একজন সাদেক বাচ্চুর বর্ণাঢ্য জীবন

Img

ঢাকাই চলচ্চিত্রের দাপুটের অভিনেতার তালিকায় সাদেক বাচ্চু নাম প্রথম দিকেই থাকবে। জীবনের শেষ সময়ে অভিনয়ে অনেকটা অনিয়মিত থাকলেও একটা সময় চুটিয়ে কাজ করেছেন। মঞ্চ, বেতার, টিভি, সিনেমা–সর্বত্রই দাপুটে বিচরণ ছিল তার। পাঁচ দশকের লম্বা ক্যারিয়ারে প্রায় ৫০০ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন সাদেক বাচ্চু। 

তবে নব্বই দশকে এহতেশামের ‘চাঁদনী’ ছবিতে অভিনয়ের পর জনপ্রিয়তা পান খলনায়ক হিসেবে। এই পরিচয়েই দেশজুড়ে খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে সাদেক বাচ্চুর।

সদ্য মেট্রিক পাস করা সাদেক বাচ্চুর বাবা মারা যাওয়ার পর ভাই-বোন-মা-দাদিসহ ১১ জনের পুরো সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে কাঁধে। সেই দায়িত্ব পালন করে নিজের পড়াশোনা, অভিনয় চালিয়ে গিয়ে আজ তিনি সকলের পরিচিত সাদেক বাচ্চু। অভিনয় শুরু করেন ১৯৬৩ সালে; রেডিওতে। তখন মঞ্চেও বিচরণ ছিল তার; প্রথম থিয়েটার ‘গণনাট্য পরিষদ’।

১৯৭২-৭৩ সালে মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে যখন এদেশের সাংস্কৃতিক বলয় নতুনভাবে তৈরি হচ্ছিল, তখন গ্রুপ থিয়েটারের সঙ্গে যোগ দেন তিনি। সে সময়ে উন্মোচন নামের একটি গ্রুপের সঙ্গে পথ চলা। উন্মোচন ভেঙে যাওয়ার পর সম্মিলিতভাবে তৈরি করলেন ‘প্রথম পদক্ষেপ’। এক সাক্ষাৎকারে সাদেক বাচ্চু বলেছিলেন, একসময় ‘প্রথম পদক্ষেপ’ ভেঙে যায়, কিন্তু আমি হতাশ হইনি। ১৯৮৪ সালে ‘মতিঝিল থিয়েটার’ প্রতিষ্ঠা করেছি। 

ভিলেন ছাড়াও নানামুখী চরিত্রে বলিষ্ঠ অভিনয় করেছেন। অভিনয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ একটু দেরিতেই পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। ২০১৮ সালে ‘একটি সিনেমার গল্প’–এর জন্য পুরস্কার পান। কিন্তু এই সাদেক বাচ্চু হওয়ার গল্পটা কিন্তু সহজ নয়।


চাঁদনী চলচ্চিত্রের মাধ্যমে দেশব্যাপী পরিচিতি পেয়ে যান সাদেক বাচ্চু। যদিও ছোটপর্দার মাধ্যমে আগেই জনপ্রিয় হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। ১৯৭৪ সালে প্রথম টেলিভিশনে অভিষিক্ত হন। প্রথম নাটক ছিল ‘প্রথম অঙ্গীকার’ নাটকটি পরিচালনা করেন আবুল্লাহ ইউসুফ ইমাম। সোজন বাদিয়ার ঘাট, নকশী কাঁথার মাঠসহ অসংখ্য নাটকে মূল চরিত্রে অভিনয় করেন। ঝুলিতে যুক্ত হয় অসংখ্য আলোচিত নাটক।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘রামের সুমতি’ অবলম্বনে রামের সুমতিতে প্রথমবারের মতো নায়ক চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। শহীদুল আমিন ছিলেন পরিচালক। আরো একটি চলচ্চিত্রেও সুনেত্রার বিপরীতে নায়ক চরিত্রে ছিলেন কিন্তু ছবিটি মুক্তি পায়নি।  খল চরিত্রে প্রথম অভিনয় করেন ‘সুখের সন্ধানে’ চলচ্চিত্রে। শহীদুল হক খানের এই ছবিতে ইলিয়াস কাঞ্চন নায়ক ছিলেন।

চলচ্চিত্রে অভিষেকের পরেও টিভি নাটকে তিনি ছিলেন উজ্জ্বল। এই সময়েই তিনি জিয়া আনসারীর প্রযোজনায় করেন ‘জোনাকী জ্বলে’; সে সময়ে বিটিভির তুমুল হিট নাটক ছিল এটি। এই নাটকের মাধ্যমে সাদেক বাচ্চুর পরিচিতি গরে ওঠে। এখানে রাজাকার চরিত্রে অভিনয় করেন। এরপর সেলিম আল দ্বীনসহ অসংখ্য জনপ্রিয় নাটকে অভিনয় করেন। এরপরই চাঁদনী। শাবনাজ নাঈম এই জুটির ছবি’র কথা কারো অজানা নয়।

সাদেক বাচ্চুর আসল নাম মাহবুব আহমেদ সাদেক। কিন্তু তার নাম সাদেক বাচ্চু হলো কীভাবে? এ অভিনেতা এক সাক্ষাৎকারে বলেন, চাঁদনী চলচ্চিত্রে এহতেশাম সাহেব আমার নেমপ্লেট বসিয়ে দিল ‘সাদেক বাচ্চু’। সেই থেকে আমি হয়ে গেলাম সাদেক বাচ্চু। তিনি আমাকে সেটে দেখে বলেন, তু বাড়া বাচ্চু হ্যায় রে, তেরে নাম বাচ্চু, সাদেক বাচ্চু। সেই থেকে সাদেক বাচ্চু-ই হয়ে গেল আমার নাম।

সাজেক বাচ্চু শুধু অভিনয়ই নয়, সঙ্গে লেখালেখিও করেন। মুক্তধারা প্রকাশনীর কর্ণধার বিশ্বজিৎ সাহা সাদেক বাচ্চুর লেখা নাটক প্রকাশ করেছেন। পেশায় সাদেক বাচ্চু বাংলাদেশ ডাক বিভাগের একজন কর্মকর্তা ছিলেন।

প্রতিক্রিয়া মন্তব্য শেয়ার