এ দায় কার

Img

বেঁচে থাকার জন্য আমাদের ছুটে চলা নিরন্তর। এ ছুটে চলা আমাদের নিজের জন্য, পরিবারের জন্য ও রাষ্ট্রের জন্য। অনেকেই পরিবারের মুখে হাসি ফুটাতে কত কষ্টই না স্বীকার করছে। এই সুখের জন্যই পরিবার-পরিজন ফেলে পাড়ি জমাচ্ছে দূর পরবাসে। সবাই যে শুধু সুখের জন্যই বিদেশে পাড়ি জমায় বিষয়টি কিন্তু তা নয়। অনেকেই পরিবেশ পরিস্থিতির কারণেও অনেক সময় প্রবাসে যেতে বাধ্য হয়। প্রবাসে সকলেই সফল হয় না।

আবার কেউ পৌঁছে যায় সফলতার সর্বোচ্চ শিখরে। আবার কেউ কেউ বিদেশে এসেও বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে এবং নষ্ট করে দেশের ভাবমূর্তি। এমন অপরাধীর সংখ্যা হাতেগোনা হলেও যারা সফল তাদের সফলতা কলুষিত হয় এইসব অপরাধীরদের কারণে। অথচ যারা সফল ব্যক্তি তারা এসবের ধারে কাছেও নেই।

এমন হাজারো প্রবাসী আছে যারা শূন্য থেকে শুরু করে ভিনদেশে গড়েছেন নিজেদের শক্ত অবস্থান। যাদের সফলতার কথা শুনলে যে কারোরই গর্বে বুক ভরে যাবে। ফয়েজ পাটোয়ারী তাদের মধ্যে একজন। ২০০১ সালে সাধারণ শ্রমিক হিসাবে ওমানে পাড়ি জমান। প্রথমে সাধারন একটি চাকরি করলেও বর্তমানে সে নিজের ব্যবসা করে খুবই ভালো আছেন। তার প্রধান উদ্দেশ্য হল নিজের আর্থিক স্বচ্ছলতার সাথে সাথে বাঙ্গলী ভাইদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা।

ওমানে এমন আরেক ব্যবসায়ী এমদাদ হোসেন তিনি ও সাধারণ শ্রমিক হিসাবে ওমান গিয়েও ইন্টেরিয়র ডিজাইন এর ব্যবসা করে কোটিপতি বনে গিয়েছেন।

নিজের প্রবল আগ্রহ ও সততার দ্বারা মালয়েশিয়াতে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন কিশোরগঞ্জের আবু বক্কর সিদ্দিক। সততা, দৃঢ়তা ও একাগ্রতার জন্য তিনি মালয়েশিয়াতে একজন সফল ব্যবসায়ী। তাহারও মূল উদ্দেশ্য বাঙ্গালীদের জন্য অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।

 সবজি, ফলের চাষ, ডেইরি ফার্ম এই নিয়ে মুন্সিগঞ্জের সৈয়দ আহমেদ এর কৃষি খামার। তার এই সফলতা যেন ঈর্ষণীয়। খামারে ঢুকলেই মনে হবে এ যেন এক টুকরো বাংলাদেশ। তার এই খামারে মালয়েশিয়ান ইন্দোনেশীয়ান ও বাংলাদেশী সহ অন্যান্য দেশের লোক ও কাজ করে। বছর শেষে লাভের টাকা টাও বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২০ লাখ। তার এই কৃষি খামার দেখে আজকাল অনেক মালয়েশিয়ানরাও কৃষি কাজে আগ্রহী হয়ে উঠছে। কৃষি কাজে আরো সফলতা পেয়েছেন চাঁদপুরের মানিক মিজি।

বাংলাদেশীদের সফলতা যেন মালয়েশিয়ার পরতে পরতে। মালয়েশিয়ার ১৪তম জাতীয় নির্বাচনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের দল বারিসান ন্যাশনাল থেকে এমপি নির্বাচিত হন সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরের হাফিজ সৈয়দ আবুল ফজলের দ্বিতীয় সন্তান জনাব আবুল হোসেন।

এতো গেল সফলতার গল্প। বর্তমানে মালয়েশিয়াতে বাংলাদেশীদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধ কার্যক্রম এমন অবস্থা গিয়ে পৌঁছেছে যার ফলে অন্য বাংলাদেশিরাও এখন আর মাথা উঁচু করে চলতে পারছে না। এই অপরাধ প্রবণতা শুধু মালয়েশিয়াতে নয় পুরো দুনিয়া জুড়েই বাংলাদেশীদের দ্বারা সংঘটিত হচ্ছে। একটি জরিপে দেখা যায় বর্তমানে  ৪৯ টি দেশে কারাবন্দি আছে ৯ হাজার ৯৬৭ জন বাংলাদেশি।

এদের মধ্যে ২২ জন ফাঁসির আসামি, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আছে ১২ জন। বিশ্বের কমপক্ষে ১১ টি দেশে খুনের মামলায় বিচারাধীন আছে ৩৪ জন। ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় বিচারাধীন আছে ২৬ জন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির মধ্যে সবচেয়ে বেশি আছে আরব আমিরাতে যার সংখ্যা ৫ জন। শিরচ্ছেদের অপেক্ষায় সৌদি আরবে আছে ৪ জন। তাছাড়া কাতারে ৩ জন, জর্ডানে ২ জন, কুয়েত,  ওমান ও মিশরে ১ জন করে। 

 সৌদি আরব ও কাতারের ৭ জনকে করা হবে শিরশ্ছেদ। আমিরাতের ৫ জনকে ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি ও বাকিগুলোকে বাংলাদেশের মতোই মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত ফাঁসি।

অতি সম্প্রতি ব্রুনাইতে স্বদেশীর বাসায় ডাকাতির জন্য ৫ জনকে ৩০ বছরের জেল ও ১২  টি বেত্রাঘাতের রায় ঘোষণা করা হয়েছে।এছাড়াও মালয়েশিয়াতেও একজনের ২০ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। কিছুদিন পূর্বে মালয়েশিয়াতে দুই অপহরণকারী পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়।

এবার আমরা আপনাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করব কোন দেশে কতজন বাংলাদেশী বন্দী আছে : মিয়ানমারে ৫৭ জন, নেপালে ১২ জন, যুক্তরাষ্ট্রে ২৬ জন, ভারতে ২৬৯৭ জন, গ্রিসে ১২৩ জন, জাপানে ৬৫ জন, থাইল্যান্ডে ২৩ জন, পাকিস্তান ১৯ জন, ফ্রান্সে ৪৬ জন, যুক্তরাজ্যে ২১৮ জন, কাতারে ১১২ জন, সৌদি আরবে ৭০৩ জন, জর্ডানে ৪৭ জন, মিশরে ৫ জন, দক্ষিণ কোরিয়া ১৬ জন, তুরস্কে ৩৬ জন, জর্জিয়া ২৬ জন, কিরগিজস্তানে ১ জন, ওমানে ১০৪৮ জন, আফ্রিকায় ৩০ জন, বাহারাইনে ৩৭০ জন, লেবাননে ২ জন, মালয়েশিয়ায় ২৪৭২ জন, চীনে ৫ জন, হংকংএ ২৪ জন, মঙ্গোলিয়া ১ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ১০৯৮ জন, ব্রুনাই ৫ জন, ইতালিতে ৫১ জন, ইরাকে ১২১ জন, মরিশাসে ৭ জন, মেক্সিকোতে ৯৭ জন, আজারবাইজানে ৬ জন, মরক্কোতে ২ জন, দক্ষিণ আফ্রিকাতে ১১ জন, ব্রাজিলে ১ জন, অস্ট্রেলিয়ায় ৩৯ জন, কুয়েতে ২৬১ জন।

এই হলো আমাদের বাংলাদেশীদের অপরাধের চিত্র। এখন এই দায়  কার? এর দায় কি রাষ্ট্রের পরিবারের নাকি নিজের? বিশেষজ্ঞদের মতে তার পরিবারের। আমাদের দেশের পরিবারগুলোর একটা প্রবণতা দেখা যায় সেটা হল একজন ছেল সে মাদকাসক্ত হোক, জুয়াড়ি হোক বা অন্য যে কোন অপরাধের সাথে জড়িত থাক এমন অবস্থায় তাদের পরিবার একটা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেয়। আর সে সিদ্ধান্ত টি হল ছেলেকে একটি বিয়ে করিয়ে দেয়া। তাদের ধারণা ছেলেকে বিয়ে করিয়ে দিলেই সব সমস্যার সমাধান অর্থাৎ সে বিয়ের পর স্ত্রীকে নিয়ে ব্যস্ত থাকবে অন্য কোথাও যাবে না।

এমন সিদ্ধান্ত পাগলামি ছাড়া আর কিছুই নয়। এর ফলশ্রুতিতে যা হওয়ার তাই হয়  নষ্ট জীবনের সাথে জড়িয়ে নষ্ট হয়ে আরেকটি জীবন। সত্যি কথা বলতে কি, বাংলাদেশের অভিভাবকদের মধ্যে একটি ভুল ধারণা সব সময় মাথার মধ্যে দেখা যায় ছেলেটি বাংলাদেশে কোন ছোটখাটো অপরাধের সাথে জড়িয়ে গিয়েছে অপরাধের বা দেশে খুব বাউন্ডুলেপনা করছে, এসব পিতা-মাতারা মনে করে ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়ে দিলেই হয়তবা সব সমস্যার সমাধান। আসলে তা নয়, যারা দেশের মাটিতে অপরাধ করে অভ্যস্ত তারা বিদেশে এসে আরো বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ফলশ্রুতিতে সৃষ্টি হয় অপরাধ রাজ্য। আরে রাজ্য গড়তে গিয়ে নিজের রাষ্ট্রের হয় বদনাম। যারা প্রবাসে থাকে তাদের প্রত্যেকেরই বোঝা উচিত যে তারা লাল সবুজের প্রতিনিধি। অর্থাৎ একজন প্রবাসী প্রত্যেকেই একজন করে দেশের রাষ্ট্রদূত। মূলত একজন প্রবাসীকে দেখেই অন্য দেশের মানুষ ঐ দেশ সম্পর্কে একটি সম্যক ধারণা প্রকাশ করে।

অর্থাৎ একজন প্রবাসী যদি আচার-আচরণ ঠিক রেখে সততার সাথে কাজ করে এবং যে দেশে অবস্থান করছে সেই দেশের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকে তাহলে যে দেশে সে আছে সেই দেশের জনগণ আমাদের দেশ সম্পর্কে বা ওই প্রবাসীর দেশ সম্পর্কে ভালো ধারনা পোষণ করে। আবার এর বিপরীতও হতে পারে যেমন একজন প্রবাসী যদি কোন অপরাধের সাথে জড়িত থাকে বা যে দেশে অবস্থান করছে সে দেশের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না থাকে এবং সততা প্রকাশ করতে ব্যর্থ হয় তাহলে ওই দেশের জনগণ এই প্রবাসী বা প্রবাসীর দেশ সম্পর্কে মোটেও ভাল ধারণা পোষণ করবে না।

সুতরাং কোন অভিভাবক যদি তার সন্তানকে প্রবাসে পাঠাতে চান অবশ্যই তারা যেন অপরাধী সন্তানকে বিদেশের না পাঠান। যদি এমন অপরাধী ছেলে বা সন্তানকে বিদেশে না পাঠানো হয় তাহলে যন্ত্রণায় ভুগবে শুধু একটি পরিবার অন্যথায় এই অপরাধী সন্তানকে প্রবাসে পাঠালে সে বিদেশে এসে অপরাধ করবে। আর এটার সম্পূর্ণ দোষ বা দায় পড়বে রাষ্ট্রের উপর এবং ওই দেশে অবস্থানরত সকল বাঙ্গালীদের উপর।

অতি সম্প্রতি এমনটাই দেখা গিয়েছে মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। অতএব পরিবার থেকে শুরু করে, বিভিন্ন এম্প্লয়মেন্ট এজেন্সিকে বা রাষ্ট্রকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। তাদেরকে অবশ্যই বুঝতে হবে সামান্য কিছু মানুষের জন্য কেন বৃহৎ পরিসরের লোকজন ভোগান্তির মধ্যে পড়বে। যে অপরাধ করবে সেই অপরাধের দায়ভার তার নিজের। এ দায়ভার রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রের জনগণের নয়। 

প্রতিক্রিয়া মন্তব্য শেয়ার