাকা জমা দিয়ে যান। তাই প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় চাইলেই সেই ফান্ড থেকে বিমানকে মরদেহ বহনের টাকাগুলো পরিশোধ করে দিতে পারে। আমরা এ বিষয়ে চিঠি দিলেও ওই মন্ত্রণালয় থেকে আমাদের এখনও কোনো ফিডব্যাক জানানো হয়নি।’

বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স বিনামূল্যে ৭৫০-৯০০ প্রবাসীর মরদেহ দেশে আনছে। এর মধ্যে অধিকাংশই সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রবাসী।

বিমানের একজন কর্মকর্তা জানান, সারাবছরই বিশ্বে বিভিন্ন সংকট লেগে থাকে। নানা ঘটনা-দুর্ঘটনায় প্রবাসী শ্রমিকরা মারা যান। গোটা বিশ্বের এভিয়েশন খাতে বিপর্যয়ের পরও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া প্রবাসীদের মরদেহ ফিরিয়ে আনে বিমান। যেহেতু প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে ভাড়া পরিশোধের সুযোগ রয়েছে, তাই বিমান আর বিনামূল্যে মরদেহ বহন করছে না।

মধ্যপ্রাচ্য হয়ে বাংলাদেশে আসে এমন তিনটি বিদেশি এয়ারলাইন্সের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যের দেশ থেকে একজন ব্যক্তির মরদেহের কফিন বহনের জন্য প্রতি কেজি ১৮ ডলার বা বাংলাদেশি ১৫৩০ টাকা নেয়। সেক্ষেত্রে মরদেহ ও কফিনের ওজন মিলে প্রায় দুই লাখ ৩০ হাজার থেকে আড়াই লাখ টাকার মতো ভাড়া নেয়া হয়।

তবে দীর্ঘদিন ধরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স বিনা খরচেই প্রবাসীদের মরদেহ বহন করে আসছিল। সংস্থার সংশ্লিষ্টরা জানান, কোভিড-১৯-এর কারণে বিমানের আয় উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়ায় তারা বিনামূল্যে মরদেহ পরিবহন বন্ধ করে দিয়েছে।

এদিকে মরদেহ পরিবহন বন্ধের সিদ্ধান্তে বিমানের ওপর ক্ষোভ ঝাড়ছেন অনেক প্রবাসী। অনেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স বয়কটের ঘোষণাও দিয়েছেন। তবে বিমান বলছে, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় চাইলেই দ্রুত সমস্যার সমাধান সম্ভব।

ওমানে অবস্থানরত বাংলাদেশ প্রবাসী অধিকার পরিষদের এক সদস্য বলেন, আমরা রোদে পুড়ে, জ্বলে ভিজে কাজ করে দেশের অর্থনীতির চাকা গতিশীল রাখি। অথচ দেশে আমাদের জন্য অতিরিক্ত কোনো সুবিধা নেই। বরং আমরা প্রবাসে মারা গেলেও পরিবারের ওপর খরচের দায়ভার পড়ে। মন্ত্রণালয় চাইলে খুব সহজেই অল্প সময়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব, তবে আমরা শ্রমিক শ্রেণির বলে আমাদের বিষয়গুলো সবসময় উপেক্ষিত থাকে। আমাদের মতো প্রবাসীদের অবস্থান বাংলাদেশে বসবাসরত মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর চেয়েও নিচে।

প্রতিক্রিয়া মন্তব্য শেয়ার